#MeToo: যৌন নির্যাতকরা কী করছে, কেমন আছে?

0

ফারজানা আহমেদ:

বাংলাদেশে ১৭ কোটির বেশি মানুষ, নারীর সংখ্যা নাকি প্রায় তার অর্ধেক। আদমশুমারিও তাই বলছে, বছর বছর পত্রিকার পাতায় নারীর প্রতি সহিংসতার সালতামামি দেখলে মনে হয় এদেশের পুরুষেরা সবথেকে বেশি বিনোদন লাভ করে নারীর প্রতি সহিংসতা করে, বৈষম্য করে, সব বিষয়ে নারীকে হেয় করাই তাদের মূল বিনোদন।

গত দেড় বছর ধরে #মিটু ঝড় দুনিয়া কাঁপালেও বাংলাদেশে এসেই যেন থমকে দাঁড়ালো, বলা যায় গতিপথ হারিয়ে ফেললো। এখানে প্রায় আট কোটি নারীর মধ্যে মুখ খুললেন আট থেকে ১০ জন মাত্র। দু’দিন খুব আলোচনা-সমালোচনা হলেও নির্বাচনের ডামাডোলে যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে বা গেছে এরই মধ্যে।

আর চাপা পড়বেই বা না কেন? যাদের এই ইস্যুতে সোচ্চার হবার কথা, সেই মিডিয়ার দুজন সাংবাদিকের দিকেই তো #মিটু অভিযোগের তীর ছুটেছে। একজন ডিবিসি নিউজ চ্যানেলের বার্তা সম্পাদক প্রণব সাহা, অপরজন স্বনামধন্য ইংরেজি পত্রিকা দ্যা ডেইলি স্টারের সিনিয়র ডিপ্লোম্যাটিক করেস্পন্ডেন্ট রেজাউল করিম লোটাস। #মিটু অভিযোগ উঠেছে মৃত নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের বিরুদ্ধেও।

#মিটু অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম এই ঘটনার পর নানাভাবে অভিযোগকারীর চরিত্র হননের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রথম #মিটু অভিযোগ আসে প্রবাসী বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত সাবেক মিস আয়ারল্যান্ড এবং পেশায় পাইলট মাকসুদা আকতার প্রিয়তীর হাত ধরে। ২৯ অক্টোবর প্রথম একটি পোস্ট দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের রঙধনু শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ২০১৫ সালে তার বুকে হাত দিয়েছিলেন এবং ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন। অভিযোগ আসার পরপরই রঙধনু গ্রুপের ওয়েবসাইটে অনেক পরিবর্তন আসে। সাইটে অনেক ইনফরমেশন মুছে ফেলা হয়। চেয়ারম্যান বিদেশে চলে যায়। বর্তমানে সার্বিক অবস্থা দেখে আবার সে হুমকি ধামকি দিয়ে চলেছে প্রিয়তীকে। আর সামাজিক মাধ্যমে হয়রানি তো আছেই।

এরপর একে একে প্রবাসী শিক্ষার্থী শুচিস্মিতা সীমন্তি, থিয়েটার শিল্পী তাসনুভা আনান শিশির, প্রবাসী সাংবাদিক আলফা আরজু, উন্নয়ন কর্মী মুশফিকা লাইজু, ঢাকার এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আসমাউল হুসনা, আবৃত্তি শিল্পী জাকিয়া সুলতানা মুক্তা, কানাডা প্রবাসী সাবিহা নাজনীনের পক্ষ থেকে বাড়িতে, কাজের জায়গায় এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানির কথা উঠে আসতে থাকে।

#মিটু অভিযুক্ত প্রণব সাহা বহাল তবিয়তেই আছেন তার কর্মস্থলে। শুনেছি তার বেতনও বেড়েছে এই ঘটনার পর। তাহলে কী বুঝে নেবো? কর্তৃপক্ষ নিজেই একজন নির্যাতককে পুষছে এবং সম্মানিত করছে?

