বিয়ের সময় যাচাই-বাছাই এবং করণীয়

শিল্পী জলি:

ছোটবেলায় দেখেছিলাম জোর করে ধরে টেনে একটি মেয়ের হাতের চুড়ি খুলে নিতে, বিয়েতে কবুল বলেছে তার প্রমাণ স্বরূপ। সেদিন কবুল না বললেও বিয়ে ঘটে যায় তার। অতঃপর দাম্পত্য জীবনের শুরু।

মেয়েটি একজনকে ভালোবাসতো। ভালোবাসা ছিন্ন না করেই আরেকজনের সাথে বাঁধনে বাঁধা পড়ে সে অভিভাবকদের সিদ্ধান্তে। সংসার করবে সে– রাঁধবে, বাড়বে, ঘুমুবে, লাভ মেইক করবে, অথচ নিজের সিদ্ধান্ত নেবার কোন ক্ষমতা থাকবে না। কতটা ভয়ঙ্কর ঘটনা!
অন্যদিকে চাপে একটি অচেনা অজানা মানুষের সাথে ক্ষণিকের দেখাদেখিতে কবুল কেমন জুয়ার চাল? যদি মিলে যায়, ভালো। আর যদি তেমন লোকের পাল্লায় পড়ে, তাহলে সাত ঘাটের ঘোলা পানি কী এবং কত প্রকার জীবন দিয়ে তা উপলব্ধি করতে হবে।
খুনী এরশাদ শিকদারও কি এমন এ্যারেঞ্জড ম্যারেজ করেছিল?

বিয়ে একটি আইনসিদ্ধ সামাজিক বা ধর্মীয় চুক্তি। যেটা পাত্রপাত্রীর পারস্পরিক সহমতে হবার কথা। বিয়েতে মানব থেকে মানবের সৃষ্টিও ঘটে। তাই শুধু নিজের নয়, আরেকজনকেও গড়ে তোলার বিষয়ও জড়িয়ে থাকে। সেখানে নিজের মতামতই যদি প্রাধান্য না পায়, তাহলে জীবন দুর্বিষহ হতে সময় লাগার কথা নয়। তাই বিয়েতে মানুষ চেনাসহ নানা বিষয় রয়েছে যেগুলোতে নজর দেয়া দরকার।

প্রথমেই বিয়েতে যে দিকটিতে নজর দেয়া দরকার, সেটা হলো বয়স ভেদে মানুষের শরীর বোঝা। বিশেষ করে কেউ যদি বাচ্চা চায়।
আর আমার আজকের ফোকাস ছেলেদের উপর নয়, মেয়েদের উপর।

শিল্পী জলি

প্রতিটি মেয়ে শিশু জন্মের সময়ই লক্ষ লক্ষ এগ নিয়ে ভূমিষ্ট হয়। অতঃপর বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছুলে ঋতুস্রাবের শুরু। তখন প্রতি সাইকেলে/মাসে মেয়েদের শরীরে কয়েকটি এগ পরিণত হতে হতে টেকে সাধারণত একটি, কখনও বা একাধিক এগ সম্পূর্ণ পরিণত হয়ে রিলিজ হয় যেনো ছেলেদের শুক্রাণুর সাথে মিলন ঘটে, গর্ভধারণ হয়। যদি মিলন না ঘটে বা নিষিক্ত না হয়, তাহলে এগ রিলিজের (ওভ্যুলেশন) আনুমানিক দুই সপ্তাহের পর ঋতুস্রাব ঘটে। এভাবেই একজন সন্তান ধারণে সক্ষম মেয়ের জীবনে নিজস্ব সাইকেল বা ঋতুচক্র চলতে থাকে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে যতদিন শরীরে এগের সরবরাহ থাকে। তথাপি সময়ের সাথে সাথে মেয়েদের সন্তান ধারণের ক্ষমতায় ভিন্নতা চলে আসে, এগের গুণগত মান কমে যায় বা নষ্ট হয়, গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে। তাই সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে মেয়েদের বয়স একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। সেই বিবেচনায় বিয়ের ক্ষেত্রেও বয়সের দিকে নজর দেয়া এবং সময়ের হিসেব রাখা দরকার। AMH (Anti-mullerian Hormone) টেস্টের মাধ্যমে জানা যায় আরও কী পরিমাণ এগস বাকি আছে ডিম্বাশয়ে।

গর্ভধারণের ক্ষেত্রে টিনএজ মেয়েদের শরীর বেশি ফারটাইল থাকলেও তাদের জীবনের অন্যান্য দিকগুলো তখন থাকে নড়বড়ে। ACOG এর মতে, (শারীরিক বিবেচনায়) মেয়েদের বয়স যখন বিশের কোঠায় তখনই গর্ভধারণ উত্তম। কেননা বত্রিশের পর থেকে মেয়েদের গর্ভধারণের ক্ষমতা কমতে শুরু করে, এবং সাঁইত্রিশের দিকে সেটি আরও দ্রুতগতিতে কমে। আর টুয়েনটিজের তুলনায় লেইট থার্টিজে গর্ভধারণ ক্ষমতা প্রায় ৫০% কমে যায়।

