আমার এ জীবন সরিসৃপের নয়, মানুষের

0

মুশফিকা লাইজু:

সম্ভবত কৈশোরে বাবাই প্রথম আমার মাথাটা টেনে তুলে উপরে লম্বা করে দিয়ে বলেছিলেন, দেখো তুমি মানুষ, এই পৃথিবী তোমার। তোমার অর্জিত জ্ঞান তোমার পথ চলার আলো। আর সাহসই তোমার বাহন। হ্যাঁ, ঠিক তাই।
আর তাই হয়তো এ জীবনে মাথাটাকে আর নোয়াতে পারলাম না। শত বঞ্চনা, দুঃশাসন, নিপীড়ন ও প্রতারণা, সবকিছুর মুখোমুখি আমাকে হতে হয়েছে জীবনে একাধিকবার। তবু ভিতর থেকে কেউ একজন বার বারই সংকেত দিয়েছে- এ জীবন মাথা নোয়াবার নয়।

একটি পেশা সংক্রান্ত সমাবেশে #মিটু প্রসঙ্গে ছোট্ট একটা উপস্থাপনা ছিল। উপস্থিত সহকর্মীদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয়েছে যে আমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। আমি সেখানে যা বলতে গিয়েছিলাম, তা তারা খোলা মনে গ্রহণ করেছে। প্রোগ্রাম শেষে ল্যাপটপ ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতে এক কর্মী বন্ধু জানালেন, উপস্থিতদের মধ্যে কেউ একজন তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, #মিটু তে যুক্ত হওয়ার পর আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে কিনা!

বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি অতি সঙ্গত প্রশ্ন! জবাবে জানালাম- না, সংসার এখনও ভাঙেনি, টিকে আছে। তবে এতো বড় সত্য প্রকাশের পর সংসারটি যে টিকে আছে, আমার চারপাশের অনেকের কাছে সেটাই বিস্ময়। বিস্ময় তো বটেই, নারীমুক্তির নিমিত্তে পৃথিবী যখন উত্তাল, ঠিক তখন শুধুমাত্র সত্য প্রকাশের অপরাধে বাংলাদেশের বহুনারী হারিয়ে ফেলছে তার সম্পর্ক, ভালবাসা এবং পরিবার।

মানুষ মানুষের মতোই বেড়ে উঠে প্রকাশিত হয়। সেখানে নারী বা পুরুষ কোন আলাদা ব্যাপার নয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র শারীরিক পরিচয়ের জন্য মানুষের মন জাগতিক বিকাশ বা প্রয়োজন প্রভাবিত হয় না, কিংবা থেমে থাকেনা। তবু সমাজ ঠিক করে দিয়েছে এক অলঙ্ঘনীয় ট্যাবু।
বিবাহপূর্ব কোন প্রেম নারীর থাকবে না, থাকলেও তুমি বলবে না- যত কঠিনতর হউক না কেন, থাকবে সম্পূর্ণ গোপন। শ্বশুরবাড়ীর কেউ কিংবা স্বামী সে সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করলে মুখের উপর অস্বীকার করতে হবে। তাতে জীবন যায় যাক, স্বপ্ন ভাঙে ভাঙুক। নারী তুমি সতী, তুমি সতী এবং তুমি সতী। তোমার সম্মান, তোমার মযার্দা তোমার স্বপ্ন, তোমার মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে সব তুমি বাঁধা দিয়েছো তোমার যোনীর গভীরে। তোমার জ্ঞান, সৃজনশীলতা, তোমার উদ্দ্যম, তোমার উৎকর্ষ সবই নির্ভর করছে তোমার যোনী কতটা অস্পর্শ, তার উপরে।

মুশফিকা লাইজু

বিয়ের আগে নারীর কোনো প্রেম বা কোনো নিপীড়নের গল্প প্রকাশিত হলে তা কাজ করে তীব্র অসম্মানের, বঞ্চনার আর বৈষম্যের। যা একটা পুরুষের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো। পুরুষেরা ঠিক বিয়ের পরে গর্বভরে জানান দেয়, কার কার সাথে তার বিবাহপূর্ব প্রণয় ছিল। কখনও কখনও যৌনসম্পর্কেরও ঘোষণা দেন কেউ কেউ। এককাঠি উপরে উঠে তার রসালো বর্ণনাও করেন। তাতে সদ্য বিবাহিত স্ত্রী কতোটা যন্ত্রণাকাতর হোন, তা উপভোগ করেন।

আমি একজন পুরুষের গল্প জানি, যে কিনা, বিয়ের আগের রাতে ব্রোথেলে গিয়েছিলো, যৌনকর্মীর সঙ্গে থেকেছিল, নিজের পুরুষত্বের পরীক্ষা করার জন্য। কতোটা হীন এবং দীন হলে একজন মানুষ এই অমানুষের প্রবৃত্তিতে প্রবৃত্ত হয়। পুরুষ এমন তয়!! শুধু ভাবনা, ‘এ শিকল ভাঙবো আমি কেমন করে’?

ভাঙতে তো হবেই! প্রতিবেশের এই নারীর প্রতি চাপিয়ে দেয়া ট্যাবু ভাঙার গুরু দায়িত্ব নারীরই। এখন সময় এসেছে নারীর ঘাড় ত্যাড়া করে এবং মাথা সোজা করে মুখোমুখি দাঁড়ানোর। সটান জবাব হওয়া উচিৎ। একজন মানুষ যেভাবে বেড়ে উঠে, আমি নারী সেভাবেই বেড়ে উঠেছি, পুরুষ হিসেবে তোমার যা প্রয়োজন, প্রত্যাশা এবং পাওনা- আমারও তাই। একজন পুরুষের জীবনে যদি ‘অলিগলি রাজপথ’ থেকে থাকে, একজন নারীরও তা থাকতে পারে; ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়। তার জন্য আমি নারী নিশ্চয়ই দায়ী নই, লজ্জিত নই মোটেও। আমার প্রতি হওয়া অন্যায়ের জন্য আপনাদের পুরুষকুলের লজ্জিত হওয়া উচিৎ। মাথা নত করে আপনার সময়ের এবং আপনার পূর্বপুরুষদের জন্য নারীর প্রতি হওয়া নির্যাতনের আর নৃশংসতার জন্য মাথা নিচু করে আগামী পৃথিবীর নারীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিৎ।

আমার জীবন মানুষের জীবন, মাথা উঁচু করে বাঁচার জীবন। মানুষ হিসেবে জীবনকে উপভোগ করা আমার অধিকার। পুরুষতন্ত্রের বেঁধে দেয়া পথে আমি আমার জীবনকে পরিচালিত করতে না-ও পারি। আর হ্যাঁ, আপনাদের বলছি, আমি একজন স্পর্ধিত নারী যে মানুষের জীবন যাপন করি, সরিসৃপের নয়।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 106
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    106
    Shares

লেখাটি ৫৯৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.