অভিযুক্তরা সবাই বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিবিসির বার্তা সম্পাদক প্রণব সাহাকে কর্তৃপক্ষ তার উপস্থাপনায় পরিচালিত টকশো উপসংহার থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। প্রণব সাহার বিরদ্ধে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযোগকারী সীমন্তির মায়ের সাথে প্রণব সাহার ভালবাসার সম্পর্ক ছিল এবং তাদের বিয়ে করারও কথা ছিল। বিয়ের জন্য অফিস থেকে ছুটিও মঞ্জুর হয়েছিল মি. সাহার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি ছুটি বাতিল করেন আরও সময় নেবার জন্য। দুজনেরই তৎকালীন কর্মস্থল প্রথম আলোর সবাই জানতো এ বিষয়ে। পাঁচ বছর সম্পর্ক চলাকালে সীমন্তিদের বাসায় প্রণব সাহার ছিল অবাধ যাতায়াত, তারা সবাই জানতো মায়ের সাথে কিছুদিনের মধ্যে বিয়ে হবে প্রণব সাহার। কিন্তু সীমন্তির মা একপর্যায়ে জানতে পারে একাধিক মেয়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে প্রণব সাহা। একারণে ভালবাসা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক দিনে দিনে তিক্ততায় বিলীন হয়। সীমন্তির অভিযোগ অনুযায়ী ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে প্রণব তাকে অনাকাঙ্খিত স্পর্শ করে।

সীমন্তি জানায়, মাকে সে বলতে পারেনি, কারণ প্রণব সাহার নানাজনের সম্পর্কের কারণে মা তখন এমনিতেই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, তাছাড়া তাদের সম্পর্ক তখনও ছিল। তবে তাদের বাসায় যে মেয়েটি তখন সহকারি ছিল, তারই কাছাকাছি বয়স। সে জানতো বিষয়টা। প্রণব সাহা বাসায় এলেই সেই মেয়েটি সীমন্তির রুমে চলে আসতো, আর এ কারণে আরো বড় ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যায় সে, কিন্তু মানসিকভাবে নিদারুণভাবে আহত হয়। এবং এই কষ্ট সে গত ১১ বছর ধরে বয়ে চলেছে নিজের মধ্যে। বার বার ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়িয়েছে।
কোন কিছুর আশায় নয়, অন্য পরিবারগুলি যেন একটু হলেও সচেতন হয়, সেই কারণে ও সেই সাথে নিজের মধ্যে চেপে রাখা কদর্য স্পর্শের ক্ষত থেকে নিজেকে মুক্তি দেয়াও ছিল তার উদ্দেশ্য। প্রণবের সাথে সম্পর্কের অবনতির জেরে সীমন্তির মা প্রথম আলো ছেড়ে দেয়। এখানে মজার ব্যাপারটি হলো, প্রথম আলোর আরেক কর্মী ২০০৯ সালে প্রণব সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে, এবং সে লিখিত অভিযোগ দেয় খোদ সম্পাদককে। এই ঘটনাও সবাই জানে ওই অফিসের। অফিসের বাইরের আরেকজন নারীর কিছু অশ্লীল পোস্ট সম্পাদকের হাতে যাওয়ায় এমনিতেও প্রণব সাহার অবস্থান নড়বড়ে ছিল, দ্বিতীয় মেয়েটির লিখিত অভিযোগ তাতে যুক্ত হলে প্রণব সাহাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এদিকে অনলাইন পোর্টাল বিডিনিউজ২৪ডটকমে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবার পরও তার চাকরি হয়নি, কারণ ওই অনলাইন পত্রিকার খোদ সম্পাদকের তৎকালীন বান্ধবীর সাথেও প্রণব সাহার অনৈতিক সম্পর্ক ছিল।
তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত মিটু অভিযোগ তদন্তে একটি তিন সদস্যের কমিটির কথা খবরে জানা গেলেও সম্প্রতি ওই সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, এসবই লোক দেখানো চাল।

