এই পতাকাই আমাদের সকল শক্তির শেষ উৎস!

0

লুতফুন নাহার লতা:

পতাকা সেলাই করতে বসেছি।। আমার আগের পতাকাটি, নিউইয়র্ক শহরে বাংলাদেশের নানান ইস্যুতে এই মিছিল মিটিং করতে গিয়ে হাত বদল হয়ে গেছে, তো আর কী করা! আজ আবার বহু বছর পরে নিজে হাতে পতাকা সেলাই করছি।

খুব মনে পড়ছে ছোট বেলায় প্রথম পতাকা সেলাই করার স্মৃতি। ১৯৭১ এর জানুয়ারী মাস। তখন চারিদিকে জয়বাংলার জয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবে হবে, সব বাড়িতে পাকিস্তানের পতাকা বর্জন আর বাংলাদেশের পতাকা উড়াচ্ছে সবাই। তাই দেখে আমরাও শুরু করলাম জয়বাংলার পতাকা প্রজেক্ট। আমরা তখন কিছুদিনের জন্য স্কুলের ছুটিতে খুলনা থেকে ফকিরহাট, মামার বাড়িতে গিয়েছি। আমার বাবা তখন চাকরি সূত্রে ওদিকটায় ছিলেন। বাবার সাথে ছুটির দিনগুলোতে সময় কাটাবার জন্যে মা আমাদেরকে নিয়ে গ্রামে এসেছেন।

আমার বড় মামীর একটা পা মেশিন ছিল সিঙ্গারের। সামান্য কিছু টাকা ডাউন পেমেন্ট দিয়ে আর কিস্তিতে কিস্তিতে শোধ করবেন এমন একটি ব্যাবস্থা করে, খুলনার বড়বাজারের সিঙ্গারের সোরুম থেকে মামী এই সেলাই মেশিনটি কিনেছিলেন। অনেক লক্ষী মানুষ দেখেছি জীবনে কিন্তু আমার মামীর মত এমন বুদ্ধিমতী আর লক্ষ্মী মানুষ আর হয় না। সারা জীবন টুক টুক করে কত কী যে তিনি করেছেন সংসারের জন্য।

তো, সেই সেলাই মেশিনে সবুজের ভেতরে গোল লাল সূর্য আর তার উপরে হলুদ রঙে বাংলাদেশের ম্যাপ সেলাই করেছিলাম মনে পড়ে। তখন সবে সেলাই মেশিনে সেলাই করা শিখছি, ভালো করে মেশিনের গতি কন্ট্রোল করতে পারি না। ম্যাপের নানা বাঁকে এসে মেশিন স্লো করতে হয় (যদিও আগেই বড় মামী হাতে সুঁই সুতো দিয়ে টাক দিয়ে দিয়েছিলেন ) বার বার বাংলাদেশের ম্যাপের বাঁকে বাঁকে এসে গতি কমাবার চেষ্টা করছি, কিন্তু পায়ের গতি তখনো ব্যালান্স করার মতো অবস্থা হয়নি। একবার আর কন্ট্রোল রাখতে পারলাম না, ঘ্যাচাং করে সুঁইটা আমার বা হাতের মধ্যমায় চার টুকরো হয়ে ভেঙ্গে ঢুকে গেল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পতাকা। ডান হাত দিয়ে পতাকাসহ বাম হাত চেপে ধরে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছি। কাঁদছি ব্যথায় নয়, ভয়ে।

আমার মামা দুই হাতে চেপে ধরে অনেক ধৈর্য নিয়ে তার টুইজার দিয়ে টেনে টেনে তুলে দিলেন আঙুলের সুঁই। হাতের আঙুল জুড়ে মস্ত ব্যান্ডেজ নিয়ে পরদিন দেখলাম সেই পতাকা মামা বাড়ির টিনের চালের উপর পত পত করে উড়ছে। মামাতো ভাই লাঠির আগায় পতাকা বেঁধে ছোটদের নিয়ে মিছিল করতে করতে একসময় মই বেয়ে উঠে উড়িয়ে দিয়েছে।

