বৈবাহিক সমীকরণ: শত্রুতা নয়, ভালবাসা বিনিয়োগ করুন

0

সৈয়দা সাজিয়া আফরীন:

ঘটনা এক- রোমেনা ৭০। একমাত্র সন্তান মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন, ভালো আয় করেন। সাংসারিক তাবৎ কাজের জন্য আলাদা আলাদা হেল্পিং হ্যান্ড আছে। বউ না আসা পর্যন্ত তিনি সব তদারকি করতেন। এখন অর্থের তদারকিসহ সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব এবং ক্ষমতা ছেলের বউ ঝুমুর হাতে।
উল্লেখ্য ঝুমুর সাথে রোমেনার বনিবনা ভালো না, শুরু থেকেই এবং এর পেছনে উল্লেখ করার মতো তেমন কারণও নেই। ঝুমু তার শাশুড়িকে মুখাপেক্ষী, সংকুচিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে চায় এবং বলা বাহুল্য তিনি শতভাগ সফল। ঝুমু মাঝে মাঝে শাশুড়ির নৈমিত্তিক প্রয়োজন খাবার, ওষুধের খরচ সংকোচন করেন এবং প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করেন। আশপাশে বলাবলি হয়, কানাকানি হয়, ঝুমু এসব গায়ে মাখেন না কারণ স্বামীর ভূমিকা তার পক্ষেই।

ঘটনা দুই-ভালবাসাবাসি করে বিয়ে করেছেন রোকন আর মিনা। রোকন চাকরি করে বহুজাতিক কোম্পানিতে। একমাত্র ছেলে তিনি বাবা-মার। বড় আদরে লালিত পালিত হয়েছেন তিনি। সে সূত্রে ছেলের বউ মিনার আদরের ঘাটতি নেই কোথাও। কিছু বিষয়ে তো রোকনের মা রীতিমতো আদিখ্যেতাই করেন ছেলের বউকে নিয়ে। এটা সেটা কিনে দেন। আবদার রাখেন। ছেলের বউ এর যে কোনো গুণের বর্ণনা খুব গর্বের সাথেই বলে বেড়ান।

রোকনের বাবার নিজের বাড়ি আছে শহরের কেন্দ্রেই। বাড়িভাড়া দিয়ে পরিবারটি বেশ স্বচ্ছন্দেই চলে, উপরন্তু বাবার টাকাতে তাদের বিদেশ ঘোরা, এক্সপেন্সিভ শপিং এসবও হয়। এ পরিবারটিতে দৃশ্যমান কোনো কনফ্লিক্ট নেই, তবু মিনা ঠিক ভালবাসতে পারেননি স্বামীর পরিবারকে। বেশ নির্লিপ্ততা দেখা যেত তার আচরণে। মিনা রোকনের ঘরে যখন সন্তান আসে, সে সময় মিনা আলাদা স্পেস চান, আলাদা ঘর চান। না, তার স্বামীর বাবা-মা একটুও না করেননি। খুশিমনেই আলাদা থাকতে দিলেন ছেলে- ছেলের বউকে। সবদিক থেকে পুত্রবধুর সুবিধা বিবেচনা করা হলেও মিনা তার স্বামীকে বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখতে বাধা দেন, অকারণ কটুক্তি করেন এবং সফল হোন। রোকনের বাবা-মা দীর্ঘশ্বাস চাপেন, আর সুখে থাকার অভিনয় করেন।