এদিকে জানা যায়, প্রণব সাহার ইদানিং বেতন বৃদ্ধিও হয়েছে ডিবিসি চ্যানেলে। আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে এবং ডিবিসির একজন মালিক আওয়ামী লীগের একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি হবার কারণে প্রণবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই শেষপর্যন্ত নেওয়া হবে না বলে ভাবছে তারই কিছু সহকর্মী।

#মিটু অভিযুক্ত সাংবাদিক রেজাউল করিম লোটাসের বিরুদ্ধে এখনও কোনো অ্যাকশন নেয়া হয়নি বলেই খবরে প্রকাশ

অপর সাংবাদিক রেজাউল করিম লোটাস, যিনি ডেইলি স্টারে সুপরিচিত সাংবাদিক, উনার বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ডেইলি স্টারের সাবেক সাংবাদিক আলফা আরজু যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। নিজের কর্মক্ষেত্রে আলফা আরজু দারুণ সফল ছিলেন, এবং সাংবাদিক সংগঠনেও দারুণ সক্রিয় ছিলের, কিন্তু পারিবারিক জটিলতার কারণে ওই মুহূর্তে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। জনাব লোটাসের সাথে সহকর্মীর সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কই ছিল, কিন্তু লোটাস সাহেব তার স্বামীর সাথে টানাপোড়েনের কথা জানার পর থেকেই তার প্রতি আচরণ বদলে যায়। মাঝে মধ্যেই আলফা আরজুর করা রিপোর্ট নিয়ে ঝামেলা শুরু করেন, পাশাপাশি বিভিন্ন হয়রানি করতে থাকে। অবশেষে একরাতে অফিস শেষে বাড়ি ফেরার পথে আলফাকে লিফট দেবার সময় গাড়ির পিছনের সিটে আলফাকে আচমকা জড়িয়ে ধরে, এবং নানাভাবে তার শরীরে হাত দেয়। এহেন ঘটনায় হতচকিত আলফা শরীরের সব শক্তি এক করে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চেষ্টা করে, কপাল জোরে ড্রাইভার গাড়ি থামাইয়ে জানায় আলফার বাসা এসে গেছে। এভাবে সেইরাতে রক্ষা পায় আলফা, কিন্তু মনোবেদনা থেকে রক্ষা হয় না। সারারাত কান্নাকাটি করে পরদিন আরেকটি ইংরেজি পত্রিকায় গিয়ে চাকরির আবেদন করে আলফা। তার কর্মদক্ষতা নিয়ে কারো সন্দেহ ছিল না। ফলে সম্পাদক দ্বিতীয়বার কিছু না ভেবেই চাকরি দেন আলফা আরজুকে। যদিও সে খুব চেষ্টা করেছিল ডেইলি স্টার এর সম্পাদককে জানাতে, কিন্তু উনার সামনে গিয়ে কান্নাকাটি করা ছাড়া কিছুই বলতে পারেনি আলফা। নিজের সাথে দিনের পর দিন চেষ্টা করেছে সে
এই ঘটনা ভুলে যেতে, মানসিক কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য। লোটাসকে মাফ করার চেষ্টা করেছে দিনের পর দিন, সে কারণে ফেসবুকের লিস্ট থেকে তাকে বাদ দেয়নি। এমনকি লোটাসের উন্নতিতে ও কন্যা জন্মানোর পর শুভেচ্ছা জানিয়েছে আগের মতোই।
কিন্তু #মি টু সাহস ও প্রেরণা দিয়েছে সব বাঁধা ও আগল খুলে মনের বেদনা, যাতনা কষ্ট শেয়ার করতে। এদিকে এই ঘটনা ফেসবুকে প্রকাশের পরপরই ডেইলি স্টার এক নোটিশ দিয়ে দু:খ প্রকাশ করে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানায়। আরও জানায়, তারা সিরিয়াসলি এই বিষয়ে কাজ করছে, তদন্ত চলছে অভিযোগ নিয়ে। উল্লেখ্য যে, বেশকিছু নারী যারা লোটাসের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন, তারা সাক্ষ্যও দিয়েছে বলে জানা যায়।

