নারী এবং ট্র‍্যাশ টক

0

সৈয়দা সাজিয়া আফরীন:

জন্মটা নারীজন্ম। তবুও নারীকে চিনতে হয়েছে অন্যের কদর্য ভাষায়, কিছু বলতে গিয়ে কত ঢোঁক গিলেছি। এ চেনা, এ জানা বীভৎস রকমের বিভ্রান্তির!

মেয়েরা ভাল বন্ধু হতে পারে না, মেয়েরা হিংসুটে, মেয়েরা কুটকচালি করে, মেয়েরা খালি গসিপ করে, মেয়েরা সিরিয়াল দেখে, এসব মেয়েদের কাউকে খুব আপন ভেবো না, সেই তোমার ক্ষতি করবে।

কথাগুলো বেশ বিভ্রান্তিকর। মেয়েরা এতো এতো খারাপ। পৃথিবীর তাবৎ যুদ্ধ হয় মেয়েদের চুলোচুলির মাধ্যমে। প্রথম আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর অন্দরের কারণ ছিল মেয়েদের চুলোচুলি, তাই না?

এবার জেনে নিই শারিরীক বৈশিষ্টের মাধ্যমে কোন মেয়ে সংসার ভাংবে? যে মেয়ের দাঁতের মাড়ি কালচে, যার চুল কোঁকড়া, হাত খাটো, যার রান্নায় উচ্ছে তিতকুটে হয়- এরা কুটনা মেয়ে। একটু সংযত যারা তারা বলবেন এদের খারাপ মানে কুটচক্রান্তকারী হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে এসব ব্যাপারে লক্ষ্য করবেন। যাদের চোখের কপাট ফোলা, যাদের ঠোঁটের কাছে তিল আছে ওরা চরিত্রহীন। যার সামনের দাঁতের মাঝে ফাঁক আছে তাদের কারণে স্বামী মারা যাবে।

শালার জন্য কনে দেখতে গিয়ে এরকম শারিরীক বৈশিষ্ট্যের কয়েকটা মেয়ে বাতিল করেন সালাম সাহেব। তিনি গর্বিত। তিনি নিজের স্ত্রীকে বেলা করে পেটান। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো আগুন ঝরাতে পারেন স্ত্রীর পিঠে, যা ইচ্ছে তা বলতে পারেন। এ নিয়ে তার অনেক অহংকার। কারণ তিনি মেয়ে বাছতে জানেন বলে এমন মেয়ে পেয়েছেন। এ সময় তিনি খানিকটা স্ত্রীর প্রশংসাও করেন।

জেনে নিই আচরণে কীভাবে ফিল্টার করা হবে নারীর ভালো-খারাপ। বাচ্চা হয়ে কয়েক বছর পর চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে এক নারীকে কিছু শুনতে হয়, ইন্টারভিউয়ার তৃপ্তির ঢেঁকুর নিয়ে বলেন- বাহ, তুমি তো বেশ ডেয়ারিং, বাচ্চা-টাচ্চা ফেলে চলে আসছো, আমার ওয়াইফ পিএইচডি করেছে, বাট আমি তার চাকরি প্রেফার করি না। আসলে বিয়ে শাদীটা একটু দেখেশুনেই করতে হয়।

স্বামী কলিম, স্ত্রী রেহানা। শিক্ষিত চাকরিজীবী দম্পতি। আপাত সুখী। পরস্পরের বোঝাপড়া মোটামোটি স্তরে ভালো। কলিম রেহানাকে বলে, তুমি আমার সামনে ইংরেজি বলবা না। স্ত্রী জিজ্ঞেস করে, কেন? স্বামী বকে, ভীষণ বকে, বলে দেয় এতো প্রশ্ন করো কেন? এজন্যেই মানুষ বলে শিক্ষিত মেয়ে অবাধ্য বেয়াদব।

জমির মালিকানার দলিল পড়ছিলাম। কীভাবে সতেরশ সাল থেকে এ জমি বর্তমান মালিকের কাছে এসে পৌঁছুলো! এটা মালিকানার সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজন হয়। এখানে ইদ্রিস আলীর প্রপার্টি পাবে তিন বিলাভ্ড বউ, সকিনা জরিনা হালিমা। ইনাদের আট সন্তান। সকিনার দুইটা মেয়ে, ছেলে নাই। হালিমার একটা মেয়ে, দুইটা ছেলে। জরিনার তিনটাই ছেলে। দলিল পড়তে পড়তে একটু রসিকতাও হয়েছিল সেদিন। আমাদের মধ্যে একজন বলে দেন, আগের কালের মানুষ কতো ভাল ছিল। এখন এরকম মেয়ে নেই। মানুষটার গোপন অভিলাস এবং নারীর জন্য তার মার্কিং দুইটাই জানতে পেরেছিলাম।

নারীর জন্য অবমাননাকর, অপমানসূচক, শ্লেষাত্মক বিদ্রুপগুলো ছেলেদের/পুরুষদের ছোটখাট চিটচ্যাট আড্ডাগুলোতে বেশ জায়গা করে নেয়। এসব কথায় তারা সম্ভবতঃ চায়ের সাথে পারফেক্ট ফ্লেভারের চানাচুরের স্বাদ পান।

নির্যাতক মানে বিশালদেহী কালো কোটে আবৃত সিনেমেটিক কোন মানুষ না। এরা আমাদের মধ্যেই আছে, মুখরা বা চুপচাপ, শান্ত বা দুরন্ত, এক্সট্রোভার্ট বা ইন্ট্রোভার্ট। হয়তো যে পাঁচজনের সাথে সাথে বসে আড্ডা দেন তাদের একজন নির্যাতক। তার কর্ম উন্মোচিত না হওয়ায় ভালো মানুষ সেজে থাকে।

আমি এটিকে পুরুষবিজ্ঞান বলি। এই মানুষগুলা একেকজন সাইকোপ্যাথ। এরা ম্যানিপুলেটর, এরা কেবল লোকসম্মুখে আধুনিক, মানবতাবাদী এবং খুব স্বল্প সময়ের জন্য সমবেদনা দেখায়, এরা সু্যোগে দ্রুত নিজেকে স্পষ্ট করে দ্যায়।

কথায় কবিতায় গানে গল্পে নাটকে বা বিজ্ঞাপনে বা আড্ডায় নারীর অবমাননাকে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। ট্র্যাশ টকগুলো দিয়েই প্রাথমিকভাবে কিছু নির্যাতককে স্পট করা যেতে পারে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 171
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    171
    Shares

লেখাটি ৯১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.