ঘটনা তিন-(ঘটনাটি অন্তত দশ বছর আগের) জমিলার বয়স ষাট ছুঁয়েছে। কৃষি নির্ভর পরিবার তার। ছেলে শহরে ছোটখাটো ব্যবসা করে। গ্রামের জীবন হলেও অর্থের অভাব নেই। সচ্ছল আর পরিচ্ছন্ন জীবন। বয়সের ভার থাকলেও প্রচুর খাটতে পারেন। খুব ভালবেসেই ছেলের বউকে বাড়ির কাজ করতে দিতেন না। ছেলের বউ সুন্দরী, এ নিয়ে পাড়ায় তিনি গর্ব করতেন। ছেলের ঘরে পরপর দুটি সন্তান আসে, সে সব কাজও তিনি করেন। ছেলের বউ সকাল-বিকাল সাজে, শাড়ি চুড়ি কিনতে যায় বাজারের দোকানে, পাড়ার মেয়েদের সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটায়। শাশুড়ি যখন আরেকটু বৃদ্ধ হোন, সময়টা আর সেরকম থাকে না। জমিলা সন্তানের ঘর থেকে আশ্রয়হীন হোন। পাড়ার এ বাড়ি ও বাড়ি খাবার চেয়ে খান। অসুস্থ থাকলে যেতে পারেন না বলেই না খেয়ে পড়ে থাকেন। ছেলের ভূমিকা এখানে উহ্য। কারণ ছেলের দায়িত্ব নেবার অস্বীকৃতিই জমিলার অসহায়ত্বের বড় একটা কারণ।

হয়তো একটি কমন আর প্রচলিত শত্রুতার মিথ ওদের প্ররোচিত করেছে বৈবাহিক সম্পর্কের সম্পর্কগুলোকে বাতিল করতে। আমি এরকম যাদের জানি, তারা সবাই কঠিন যুদ্ধে জিতে যাবার মতো অনুভব করে। যদিও এটা ঠিক জেতা নয়। কিছু একটা না পাওয়া, যা পাওয়া যেতে পারতো অনায়াসেই।

কথায় আছে “যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা”-এ ঘটনাগুলোয় দেখতে পাই, দ্বন্দ্বের কোনো কারণ না থাকা সত্ত্বেও এখানে একটা পক্ষ সম্পর্কে নির্লিপ্ত থেকেছে। যদি বলি অত্যুক্তি হবে না যে মনে অকারণ বিদ্বেষ বা ঘৃণা লালন করেছে। পরিবারে অনৈতিক প্ররোচনা বা নেগেটিভ একটা ইনফ্লুয়েন্স তৈরি করে স্বাভাবিক সম্পর্কগুলোতে তিক্ততা ভরে দিয়েছে।
এসব অবশ্যই কাম্য নয়। আমরা যা কামনা করি না তা ঘটে যায়, ঘটতে থাকে।

সৈয়দা সাজিয়া আফরীন

আমি তিনটি গল্প সাজিয়েছি যেখানে বউ এর ভূমিকা প্রশ্নসাপেক্ষ বা নৈতিকতা বিবর্জিত। অপোজিট কোন গল্প আনিনি সচেতনভাবেই, কারণ এ গল্প বলতে শুরু করলে শেষ করা সম্ভব হবে না। বেশিরভাগ বিয়েতেই বউটিকেই নিতে হয়েছে অন্য পরিবারের সদস্যদের অকারণ হিংসা আর ঘৃণার বোঝা। যে ঘৃণার উদ্ভব হয় বিয়ে নামক একটা রিচুয়ালের মাধ্যমে। অন্য পরিবার থেকে আসা মেয়েটিকে ভালবাসবার, শ্রদ্ধা করার কোনো ইনফ্লুয়েন্স আসে না কোনদিক থেকে। খানিকটা পাওয়া যদিওবা হয়, সেটা উপরি পাওয়া, এটা আশা করা যায় না।

ভায়োলেন্স এর আলাপে গেলাম না, এগুলো চির অমীমাংসিত। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা ছেয়ে যায় নতুন নতুন বীভৎসতার ঘটনায়। ধরুন টিপিক্যাল এক্সপেক্টেশন অনুযায়ী বউ ঘরের কাজ করেছে, বাপের বাড়ির যৌতুক এনেছে চারপদ রান্না করে, সংসারের হাড়ভাঙা কাজ করে দু চারটা টিপ্পনি শুনে রাতে অকারণ পিট্টি খেয়ে ঘুমিয়েছে। যে লোক স্ত্রীর উপর সকাল-বিকাল নির্যাতন করে, সে আবার মাকে ভীষণ ভালবাসবার গালগল্প করে। যে নারী তার স্বামীকে তার বাবা-মায়ের সাথে ন্যুনতম যোগাযোগ করতে বাধা দেয়, সে আবার বিবাহিত ভাইকে নিজের মায়ের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে পরামর্শ বিলায় বা উঠতি বয়সের পুত্রকে বলে, তোর বউ আমায় সম্মান করবে তো?!