#মিটু অভিযুক্ত আনোয়ার খান সামনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করছেন। তার মনোনয়ন বাতিল হয়নি নারী নির্যাতক হওয়ার পরও।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন সাবিহা নাজনীন, যিনি বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। তিনি লিখেছেন, ‘সে সময় সবে এইচএসসি শেষ করে চলে আসি স্বপ্নের ঢাকায়, বাবার স্বপ্ন পূরণ করে ডাক্তারি পড়তে। ভর্তি হলাম সদ্য স্থাপিত আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজে। তার প্রতিষ্ঠাতা জনাব আনোয়ার হোসেন খান ছিলেন বাবার পরিচিত। লেখাপড়ায় তেমন চৌকস ছিলেন না, বাবার রেফারেন্সে মডার্নে ভর্তি হলেও ডাক্তারির পড়াশোনা কোনভাবেই কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না, বাবাকে জানান। বাবা তার বন্ধু জনাব আনোয়ার খানকে ব্যাপারটি জানালেন। আনোয়ার খান সাবিহাকে তার অফিসে দেখা করতে বললেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাবিহা যায় তার রুমে। তিনি কিছুক্ষণ কথা বলে তাকে রুমে বসিয়ে নামাজে গেলেন। এরপর নামাজ হতে রুমে ফিরে আবার আলাপ শুরু করলেন।

আস্তে আস্তে তিনি আমার পাশের চেয়ারে বসলেন। সহমর্মিতা দেখালেন। এরপর সহমর্মিতার ভান ধরে হাত চেপে ধরলেন। বাবার স্বপ্ন পূরণের অক্ষমতায় খুবই ভেঙে পড়েছিলাম এবং কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি’। কান্নার একপর্যায়ে তিনি সাবিহাকে জড়িয়ে ধরেন, আরেক হাত দিয়ে স্তন চেপে ধরলেন। এসবে দিশেহারা হয়ে যখন তাকে ধাক্কা দিয়ে সাবিহা বের হয়ে আসতে চেষ্টা করতেই, তখন তিনি সাবিহাকে জাপটিয়ে ধরে, সাবিহার হাত দিয়ে তার গোপনাঙ্গ ধরানোর চেষ্টা করলেন। এবার তাকে ধাক্কা দিয়ে দৌড় দিয়ে তার রুম হতে বেরিয়ে যেতে পারে সাবিহা।

সেদিনই ব্যাগ গুছিয়ে সিলেট ফিরে আসে সাবিহা। সারাপথ ট্রেন কাঁদতে কাঁদতে ফিরে সে। ফিরে সাবিহা শুনে আনোয়ার খান আগেই তার বাবাকে ফোন দিয়ে বলেছেন যে, সাবিহার প্রেমের কারণে লেখাপড়ার করুণ দশা। সাবিহা তার বাবাকে আনোয়ার খান তার অফিসে ডেকে কী করেছে খুলে বলায় বাবা তাকে ধমক দিয়ে ব্যাপারটা কাউকে বলতে না করলেন।
এর এক বছর পর বিয়ে হয়ে, স্বামীর সাথে কানাডা চলে যায় সে। বর্তমানে এক সন্তানের জননী।

সাবিহা জানায়, এতোদিন পর ব্যাপারটা নিয়ে বলার কারণ হচ্ছে, গতকাল ঐ পিশাচের হাসি মার্কা ছবি দেখলাম যে, তিনি আওয়ামী লীগ এবং তরিকত, দুই দল থেকেই নমিনেশন নিয়েছেন এবং বলেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই কাজ করেছে। পিশাচ হাসি দেখে নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারলাম না। এই নরপিশাচ যদি আইন প্রণেতা হন, তাহলে আমাদের দেশের কোন মেয়েই নিরাপদ নন। নিজেকে কোনভাবেই মানাতে পারছি না যে, যে-ই লোক নিজের বয়সী মেয়েকে দেখে নিজের কুপ্রবৃত্তিকে রোধ করতে পারে না, সে কীভাবে দেশের মানুষের সেবা করবে? আজ নিজেকে নির্ভার লাগছে এই ভেবে যে, এটলিস্ট নিজের জমানো কষ্টটা এতোদিনে সবার সাথে শেয়ার করতে পারছি।

