ভিকারুননিসা থেকে নেওয়া শিক্ষকদের সহজপাঠ

আর রাজী:

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবনে সবচে বড় যে শিক্ষাটা পেয়েছি তা হলো, শিক্ষার্থীদের আর যাই হোক ভাল মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা দেওয়া যায় না। (অনেকে যে বলবেন, নিজে ভালো মানুষ না হয়ে অন্যকে তা শেখানো যায় না- এটা আমার মাথায় আছে। সাথে, এও স্মরণ করছি, আমি নিজে যা হতে পারিনি, সেই সাংবাদিক হওয়ার জন্যই আমি শিক্ষার্থীদের পড়াই। যেমন নিজে গরু না হয়েও অনেক শিক্ষক, গরু বিষয়ক রচনা পড়ান)।

কোনো সন্দেহ নাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যারা পড়তে আসি, তাদের মনটা শাদা থাকে না। এখানে আসার আগেই তাতে নানান কিছু আঁকা হয়ে যায়। কিন্তু তারপরও আমরা যারা শিক্ষকতা করি, তাদের কিছু কথা বলতেই হয়। এর অন্যতম হচ্ছে, সৎ মানুষ হওয়া, পরীক্ষার হলে- নকল না করা, পাশের জনের সাথে কথা না বলা ইত্যাদি। এসব মধুর বাজে কথা কোনো কাজে আসে না। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অসৎ পথ নেয়। বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী নকল করে, হলে কথা বলে।

আমার শিক্ষকতা জীবনের সবচে করুণ শিক্ষাটা হলো, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে অপরাধ বা দুর্নীতিই করুক না কেন, কোনো শাস্তিকেই তারা তাদের জন্য প্রযোজ্য মনে করে না। শাস্তি পাওয়ার জন্য লজ্জিতও হয় না। বরং শাস্তিটা তার প্রতি শত্রুতামূলকভাবে প্রযোজ্য হয়েছে বলে বিশ্বাস করে, সেই বিশ্বাসের কথা প্রচার করে এবং তা সমাজে গ্রহণযোগ্যতাও পায়। আমি দেখেছি, যাদেরকে বিভিন্ন কারণে “শাস্তি” দিতে বাধ্য হয়েছি, বিশেষ করে পরীক্ষায় অসদুপায় নেওয়ার জন্য তিরস্কার করেছি, খাতা নিয়ে নিয়েছি বা অন্য কোনো মৃদু শাস্তিও দিয়েছি, তারা প্রায় সবাই সুযোগ পেলেই আমাকে এক চোট গালিগালাজ করে নিয়েছে বা নেয়। এতে করে চিরকালের জন্য একটা শত্রুতা তৈরি হয়ে গিয়েছে। এটি এমন এক ভয়ানক মানসিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা শিক্ষকতার স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে বড় এক অন্তরায়। এর সাথে নতুন করে যুক্ত হলো, ভিকা-ফোবিয়া (ভিকারুননিসাজাত আতঙ্ক)।

গত দু দিন আগে আমাদের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের পরীক্ষার হলে এক বিস্ময়কর অবস্থার তৈরি হয়। একই পরীক্ষার হলে দু’টি বিভাগের পরীক্ষা চলছিল। আমার বিভাগের শিক্ষার্থীরা আমাকে কিছুটা গণ্য করলেও একই সাথে পরীক্ষা দেওয়া অন্য বিভাগের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী আমাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তাদের অসৎ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিল। তাদের বিভাগের শিক্ষকরা বিশাল এই পরীক্ষার হলটির সামনের দিকে থাকায় পেছন দিকটা যে মাছ-বাজারে পরিণত হয়েছে তা হয়তো তারা খেয়াল করতে পারছিলেন না।
এই উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশে আমার বিভাগের শিক্ষার্থীরাও যখন কথা বলাবলিতে যোগ দেয়, তখন মুহূর্তের জন্য আমি আমার ধৈর্য্য হারাই এবং এক নারী পরীক্ষার্থীর খাতা কেড়ে নেই।
মেয়েটি “আর হবে না, আর কোরবো না” ইত্যাদি যখন বলছিল, তখন আমি তাকে বেহায়া, স্টুপিড ইত্যাদি কিছু হয়তো বলেছিলাম। (রেগে গেলে, সাধারণত “স্টুপিড” বলি আমি)। পরক্ষণেই আমি ভয় পেয়ে যাই, এবং তাকে খাতা ফিরিয়ে দিয়ে বলি, “মাফ কইরেন।” এই ভয় পাওয়ার কারণ হচ্ছে, তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে, ভিকারুন্ নিসা-কাহিনী। মেয়েটি যদি পরীক্ষা খারাপ হওয়ায় আত্মহত্যা করে বা নিদেন পক্ষে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়, তখন কী হবে? আমি আর যাই হোক তাকে “স্টুপিড” বলতে বা অন্য কোনো অপমান/বুলিং করতে পারি না- এই তো বলা হবে তখন। তাই না?