এরপরে ছুটি শেষে আমরা ফিরে এসেছি খুলনায়। মার্চের প্রথম সপ্তাহে একদিন স্কুল থেকে বলে দিল, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে বন্ধ হল স্কুল। কবে খুলবে জানে না কেউ। অনেক বড় বড় ঝলমল স্মৃতি ভুলে গেছি, কিন্তু সেই দিনটির সেই স্কুল থেকে ফিরে আসা স্মৃতিপট থেকে কিছুতেই হারায় না। ২৫ মার্চের পরে খুলনায় পাকিস্তানী মিলিটারি এসে ভরে গেছে। কারো বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখলে পুড়িয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মানুষজন গুলি করে মেরে ফেলছে।

ভয়ে আমাদের খুলনার বাড়ি থেকে সবার মতো আমরাও নামিয়ে রেখেছি পতাকা। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ভয়াবহ অবস্থা চারিদিকে। খুলনায় আর নিরাপদে থাকা যাচ্ছে না। আবারও কিছুদিন পরে মামার বাড়ীতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছি আমরা। আমাদের আত্মীয় স্বজনেরা ছাড়াও চেনা জানা অনেক পরিবার একসাথে। সেখানে অনেক মানুষ। সবাই চেষ্টা করছি খুব নিরবে থাকার। সন্ধ্যাবেলায় লেপের নীচে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনছি। যুদ্ধ চলছে। মানুষ পায়ে হেটে পাড়ি দিচ্ছে দেশ। মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে দেশান্তর। মানুষের রক্তে ভেসে চলেছে সারা বাংলাদেশ। তবু একদিন স্বাধীন হবে আমাদের এই দেশ, সেই স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছে মানুষ।

১৯৭১ এর ১৬ ই ডিসেম্বরে বিজয় সূচিত হলো। আমাদের খুলনা স্বাধীন হলো আরো একদিন পরে, ১৭ই ডিসেম্বরে। দেশ স্বাধীন হয়েছে! সেই সময়, ঠিক সেই সময় সবাই বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। আমার মামা বাড়ীর সামনের রাস্তায় সমবেত মানুষ চিৎকার করে জয়বাংলা স্লোগানে মুখরিত করে তুলেছে চারিদিক। আমরা খুশীতে পাগলের মতো জয়বাংলা শ্লোগান দিচ্ছি। আমার দাদা জয়বাংলা বলতে বলতে কেঁদে ফেলছে বারবার। টিনের চালের উপরে উড়িয়ে দেবার জন্যে আমরা আমাদের সেই পতাকা খুঁজছি। বড় মামী আমার সেলাই করা সেই পতাকাটি তার গোপন সিন্দুকের তলা থেকে বের করে আনলেন।

এই তো আমাদের পতাকা। মামা বাড়ীর উঠোন জুড়ে আমরা সব ভাইবোনেরা, আত্মীয় স্বজনেরা মিলে জয়বাংলা শ্লোগানে শ্লোগানে ভরিয়ে তুললাম সারা আকাশ, বাতাস ঐ পতাকার দিকে চেয়ে। সেইদিন ছিল আমাদের বিজয়ের দিন। সকল আক্রমণ, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, নির্মমতার অবসান ঘটিয়ে আমাদের জয়ী হবার দিন।

পরদিনই আমরা আমাদের মামা বাড়ির গ্রাম থেকে পাগলের মতো বেরিয়ে পড়েছি। রেলগাড়ি- টারি কিছুই চলছে না। রিকশায় করে এই দীর্ঘ পথে মা আমাদের নিয়ে ছুটে বেরিয়েছেন খুলনায় আসবেন বলে। আমার বাবার খবর পাচ্ছি না আমরা তখন বেশ কতদিন। আমাদেরকে দ্বিতীয়বার গ্রামে পাঠিয়ে একাই খুলনায় রয়েছেন বাড়ীর পাহারায় যুদ্ধের শেষ ক’টা দিন। বাবা বেঁচে আছেন কিনা আমরা এখনো জানি না।

