সবার সাথেই হয়, কে বলেছে আপনাকে?

0

সারা বুশরা দ্যুতি:

কয়েক মাস আগে আমার খুব প্রিয় একজন বন্ধুর জীবনের কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি গল্প লিখেছিলাম। মূল ঘটনা ঠিক রেখে লেখার প্রয়োজনে গল্পের পাত্রপাত্রীর নাম, সময় এবং সংলাপ কিছুটা পরিবর্তিত করেছিলাম। একটি ছোট্ট মেয়ে সাত বছর বয়সে পাশের বাড়ির এক বাবার বয়সী পুরুষ দ্বারা শোষিত হওয়ার পর মানসিক ভাবে তার উপর কীরকম প্রভাব পড়েছিল সেটি নিয়ে গল্প।
মেয়েটি বড় হবার পরও পুরুষ স্পর্শের প্রতি তার ভীতি দূর হয়নি, বিয়ের রাতে তার স্বামীকে সব খুলে বলার পর তার স্বামী তাকে সময় দেয় এবং বিশ্বাস করতে সাহায্য করে যে সব পুরুষ এক নয়। লেখাটি একটি গ্রুপে পোস্ট করার পর নানান রকম মন্তব্য আসতে লাগলো। এর মধ্যে একজন নারী লিখলেন,
‘বালিকা বয়সে এসব কতই হয়… এ আর এমন কী? তাই বলে মানসিক সমস্যা হয়ে যাবে কেন? এটা বাড়াবাড়ি।’

আরেকজন লিখলেন,’আমাদের সাথেও এরকম হয়েছে। কম বেশি সব নারীর সাথেই হয়… সেটা শুনে কোনো স্বামী এতোদিন অপেক্ষা করবে না। আর স্বামী যদি স্ত্রীকে সময় না দেয় সেটাও দোষের না… টাকা পয়সা খরচ করে বিয়ে করে স্ত্রীকে সম্ভোগ করতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক। তার কাছে সামাজিক ও ধর্মীয় লাইসেন্স রয়েছে।’

কমেন্টগুলো পড়ে আমি কোনো উত্তর দেইনি। শুধু অবাক হয়ে ভেবেছি আমরা ২০১৯ এর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও কী করে ১৯৬০ এর মাইন্ডসেট নিয়ে বসে আছি? এতো লেখাপড়া শিখে, ন’টা – পাঁচটা অফিস করে, নিজের ভার নিজে বহন করার যোগ্যতা অর্জন করে কী লাভ হলো আমাদের যদি আমাদের নানী, দাদীদের আমলের ধ্যান-ধারণাগুলো নিয়েই আমরা পড়ে থাকি?

তারা পুরুষ মানুষ, তারা টাকা খরচ করে বিয়ে করেছে অতএব স্ত্রীর মন থেকে যায় থাকুক কি না থাকুক, শরীর জাগুক কি না জাগুক, ইচ্ছে হোক বা না হোক স্বামীকে সম্ভোগ করার পুরা অধিকার দিতে হবে এই নীতিতে আমরা এখনো বিশ্বাসী। বিয়ের মতো লাইসেন্স যখন আছে, তখন আবার স্ত্রীর সম্মতি কিসের? স্ত্রীর মনে ভয়, অতীতের কোনো দুঃসহ স্মৃতি, মানসিক সমস্যা এগুলো স্বামীর ইচ্ছের কাছে কোনো গুরত্ব রাখে না। এই যদি শিক্ষিত নারীদের বক্তব্য হয় তাহলে অশিক্ষিত নারীদের কাছ থেকে কী আশা করবো আমরা?

