ভালো-মন্দের বিদেশ জীবন

0

রিমি রুম্মান:

নিউইয়র্কে আসার শুরুর দিকের কথা।
আত্মীয়ের বাসায় আমরা যখন ‘অহেতুক ঝামেলা’ হয়ে উঠলাম, তখন আলাদা বাসা ভাড়া নেয়াটা বেশ জরুরি হয়ে উঠে। চার/পাঁচ বাসা পরেই এক বাংলাদেশি পরিবার বসবাস করে শুনেছি। সে বাসার কোন এক ভাড়াটিয়া মারফত জানতে পারি সেখানে একটি রুম ভাড়া হবে।

জুনের এক রোদেলা সকালে আমরা বাড়ির মালিকের সাথে দেখা করতে যাই। দেখা হয় মালিকের স্ত্রীর সাথে। আমাদের স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই বয়স কম বিধায় উনি আমাদের তুমি করে বলতে চাইলেন এবং আপন করে নিলেন। অমায়িক, হাসিখুশি ব্যবহার। নানান বিষয়ে আলোচনা, পরিচয় পর্ব শেষে উনি আমাদের রুম ভাড়া দিতে সম্মত হলেন।

আমার আজও মনে আছে সেদিন তাঁর বলা শেষ কথাগুলোর কথা। গল্প শেষে তিনি বলেছিলেন, “আশা করছি, আমার বাসায় থাকবার পর তোমাদের আর কোন ভাড়া বাসায় থাকতে হবে না। পরবর্তী চার/পাঁচ বছরের মধ্যেই তোমরা নিজেরাই বাড়ির মালিক হবে এবং এখান থেকেই নিজেদের বাসায় উঠবে। এদেশে এটি কোন কঠিন বিষয় নয়।” আমি একটু চম্‌কে গেলাম। কঠিন বিষয় নয়! বলে কী! বাড়ি করা কি এতোই সহজ? যেখানে আমার বাবা আমাদের মফঃস্বল শহরে কষ্টে সৃষ্টে একটি বাড়ি বানাতে গিয়ে গোটা একটি জীবন পার করে দিলেন, সেখানে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে চার/পাঁচ বছরেই …।

তবুও খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হোল কথাটি। আমরা বুকে স্বপ্ন লালন করলাম। স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। দু’জন মানুষের হাত ধরাধরি করে আনন্দহীন, কঠিন এক পথের দিকে যাত্রা । কঠোর পরিশ্রম করলাম, মনোযোগ দিয়ে কাজ করলাম, একটি মাত্র রুমে সাবলেট হিসেবে থেকে অর্থ সাশ্রয় করলাম, সঞ্চয় করলাম, এবং সত্যই আমাদের আর অন্য কোন ভাড়া বাড়িতে উঠবার প্রয়োজন হয়নি। সেই একরুম থেকেই বছর পাঁচেক বাদে আমরা নিজেদের বাড়িতে এসে উঠি। জীবন সহজ এবং আনন্দময় হয়ে উঠে। বিদেশ নামক দেশটা আমাদের ভাল লাগতে থাকে। দূরের আকাশ কাছের মনে হতে থাকে।

আমরা বন্ধুরা যারা প্রথম প্রজন্ম এ দেশে এসেছি সেই দুই যুগ আগে, তাঁরা প্রায় সকলেই ভাইবোনদের জন্যে আবেদন করেছি। অনেকের ভাইবোন এসেছে, এবং কারো কারো এখনো আসছে। সে এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষা। রক্ত সম্পর্কের ভাইবোনের সাথে মিলনের প্রতীক্ষা। আবেদন করার ১৪/১৫ বছর পর নানান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শেষ অবধি পরিবারের সদস্যরা এ দেশে আসেন। এই প্রক্রিয়ায় যারা আসেন, তাঁরা ভাগ্যবান এ কারনে যে, তাঁরা আপন ভাই কিংবা বোনের কাছেই এসে উঠেন। দূরের সম্পর্কের কোন আত্মীয়ের বাসায় উঠবার প্রয়োজন হয় না। কেউ তাঁদের ‘অনাকাংখিত ঝামেলা’ মনে করেন না।

চাকুরি পাওয়া, বাসা পাওয়াসহ নানাবিধ সুযোগ সুবিধাদি খুব সহজেই হাতের নাগালের মধ্যে পেয়ে যায় ভাইবোনদের সহযোগিতায়। নতুন দেশে তাঁদের জীবনকে সহজ করে নেয়া বেশ সহজ হয়ে উঠে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশ থেকে আগতদের বেশিরভাগই এই সুযোগটুকু কাজে লাগায় না। সপ্তাহে তিন/চার দিন কাজ করে। বাকিদিন ঘুরেফিরে, ঘুমিয়ে, আড্ডা দিয়ে পার করে দেয়। অর্থাৎ সময়টুকু হেলায় ফেলায় নষ্ট করে ফেলে। কিন্তু যে দিন যায়, সে যে একেবারেই যায়! আমার এক বন্ধু তাঁর ভাইকে এনেছিলেন ইমিগ্রেন্ট করে। এদেশে নতুন আসা ছোটভাইটি সপ্তাহে তিনদিন কাজ করে। বাকি দিন ঘুরেফিরে, ঘুমিয়ে, আলসেমি করে কাটিয়ে দেয়। কিছু ডলার হাতে জমলেই দেশে ছুটে যায় প্রেমিকার কাছে। এতে প্রেমিকাও খুশি হয় তাঁর প্রতি তীব্র ভালবাসা দেখে। সহসাই তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