নদীর ঘাটে এসে আমরা আটকে গেছি, খেয়া পারাপারের কেউ কোথাও নেই সারা শহর থেকে মিলিটারি পালাচ্ছে। রাজাকার, আল বদর ,আল শামস পালাচ্ছে! অনেক কষ্টে অন্য অনেক যাত্রীর সাথে আমরাও নৌকা একটা পেয়ে, পার হয়েছি। খুলনা শহর যেন অচেনা এক শহর তখন পথের দুধার দিয়ে ছুটে চলেছে মানুষ। মানুষ হাসছে , মানুষ কাঁদছে যে যাকে পারছে জড়িয়ে ধরছে! চিৎকার করে কথা বলছে সবাই। লোকে লোকারণ্য চারিদিক। জয়বাংলা শ্লোগানে আকাশ বাতাস কাঁপছে, সবাই ছুটছে কিন্তু ঠিক কোথায় যাচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না । কেবল ঊর্ধশ্বাসে ছুটছে মানুষ! এ এক অসাধারণ ঐতিহাসিক মুহূর্ত!

স্বজন হারানোর আহাজারীতে বাতাস ভারী , আনন্দ আর অশ্রু একই ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে । মানুষ চলেছে তাদের আপনজন যাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল তাদের যদি জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায় সে আশায় মিলিটারি ক্যাম্প গুলোতে । বয়রা, খালিশপুর পাওয়ার হাউস, জেলা স্কুলের মাঠ, ডি সি অফিসের সামনে, পি আই এ ( পাকিস্থান এয়ার লাইন্স ) অফিসের সামনে, শহীদ হাদিস পার্কের দিকে, লোকে লোকারণ্য। সারা শহরে এতো মানুষ!

সারা বাংলাদেশের বুকের তলায়, পাকিস্তানি নরখাদক বাহিনীর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা প্রতিবাদের ডিনামাইটটি ফেটে, তোলপাড় করে দিয়ে গেছে গেছে দীর্ঘ এই নয় মাস ধরে। আজ আকাশ, বাতাস, ধুলো, মাটি গাছ পালা সব আনন্দে, বিষাদে আর্তনাদ করছে যেন! দেশ স্বাধীন হয়েছে ! বাতাস ভারী হয়ে আছে লাশের গন্ধে। থমথম করছে আকাশ।

মানুষ ছুটছে মুক্তিবাহিনী দেখতে। খুলনা শহরে মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকেছে গতকালই। সার্কিট হাউসের মাঠে, পাকিস্থানী মিলিটারীর খুলনার জি ও সি খিজির হায়াত খান, বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় যৌথ বাহিনীর কাছে আত্ম সমর্পণ করেছে।

অগনিত লাশ ভেসে যাচ্ছে রুপসা’র জলে বিশেষ করে গল্লামারী ব্রিজের নিচ দিয়ে। মানুষ ঊর্ধশ্বাসে সেদিকে ছুটছে , সবাই বলছে গল্লামারীতে নাকি ঢাকার রায়ের বাজারের মতো বধ্যভূমি বানিয়েছিল খানসেনারা। নদীর দুই ধারে অসংখ্য মানুষের লাশ। পচা গলা কাদা মাখা। কংকাল আর কংকাল, মাথার খুলি আর মাথার খুলি। যেন মহাপ্রলয়ের পরে শান্ত হয়ে যাওয়া বিধ্বস্ত ধরিত্রী এই বাংলাদেশ। খুব কি দূরের ইতিহাস আমাদের জীবনের এইসব বেদনার করুণ কাহিনী!

আজ এই পতাকা সেলাই করতে বসে কেনো চোখ ভিজে যাচ্ছে বারবার! ওদের কথা মনে পড়ছে যাদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের এই রক্তমাখা পতাকা। আমরা আজ যাদের ভুলতে বসেছি। ভুলেছি ওদের কথা। যাদের আদর্শ ও বিশ্বাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বুনে দিয়েছি সারাদেশে। বারে বারে পরিবর্তন করেছি সংবিধান! তবু জানি, নিশ্চিত জানি এই পতাকাই আমাদেরকে সকল সত্য ও সুন্দরের দিকে হাত ধরে নিয়ে যাবে। এই পতাকাই আমাদের সকল শক্তির শেষ উৎস !!-

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 245
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    245
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.