সবচেয়ে বেশি দুঃখিত হই যখন একজন নারী ওপেনলি একটি পাবলিক প্লাটফর্ম এ লেখেন যে সব নারীদের সাথেই এরকম কতকিছু হয়, সেটা এতো গুরুত্ব দেয়ার কী আছে? যেসময় পৃথিবীজুড়ে যে #মিটু আন্দোলন চলছে, সেই একই সময় বালিকা বয়সের দুর্ঘটনা গুলোকে এক শ্রেণীর নারীরা স্বাভাবিক ঘটনা বলে আখ্যায়িত করছেন। একজন বললেন অপ্রাপ্তবয়স্ক বলেই তাদেরকে যা বুঝানো হয় তারা বুঝে এবং মেনে নেয়। এভাবেই তাদের ভেতরে গেঁথে দেয়া হয় যে মেয়েদের সাথে এসব হতেই পারে, এসব গিলে ফেলতে হয়. বলার মতন বা মনে রাখার মতন জিনিস এগুলো নয়। এতো আর সেলেব্রিটিদের যৌন নিপীড়ন এর ঘটনা নয় যে মিডিয়া তোলপাড় হবে। এগুলো অতি সাধারণ ঘরের কাহিনী, যা বহুদিন ধরেই চলে আসছে। আর সেখানেই আমার প্রশ্ন, যুগ যুগ ধরে যে বালিকা বয়স থেকে মেয়েরা abused হচ্ছে এবং তাদেরকে সেগুলো চেপে যাওয়ার, ভুলে যাওয়ার পরামর্শ ঘর থেকেই দেয়া হচ্ছে, এই ব্যাপারটি কি কখনোই শেষ হবে না?

যতদিন আমরা লোকলজ্জার ভয়ে মেয়েদের শেখাতে থাকবো যে এসব কাউকে বলতে হয় না, নিজেকেও ভুলে যেতে হয়, ততদিন আত্মীয় ও বন্ধুর বেশে ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা বর্বরগুলো এসব নির্দ্বিধায় করার সাহস ও সুযোগ পাবে। এটা জেনেও আমরা এসব হতে দিচ্ছি, বন্ধ করতে এগিয়ে আসছি না।

অচেনা স্পর্শের ব্যাপারে মেয়েদের সচেতন করা, নিজেকে রক্ষার জন্য ছোটবেলা থেকেই তাদের তৈরি করা, বন্ধুর মতো বালিকা বা কিশোরী মেয়েটির সাথে সব কথা শেয়ার করা, অনভিপ্রেত কিছু ঘটে গেলে মানসিক সাপোর্ট দেয়া এই ব্যাপারগুলো ইদানিং আমাদের সমাজে ঢুকেছে। আমরা চেষ্টা করছি এই এস্পেক্টগুলো ফলো করতে। কিন্তু এই যে চেপে যাওয়ার ব্যাপারটা বা এরকম তো কতোই হয় (যেন হওয়াটা নরম্যাল) বলে ব্যাপারটাকে হালকা করার প্রয়াস এই এসপেক্টটাকে আমরা এখনো আনফলো করতে পারছি না। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে বলতে হয় আমরা চেষ্টাও করছি না….

কবে আমরা এই চেষ্টা শুরু করবো? কবে আমরা ঘরের কথা শুধু ঘরের মধ্যে এবং মা-মেয়ের মধ্যে ধামাচাপা দেয়া বন্ধ করবো? কবে সেই দিন আসবে যখন কোনো সাত বছরের বালিকা পুরো পরিবারের সামনে সেই বিকৃত রুচির লোক যাকে সে কাকা, চাচা, ফুপা বা খালু ডাকে, তাকে সবার সামনে জিজ্ঞেস করবে যে আপনি আমার সাথে এমন কেন করেছেন? কবে সেই বালিকার মা/বাবা এটা শুনে সেই মুহূর্তে পুরো পরিবারের সামনে সেই লোকটাকে যথাযথ শাস্তি দিবে? কবে একটি বালিকা এই ধারণা নিয়ে বড় হওয়া বন্ধ করবে যে এগুলা সব মেয়ের সাথেই হয়?

কবে আসবে সেই দিন?

বেডফোর্ড, ইংল্যান্ড।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 60
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    60
    Shares

লেখাটি ৭৪২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.