এরকম হাজারো সাদা নিপীড়নের ঘটনা যেখানে ভায়োলেন্স নাই, কিন্তু মানসিক এবং আর্থিক পীড়ন থাকে। এসবের যৌক্তিক কোনো উৎস নেই। এমনকি খুব গতানুগতিক বা সাধারণ ব্যাখ্যায়ও না।
বিয়ে সম্পর্কটা শুরু হয় একটা অলিখিত দ্বন্দ্ব নিয়ে। যে জিতবে সে সিকান্দার টাইপের অনুভব থাকে দুই পক্ষেই। অথচ পরিবার নামক টিমটার সুস্থ আর স্বাভাবিক অস্তিত্বের কথা ভাবা হয় না, ভাবা হয় না কীভাবে সমস্যাকে মিনিমাইজ করা যায়? কতটা এক্সপেকটেশন রাখা যৌক্তিক, কতটা নয়? পৃথিবীর সব মানুষের একটা মানব ডিগনিটি থাকে অহং থাকে সেটাতে আঘাত করা হচ্ছে কী না। সীমাটা কোথায় টেনে রাখা দরকার?

আমাদের সবাই প্রায় সবাই এক একটা পরিবার থেকে এসেছি। দুজন নারী পুরুষ মিলে একটা পরিবারের জন্ম দেন। দুপাশে থাকে দুই প্যারেন্টাল পরিবার, আত্মীয়, আহুত বা অনাহুত সমাজ। সম্পর্কটার ভেতরে একটা অদৃশ্য টক্সিক নিয়ে আসে এইপক্ষ বা অন্যপক্ষ বা উভয়েই। অবশ্যই বেশিরভাগ ঘটনায় বউটির সম্পর্কের জীবন হয় সবচে অনিশ্চিত।

ঘৃণার আদান প্রদানে বিষয়টি হয়ে ওঠে শত্রুর সাথে বসবাস বা কঠিন পরিবেশে অস্তিত্ব রক্ষার বা সারভাইভাল টেস্ট এর মতো। এটা যে কোনো একটা দিকে ভাঙনকে আমন্ত্রণ জানায়।
বউটি যখন আগ্রাসী, তখন সামাজিক ক্ষেত্রে সে প্রত্যাখ্যাত হয় ঘৃণিত হয়। সামাজিক মাধ্যমে প্রায় চোখে পড়ে বউকে নিয়ে ট্রল বা ধর্মের শাপ শাপান্ত। কিন্তু যখন একটা পুরো পরিবার মেয়েটার বিপরীতে আক্রমণাত্মক হয়, তখন বিষয়টা নিয়ে আহ্লাদিত আলোচনা ছাড়া খুব একটা সামাজিক তদবির দেখিনি।
পরিবার কোনভাবেই কোন অংকেই যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে না, হওয়া উচিত না। দুটি ভিন্ন পরিবারের ছেলেমেয়ে নিয়েই বিয়ে ইন্সটিটিউট বা পরিবারের গোড়াপত্তন।

আপনি নারীবাদী হোন, বা না হোন, নারীর উপর ঘটে যাওয়া বঞ্চনার খবর অস্বীকার করতে পারেন না এবং অস্বীকার করতে পারেন না প্রতিদিনের পত্রিকায় পারিবারিক নির্যাতনের খবর। আপনি বলতে পারেন না আপনার চারপাশে আপনি গণহারে নারীর উপর পারিবারিক (বৈবাহিক) নিপীড়ন দেখেননি।

যদি সেটা মানবার মত মানসিক স্থিতিতে আসেন, তবেই অন্তত এটুকু অনিশ্চয়তা দূর করতে ভূমিকা রাখতে চাইবেন।
উপসংহারে বলতে চাই, বিষ কিনে এনে সেটা গিলবার পর সেটাকে ক্যান্সারের প্রতিষেধক ভেবে সুখাহত হওয়া আর প্রতিহিংসা দিয়ে একটা সুস্থ পরিবার গঠনের চেষ্টা একইরকম বিষয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 244
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    244
    Shares

লেখাটি ১,১৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.