১১৭তম দেশ সিয়েরা লিওনে উড়ালাম লাল-সবুজ পতাকা!

0

নাজমুন নাহার:

বিজয়ের মাসে বিশ্বজয়ের একশ সতের’তম দেশে সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউনে পৌঁছলো বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা!
তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই বাংলাদেশ! তাই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে পৃথিবীর পথে পথে আমার এই ছুটে চলা! এই বিজয়ের মাসেই বাংলাদেশের পতাকা যাবে বিশ্বের মোট একশো পঁচিশ’টি দেশে! তারপর এক এক করে চলতে থাকবে বাকি সব দেশে!

এবারের গিনি যাত্রা পথে দুর্দান্ত আঠারো ঘন্টার সেই বিপদসংকুল মুহূর্তগুলো আমাকে অনেক অভিজ্ঞতা দিলো! মধ্য রাতে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়া, ক্ষুধার্ত অবস্থায় শুধু আলু আর বাদাম খেয়ে থাকা দুইদিন কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়! পশ্চিম আফ্রিকা ভ্রমণ যে এতো কঠিন হবে তা আমি চিন্তাই করতে পারিনি! প্রচণ্ড রোদ, চারিদিকে ভীষণ ধুলোবালি, ভাঙা রাস্তা, দূরপাল্লার বাস, ট্যাক্সি সব কিছু পুরনো!

মধ্যরাত তিনটা, হঠাৎ করে আমাদের কার’টি চলন্ত অবস্থা থেকে স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেলো! ড্রাইভার তৎক্ষণাৎ আমাদেরকে বললো বের হয়ে বাইরে দাঁড়াতে! চারদিকে কী ভয়ানক অন্ধকার! দু’পাশে জঙ্গল, জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসছে পোকা মাকড়, জন্তু জানোয়ারের ডাক! চারিদিকে কিছুই দেখা যাচ্ছে না!

আমি আকাশের দিকে তাকালাম! আকাশে অনেক তারা! মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করলাম! প্রচণ্ড ধূলোমাখা অন্ধকার জংলী পথে আমরা আটজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছি, কোথাও কেউ নেই! এর মধ্যে ড্রাইভার গাড়ি ঠিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে! কার’টি অনেক অনেক পুরানো, সত্তর সালের হবে সম্ভবত!

আমরা বিসাও হতে কোনাক্রি আসছিলাম! অনেক লম্বা পথ! রাত নয়টার মধ্যে আমাদের গিনির রাজধানী কোনাক্রিতে পৌঁছানোর কথা ছিলো! ল্যান্ড বর্ডারের ফর্মালিটিজ, ভাঙা রাস্তা, বৃদ্ধ ড্রাইভার, ম্যানুয়ালি ফেরি দিয়ে নদী পথ পার হওয়া সব মিলিয়ে মধ্য রাত হয়ে গেলো গিনি দেশের কোনো এক অজানা পথে!

আটজন যাত্রীর মধ্যে আমিই ছিলাম একমাত্র টুরিস্ট! সবাই গিনির স্থানীয়! একজন থাকে প্যারিস, আরেকজন আইসল্যান্ড! ওদের সাথে পথে আসতে আসতে অনেক কথা হলো! বন্ধুত্ব হলো! আমি এই অন্ধকার রাতে ভয় পেলাম না! পাঁচটা বাজলো! অনেক চেষ্টা করেও গাড়ি ঠিক হলো না! আমরা সবাই ঠিক করলাম এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না! কোথাও কোনো ঘরবাড়ি আছে কিনা খুঁজে বের করতে হবে! এই পথগুলোতে মানুষ কিডন্যাপ হয়! যাত্রী বন্ধুরা সবাই আমাকে নিয়েই টেনশনে আছে!

আমরা প্রয়োজনীয় ব্যাগ নিয়ে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম কোনো মানুষের বসতবাড়ি খোঁজার জন্য! অন্তত নিরাপদে আমাদের কিছুটা আশ্রয় হবে! আধাঘন্টা হাঁটার পর আজান শোনা গেলো! আমরা আরো হাঁটলাম! অন্ধকার কিছুটা কমতে থাকলো! তারপর খুঁজে পাওয়া গেল কতগুলো শনের ঘর বাড়ি! রাস্তার পাশে একটা বাড়ির সামনে অপেক্ষা করতে থাকলাম ভোর হবার জন্য!