আর রাজী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

অনুমান করি, আমার সাবেক-বর্তমান অনেক অনেক শিক্ষার্থী তাদের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করে- আমার ফাঁসি দাবি করে বসবে। আর বাকিরা থাকবে দ্বিধায়, নিশ্চুপ। সব পক্ষই ভুলে যাবে যে, স্কুল-কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় এক না- বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাপ্তবয়স্করা পড়তে আসে, তাদের নিজেদের কৃতকর্মের দায় ও শাস্তি তাদেরই নিতে হবে।

এই দেশে, যাদের পেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা পড়েছে, আমার পরিচিতদের, অধিকাংশকেই নানান সময় অসৎ আচরণ করতে দেখছি। এরাই তো আমাদের শিশু সন্তানদের মা-বাবা, তাই না? আমার কাছে, শিক্ষিত-বাঙালী এক ভয়ঙ্কর অসৎ প্রাণী। এই অসৎ প্রাণীগুলোর পাল্লায় পড়েছেন, ভিকারুন্নিসার তিন শিক্ষক। তাদের সকল অবদানকে ভুলে এখন নির্দয়-নিষ্ঠুরের মতো আচরণ করছে, সমাজ-সরকার-রাষ্ট্র।

অরিত্রীর করুণ পরিণতির কারণ হতে পারে অসংখ্য। একটি মাত্র কারণেই অরিত্রী আত্মহত্যা করেছেন তা দাবি করা অযৌক্তিক। এ এমন এক দেশ, যেখানে সবাই সবাইকে অপমান করে চলেছে। এখানে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানাতেও বলা হয়, “দাঁড়ান”। এই দেশে, “অপমানিত হয়ে আত্মহত্যা” করার বীজ শিক্ষিত-বাঙালীর রক্তে আছে বিশ্বাস করা আমার জন্য শক্ত। তারপরও ধরে নিলাম, অরিত্রী অপমানিত হয়ে বা বাবার অপমানের কারণে আত্মহত্যা করেছেন। তাহলে এ থেকে, আমাদের শিক্ষকদের জন্য শিক্ষা কী?

বকাঝকা-অপমান করা ছেড়ে দিলে শিক্ষকদের হাতে থাকে আইন প্রয়োগ করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনি প্রক্রিয়াটা জটিল ও দীর্ঘমেয়েদী কিন্তু খুব একটা ফলপ্রসূ না। যদি আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া হয়, তাহলে শাস্তি মানেই তো আর্থিক শাস্তি কিংবা “টিসি” ধরিয়ে দেওয়া। লেট-ফাইন, এ্যাবসেন্ট ফাইন ইত্যাদি নানান “আর্থিক শাস্তি” চালু আছে। বড় ধরনের আর্থিক জরিমানা না হলে, এই শাস্তিও খুব একটা কার্যকর হয় না। আর থাকলো, “টিসি”। এই সব প্রক্রিয়ায় শিক্ষকরা আরও বেশি করে জড়িয়ে গেলে কি তা শিক্ষার জন্য মঙ্গলজনক হবে? এ নিয়ে আলোচনা চলতে পারে, চলা দরকার কিন্তু সেসব আলোচনার ফয়সালা হওয়ার আগেই আমরা শিক্ষককে কিভাবে জেলে পুড়ে রাখতে পারি? কীভাবে তাদের বেতন বন্ধ করে দিতে পারি?