শুধু তাই নয় বয়স্ক মায়েদের সন্তান এবং মায়ের স্বাস্থ্য দু’টোই নানামুখী ঝুঁকিতে থাকে। টুয়েনটিজে যদি ৫২৫ এর মধ্যে একজন শিশুর ড্যাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত হবার আশংকা থাকে, সেখানে বয়স চল্লিশ হলে সেই আশংকাটি হয় প্রতি ৬৫ জনে একজন। তাছাড়া প্রি ম্যাচিউর বার্থ, প্রিএক্লামশিয়া (মায়ের অতি উচ্চ রক্তচাপ), জেসটেশনাল ডায়বেটিস (মায়ের), ক্রোমোসোমাল এ্যাবনরমালিটিস ইত্যাদির ঝুঁকি বাড়ে মায়ের বয়স বাড়তির সাথে সাথে।

আবার বিয়ে তো শুধু সন্তান উৎপাদনই নয় আরও নানাদিক আছে। বিয়েতে অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উপযুক্ত পাত্রপাত্রী নির্বাচন। এক্ষেত্রে প্রথমেই যে দিকটি বিবেচনায় আনা দরকার, সেটি হলো পাত্রপাত্রীর বয়সের গ্যাপ–বয়সের গ্যাপ কেমন হলে বিয়ে বেশি টেকে?
এমোরি ইউনির্ভাসিটি একটি গবেষণায় দেখেছে সমবয়সীদের বিয়ে টেকে বেশী– বয়সের গ্যাপ পাঁচ হলে ১৯%, গ্যাপ দশ হলে ৩৯%, এবং বিশ হলো ৯৫% তালাকের সম্ভাবনা বেড়ে যায় সমবয়সীদের মাঝে বিয়ের তুলনায়।

শুধু বয়সের গ্যাপই নয়, একজনের কখন বিয়ে করা উচিত সেটিও অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। এপ্রিল ডেভিস, লুমা লাক্সজারি ম্যাচমেইকিংয়ের ফাউন্ডারের মতে, বিয়ের সঠিক সময় তখন, যখন একজন ব্যক্তি তার ব্যক্তি জীবন এবং পেশাগত জীবন নিয়ে আত্মবিশ্বাসী এবং স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে।
সাইকোলজিস্ট ওয়ায়েট ফিশারের মতে, বিয়ের উপযুক্ত সময় লেট টুয়েনটিজ, কেননা ততদিনে পড়ালেখা এবং ক্যারিয়ার অনেকটা গড়ে নেয়া হয়ে যায়।
ক্লিনিক্যাল সোসাইল ওয়ার্কার কেলসি টরগারসন নিউরোলজিক্যাল দিক বিবেচনা করে বলেন যে, বিয়ের সঠিক সময় তখন, যখন মানুষের ব্রেইন ফুললি ডেভেলপড হয় (২৫ বছর)।
ম্যারেজ এবং ফ্যামিলি থেরাপিষ্ট এবং রিলেশনশিপ এক্সপার্ট উইনা কলিন্সের মতে, মেয়েদের বিয়ের উপযুক্ত বয়স ২৮ এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ৩২ বছর। এই বয়সে মেয়েরা নিজেদের চিনে যায়, জীবনের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, এবং জানে যে তারা কেমন পাত্র চায়। আর ছেলেরা ক্যারিয়ার গড়ে ফেলে, একা থেকে সামাজিক জীবন বোঝে। সমঝদার হয়। বাচ্চা পালনে সহায়তা করে এবং সংসারের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমোঝোতা করে, যা সুখকর পরিবার গড়ে তুলতে সহায়ক হয়।

আরও যেসব দিক রয়েছে বিবেচনার জন্যে, সেগুলোর মধ্যে ধর্মীয় দিকটি বোঝা জরুরি –পরস্পরের মাঝে ম্যাচ হয় কিনা! একই ধর্মের হলেও ভিন্নতা থাকতে পারে চিন্তা, চেতনা এবং প্রাকটিসের ক্ষেত্রে।

পার্সোনালিটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক মানুষই আছেন যারা আলোচনা করতে গেলেই চিৎকার করে, জিনিস ছুঁড়ে অথবা সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট দেয়, যা বিবাহিত জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। কেউবা আছেন বিয়ে করবেন, কিন্তু বাচ্চা নেবেন না। আবার কেউ আছেন, সেক্সে আগ্রহী নন। কেউবা চরম অলস, কেউবা কিপটে। কেউ আছে তার পরিবারের কথায় নাচেন ১০০%, যা বিবাহিত জীবনকে চিরতার পানি করে ফেলে।

বিয়ে তাকেই করা উচিত, যাকে শত বাঁধার মাঝেও মন চায় বিয়ে করতে। যে নিঃস্বার্থ, যে কর্মঠ। যে হবু পার্টনারকে সম্মান করে, প্রয়োজনে নিজেকে শুধরাতে প্রস্তুত, পার্টনারের প্রতিষ্ঠায় সহায়ক, সেক্স লাইফে আগ্রহী, আবার প্রয়োজনে কম্প্রোমাইজেও সক্ষম। যে ভালোবাসা এবং পরিবারের গুরুত্ব বোঝে এবং সর্বদা সামর্থ্যের শতভাগ দিতে প্রস্তুত।

বিয়ের চুক্তি হুট করে নয়, নানাদিক ভেবে-চিন্তে, যাচাইবাছাই করে, সময় নিয়ে অতঃপর গাটছড়া বাঁধা। আর হবু লাইফ লং পার্টনারকে কিছুটা চিনতে হলেও কমপক্ষে এক বছর সময় নেয়া জরুরি, যেনো বছরের নানা সিজনে তার নানা রূপ দেখা সম্ভব হয়।

শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.