ভোর হলো, মানুষ রাস্তায় বের হলো! সবাই আমাদের অবস্থা জানতে পারলো! গ্রামটির নাম যান যান! গ্রামের মানুষগুলো চমৎকার, আমাদেরকে খাবার এনে দিলো, বসতে দিল! সারাদিন পার হলো তারপরও গাড়ি ঠিক হলো না! আমাদের ড্রাইভার দূরের কোনো টাউনে গেলেন মেকানিক আনার জন্য! ফিরলেন রাত আটটায়! আমাদের ক্লান্ত শরীর, ক্ষুধার্ত চেহারা শুধু চেয়ে আছি কখন গাড়িটি ঠিক হবে! অবশেষে রাত নয়টায় আমাদের গাড়ি স্টার্ট হলো! আমরা সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম!

এর মধ্যে সকালে আমি স্থানীয় লোকজন দিয়ে পুলিশকে ইনফর্ম করলাম আমাদের অবস্থা জানিয়ে! তৎক্ষণাৎ দু’জন পুলিশ আমাদের সাথে সারাদিনই নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে ছিলেন আমাদেরকে গাড়িতে তুলে দেয়া পর্যন্ত! আমাদের গাড়ি গ্রামের ভাঙা রাস্তা ধরে চলতে থাকলো কোনাক্রির দিকে! তখনও ১০ ঘন্টা পথ বাকি পৌঁছাতে! আমি কখনো জানতাম না এই ‘যান যান’ গ্রামে আমাদের এতো বড় বড় এডভেঞ্চার হবে! গ্রামটি ঘুরে দেখা, মানুষের সাথে ওই অল্প সময়ের বন্ধুত্ব হবার স্মৃতি, তাদের আপ্যায়ন আমাদের ওই কষ্টের মুহূর্তকে সাবলীল করে দিলো!

এ সবের মাধ্যমেই আমি বাই রোডে চলছি সবকিছু অতিক্রম করে!

তবে আফ্রিকার অনেক মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করলেও মানুষ গুলো অনেক বড়ো হৃদয়ের অধিকারী!

গাম্বিয়ার সমুদ্র সৈকতের পাশ্ববর্তী সানায়াঙ ভিলেজে লোকাল ফ্যামিলির সাথে থাকার চমৎকার অভিজ্ঞতা, লোকাল গাম্বিয়ান খাবার খাওয়া, সমুদ্র সৈকতের মানুষের জীবন যাপন ঘুরে দেখা, গ্রামের স্কুলের বাচ্চাদের সাথে দেখা করা সবই ছিলো এক কথায় দারুন অভিজ্ঞতা! গাম্বিয়া থেকে যখন গিনি বিসাও রওনা হলাম, একই ট্যাক্সিতে পরিচয় হলো বিনতা এবং সাফিলো দম্পতির সাথে! পশ্চিম আফ্রিকার পথে খুঁজে পাওয়া সবচে ভালো দুজন মানুষের!

সাফিল আর বিনতা দুজনেই লন্ডনে থাকে!দেশে আসছে ঘুরতে! সাফিল গিনি বিসাউর আর বিনতা গাম্বিয়ান মেয়ে! আমরা সবাই গিনি বিসাও শহরে যাচ্ছি, ওরা অনেক রিকোয়েস্ট করেই নিয়ে গেল ওদের পরিবারের সাথে থাকার জন্য, ওরা আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেলো! আমি একা চলতে পারি জেনেও আমাকে কোনো অবস্থায় একা ছাড়েনি, যা জানতাম না, যা কখনো ভাবিনি, যাদেরকে কখনো চিনতাম না এভাবেই অচেনা মানুষগুলোর সাথে আপন হয়ে যাওয়া, তাদের সাথে সময় কাটানো আমাকে অনেক আনন্দ দেয়!

গিনি বিসাও, গিনি কোনাক্রি, মালি পার হয়ে সিরিয়া লিওনের ফ্রি টাউনে অবস্থান করছি! বিজয়ের এই মাসে ফ্রি টাউন থেকে লাইবেরিয়া, কর্ডোভা, বুরকিনা ফাসো, টোগো, বেনিন হয়ে যাত্রা চলতে থাকবে!

শেয়ার করুন:
  • 258
  •  
  •  
  •  
  •  
    258
    Shares

লেখাটি ৩১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.