উল্লেখ্য, একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে নিজ দল আওয়ামী লীগের পর তরিকত ফোডারেশন থেকেও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান। আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চেয়ারম্যান এই আওয়ামী লীগ নেতা লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন থেকে আওয়ামী লীগ এবং তরিকত ফেডারেশনের মনোনয়ন পেয়েছেন। লেখাটি উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে অন্য কয়েকটি পোর্টাল শেয়ার করে। শেষখবর পাওয়া পর্যন্ত আনোয়ার খান উইমেন চ্যাপ্টার, এর সম্পাদক এবং লেখকের বিরুদ্ধে কলাবাগান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

মৃত্যুর পর #মিটু অভিযুক্ত সেলিম আল দীনের বন্ধু-আত্মীয়দের ভাষ্য, এমনটি তিনি করতেই পারেন না। কিন্তু তার সময়ের অনেকেই জানেন, তার এই দোষের কথা, অপরাধের কথা। মরণোত্তর সম্মাননা হলে মরণোত্তর অভিযোগ কেন নয়?

আরেকজন হেভিওয়েট ব্যক্তি, যিনি নাট্যগুরু বা নাট্যাচার্য বলে খ্যাত, সেই সেলিম আল দীনের বিরুদ্ধে #মিটু অভিযোগ করেছেন মুশফিকা লাইজু, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন তিনি। লাইজু তার প্রিয় শিক্ষক সেলিম আল দীনের বাসায় মলেস্টেশনের শিকার হন। তার বিরুদ্ধে কিছু করতে না পারার কষ্টে, মানসিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়েন ৩১ বছর আগে। এ ঘটনার আগে পরে বহুবার সেলিম সাহেবের নামে যৌন হয়রানির অভিযোগ এসেছে। কিন্তু তার বিরদ্ধে কেউ কিছু করতে পারেনি। মরণের পরে কেন তাকে হেয় করা হচ্ছে, এ নিয়ে অনেক কথা উঠছে, কেউ কেউ লাইজুকেই দোষীসাব্যস্ত করছেন। কিন্তু কেউ বলছে না মরণোত্তর সম্মাননা পেলে ধিক্কার কেন পাবেন না?

সব অভিযুক্তই তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, এবং এটাই স্বাভাবিক। কেউ তো আর অপরাধ স্বীকার করে না। সারাবিশ্বে অনেক রথী-মহারথীই #মিটুতে অভিযুক্ত হয়েছে। অধিকাংশকে তাদের প্রতিষ্ঠান অব্যাহতি দিয়েছে, বাদ দিয়েছে চলমান অনুষ্ঠান থেকে। কেউ কেউ নিজেই সরে গেছে। এবছর সাহিত্যে কেউ নোবেল পুরস্কার পায়নি এই #মিটু অভিযোগের কারণেই। সুতরাং বিষয়টিকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে, এটা তারই প্রমাণ।

আরেকজন অভিযুক্ত জামিল আহমেদ বর্তমানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত। তার পদায়নও হয়েছে শুনেছি।

আরেকজন অভিযুক্ত জামিল আহমেদ বর্তমানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত। তার পদায়নও হয়েছে শুনেছি।