অনেকেই এ পর্যায়ে বলবেন, শিক্ষকদের আচরণে সমস্যা আছে। আমি স্বীকার করি তা আছে। কিন্তু এ থেকে মুক্তির কোনো ছোট পথ নাই। কারণ শিক্ষকদের আচরণ এক দিনে তৈরি হয়নি, সমাজের সার্বিক রূপ বরং কেন্দ্রিভূত হয়ে আছে আমাদের শিক্ষকদের আচার-আচরণ-ব্যবহারে। শিক্ষকরা তাদের স্বভাব দ্রুত বদলে নিতে পারবে, সে আশা দূরাশা মাত্র।

হ্যাঁ, এটা ঠিক; একটা স্বাভাবিক, গণতান্ত্রিক, পূঁজিবাদী আদর্শের সমাজ-রাষ্ট্রে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ শিক্ষা দেওয়া, কিছুতেই শাস্তি দেওয়া নয়। কিভাবে শাস্তি এড়িয়ে সমাজ-রাষ্ট্রে টিকে থাকতে হয় তাই তাদের শেখানোর কথা। কিন্তু আমরা আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছি। পরীক্ষার পর পরীক্ষাময় জীবনে জিপিএ ফাইভের ফ্যাক্টরি প্রডাকশান শুরু করেছি। এইসব নানাবিধ বিকৃতির পর আশা করছি, শিক্ষকরা শাস্তি না দিয়ে কেবল শিখিয়ে-পড়িয়ে সমাজের জন্য সুসন্তান উপহার দিয়ে চলবে। বিদ্যালয়গুলো বিকল্প হয়ে উঠবে পরিবারগুলোর। কিন্তু এমন মানবিক শিক্ষক আকাশ থেকে পড়তে পারে না। এটি পুরো রাষ্ট্র ও সমাজের আকাঙ্ক্ষা এবং আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ত্যাগের সাথে সম্পর্কিত।

সত্য হচ্ছে, শিক্ষিত-বাঙালীর এই সমাজটা সুযোগ-সন্ধানী চোর-বাটপারের দখলে। ঝোপ বুঝে কোপ দেওয়ার শিক্ষা ছাড়া এই সমাজের সবচে মৌলিক প্রতিষ্ঠান “পরিবার”গুলো আর কিছু শেখায় কি? কারা নেতৃত্ব দেয় এই পরিবারগুলোর? কারা চালায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো? কারা প্রশ্রয় দেয় সমাজ-রাষ্ট্রে স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠায়? এইসব ঠিকঠাক রেখে শিক্ষকদের ওপর এভাবে চড়াও হলে চলবে?

একথা তো জানা, দুর্বল সরকার উন্মত্ত-জনতার সামনে অসহায়। সে তখন বিচার-বিবেচনাহীনভাবে চরম শাস্তি দাতা হয়ে ওঠে। ভিকারুন্ নিসা নূন স্কুলের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। কেবল গ্রেফতারই করা হয়নি, অস্বীকার করা হয়েছে জামিনও। এই চরম পরিস্থিতিতেও আমাদের শিক্ষিত-সমাজ রা-টি পর্যন্ত করেনি, করছে না। কেউ সেই অসহায় শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। তার মানে, তারা বিশ্বাস করছে, ভিকারুন নিসার শিক্ষকদের এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া যথার্থ!
তো এই অবস্থায় শিক্ষকদের কী করার থাকতে পারে? হাল ছেড়ে, হাত তুলে গড্ডাল প্রবাহে ভেসে যাওয়ার শিক্ষাই তো দিচ্ছে ভিকারুন নিসার শিক্ষকদের জেলযাত্রা। তাই না কি?

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.