এদিকে বাস্তববাদী বড়ভাই বোঝাতে চেষ্টা করে, সংসার বড় করার আগেই যে গুছিয়ে উঠবার সময়। বেশি বেশি কাজ করে অর্থ সাশ্রয় করবার এখনি সময়। তবেই না পরিবার কাছে এলে তাঁদের সময় দেয়া সহজ হবে, জীবন সহজ হবে। কিন্তু হায়, কে শুনে কার কথা! সম্প্রতি ছোটভাইটি স্ত্রী, সন্তানকে এদেশে এনেছেন। বাসা ভাড়া নিতে হয়েছে, ব্যয় বেড়েছে। আয় এবং ব্যয়ের সমতা রক্ষা করতে এতদিনের অলস ভাইটিকে বাধ্য হয়ে পার্টটাইম এবং ফুলটাইম মিলিয়ে দিনে রাতে দুটি কাজ করতে হচ্ছে। এদিকে সারাদিন একাকি সন্তান সামলে এদেশে নতুন আসা স্ত্রীও হাঁপিয়ে উঠেছে। এতবছর এদেশে থেকেও কিছুই করা হয়নি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে স্বামীকে। জীবন বিবাদময় এবং বিষাদময় হয়ে উঠেছে তাঁদের।

চারপাশের এইসব দেখে দেখে কতো কী মনে পড়ে!

আমাদের এদেশের শুরুর দিকের সময়ে ‘কোথাও কেউ নেই’ এর এই শহরে, আমাদের সত্যিই কাছের কেউ ছিল না। ছিল না ভালমন্দ উপদেশ দেবার কেউ। অচেনা কিছু মানুষ বাস করতেন পাশের রুমগুলোতে। তাঁরাই কেউ চাকুরি খুঁজে দিয়েছেন, কেউ রাস্তা চিনিয়েছেন। ওইটুকুতেই তাঁদের প্রতি কী ভীষণ কৃতজ্ঞতায় নুয়ে থাকতাম! অথচ প্রথমে ওইসব মানুষদের সাথে সাবলেট হিসেবে একটি রুমে থাকতে হবে ভেবে আমি টানা তিনদিন অঝোরে কেঁদেছিলাম এই ভেবে যে, এ কোথায়, কোনদেশে এলাম! কেনই বা এলাম! এমন করে তো কোনদিন থাকা হয়নি দেশে। আমার রক্ষণশীল বাবা আমাদের কত যত্নে আগলে রেখেছিলেন দেশে সেই প্রথম উপলব্ধি আমার।

ঠাণ্ডা, বৃষ্টি, তুষার যাই থাকুক না কেন, ভোর ছয়টায় অন্ধকারে বাসা থেকে বের হতাম কাজের উদ্দেশ্যে, ফিরতাম সন্ধ্যা ছয়টায় সেই অন্ধকারেই। দিনের আলো দেখা হতো কেবল ছুটির দিনে। পাখির ডাক শুনিনি অনেকগুলো বছর। মনে হত পাখিরাও আমার মতই দেশান্তরী হয়েছে অন্য কোন দেশে। পাতাঝরার দিন দেখিনি, সেন্ট্রাল পার্কের মনোরম দৃশ্য দেখিনি। চেরি ব্লসম দেখিনি সেইসব দিনে। শুধুই কাজ আর কাজ। এত দীর্ঘ সময় একটানা দাঁড়িয়ে তো কোনদিন কাজ করিনি দেশে! রাতভর তীব্র পা ব্যাথা আর শরীর ব্যাথায় গোঙাতাম, ব্যাথার ওষুধ খেয়ে পরদিন আবারও কাজে যেতাম। আমরা স্বামী- স্ত্রী সময় সুযোগ মিললে একজন অন্যজনের পায়ে সরিষার তেল ম্যাসেজ করে দিতাম ব্যাথা প্রশমনের জন্যে। বিশ্বের রাজধানী নামে খ্যাত এই দেশে কত ব্র্যান্ডের যে ব্যাথানাশক ওষুধ পাওয়া যায়, সেই খবর জানা হয়ে উঠেনি তখনো।

আমার দিনে কাজ, আর বরের রাতে কাজ। আমাদের সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই দেখা হতো সাবওয়েতে, আসা যাওয়ার পথে। সেলফোন ছিল না বিধায় ঘড়ির টাইম ধরে আমরা সাবওয়েতে নির্দিষ্ট একটা জায়গায় অপেক্ষা করতাম দেখা করবার জন্যে। সময় বাঁচাবার জন্যে। প্রয়োজনীয় কথা কাগজে লিখে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় কিংবা ফ্রিজের সাথে স্কচ টেপ দিয়ে লাগিয়ে রাখতাম। এমন কঠিন জীবন ছেড়ে প্রতিদিনই পালাতে চাইতাম। প্রতিদিনই মনে হতো দেশে ফিরে যাই। কদম ফুলের দেশে, টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির দেশে, ঝিলের জলে শাপলা শালুকের দেশে। এতকিছুর মাঝেও মাস শেষে চাপা দীর্ঘশ্বাসের মাঝে মা’কে চিঠি লিখতাম, ‘ আমরা এখানে বেশ ভাল আছি। এখানকার জীবন সুন্দর, মানুষজন অমায়িক, রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন। ধুলা, ধোঁয়া কিংবা শব্দ নেই চারিপাশে।’

মা হাঁপ ছেড়ে বাঁচতেন বোধ হয়। ভাবতেন, যাক্‌, মেয়ে আমার বেশ আছে স্বপ্নের দেশে ! প্রযুক্তির সুবিধাহীন দিনগুলো এক হিসেবে বেশ ছিল। ধরা পড়ে যাবার ভয় ছিল না।

কিন্তু এখন সময় বদলেছে। বিদেশ বিভূঁইয়ের জীবন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে উঠেছে।

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 346
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    346
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.