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের, কী নারী, কী পুরুষ, পুরুষতান্ত্রিকতা মগজে চেপে বসে আছে অত্যন্ত নির্মমভাবে। তাই অধিকাংশ পুরুষ, এমনকি নারীও নারী নির্যাতনকে খুব একটা বড় ইস্যু মনে করে না। দেশে কিছু নারী সংগঠন আছে নামকাওয়াস্তে, আজও তারা সম্মিলিতভাবে কিছু করেছে বলে চোখে পড়েনি। ব্যক্তি উদ্যোগে ছোটখাটো কাজ চলছে, কিন্তু বৃহৎভাবে কিছু করা হচ্ছে না। নারী নির্যাতন নিয়ে কিছু কথা কাগজে কলমে আছে, আছে ভাষণে স্লোগানে। কিন্তু আইনে নেই, প্রয়োগে আরও নাই। আইন প্রণেতা থেকে শুরু করে আইন শৃঙ্খলারক্ষী বাহিনী, এমনকি রিকশা চালক, দিন মজুর থেকে শুরু করে কেউ বাকি থাকে না নারীকে অসম্মান করতে। নারীর প্রতি এই বৈষম্যমূলক আচরণ দিনে দিনে বাড়ছেই।

#মি-টু আন্দোলন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে, গণমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক চললেও, সরকারের কাছ থেকে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কিছু শোনা যায়নি। তারা নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। বাংলাদেশে সব আন্দোলন শেষ হয় উপেক্ষায়, হামলা মামলায়, কালক্ষেপণে। বার বার বলা হচ্ছে #মিটু কোন বিচারের আশায় বা কোনকিছু প্রাপ্তির লোভে নয়।
#মিটু হচ্ছে নারী সাথে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির কথা, যা বছরের পর বছরে চাপা পড়ে ছিল, সেই পাথর চাপা বেদনার আখ্যান খুলে বলে মন ও হৃদয়কে হালকা করা, এ নয় নারীর প্রতি পুরুষের বিদ্বেষ, এ শুধুমাত্র নারীর সাথে ঘটা অন্যায়ের উল্লেখ মাত্র।
#মিটু নিয়ে অনেক জল ঘোলা চলছে, #মিটু অভিযোগকারীকে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে ঘরে-বাইরে। কিন্তু #মিটু অভিযুক্ত
আরও চার-পাঁচটা নারী নির্যাতক বা ধর্ষকের মতোনই গায়ে হাওয়া দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সমাজের বাহ্বাও কুড়াচ্ছে। তাদের ফেসবুক টাইমলাইন ঘুরলেই দেখা যায় তারা কতোটা সহমর্মিতা পাচ্ছে অন্যদের কাছ থেকে।

অভিযুক্তের পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশি সবাই উঠে পড়ে লেগেছে অভিযুক্তকে বাঁচাতে, কিন্তু অভিযোগকারী তার পাশে কাউকে পাচ্ছে না, সরে যাচ্ছে বা চুপ করে থাকতে। অনেককে দেখছি, নিজে ক্ষমতাশীলদের বাঁচাতে বা অভিযুক্তের গুড বুকে থাকার প্রয়াসে এই অপরাধকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। ব্রেক দ্যা সাইলেন্স নিয়ে কাজ করার সময় দেখেছি, শুনেছি নারীকে ঘরে বাইরে কতভাবে নিত্যনতুন তরিকায় এ্যাবিউজ করা করা হয়। নারী না পারে বলতে, না পারে সইতে, আবার পরিবারের বা কাছের কাউকে বললে চুপ করে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। নারীর যাতনা পদে পদে, ঘরে বাইরে সবখানে।

#মিটু নিয়ে এতো কথা আবারও বলা হলো আশা নিয়ে, কারণ আশার আলো কখনো নিভে যায় না। অভিযোগ করলে হয়তো সবসময় বিচার মেলে না। তাই বলে দমে যাওয়া তো যাবে না। সামাজিক বিচার বলেও তো একটা কথা আছে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলছি, ওপরের ঘটনাগুলোকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করুন। নারীর প্রতি যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার কথা শুধু মুখে না বলে নিপীড়কদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তা কার্যকর করুন। আসুন, সবাই মিলে বর্জন করি নিপীড়কদের।

#MeTooBangladesh

#MeTooSolidarity

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 114
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    114
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.