“চেতনায় রোকেয়া: বাঙ্গালী নারীমুক্তির ঋদ্ধ পথিকৃৎ”

0

আব্দুল্লাহ আল সজীব:

কোন মানুষ বা তাঁর কর্মের মূল্যায়ন করা সম্ভব শুধুমাত্র তাঁর যুগের বৈশিষ্ট্য ও চাহিদার আলোকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব বৈশিষ্ট্য ও চাহিদার আবেদন এতটাই বেড়ে যায় যে, যুগের পর যুগ কিংবা শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তার গুরুত্ব এতটুকুও কমে না বরং বাড়তেই থাকে।
আজ থেকে প্রায় সার্ধশত বছর পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের পরিবেশ ছিল কুসংস্কার, অশিক্ষা, কূপমন্ডকতা, অবরোধ প্রথা, নারীবিদ্বেষী ও মাতৃভাষা বিরোধী মনোভাবের বেড়াজালে বেষ্টিত। এ চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে যে চূড়ান্ত দুঃসাহসিকতা ও আধুনিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি আর কেউ নন, নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী নারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

নারীশিক্ষা ও নারীস্বাধীনতার কথা কল্পনা করাও যখন পাপ তখন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বেষ্টনী ছিন্ন করে নারীদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসেন এবং নারীমুক্তির পথ উন্মোচিত করেন। শতবর্ষ আগে রোকেয়া সাহসিকতার সাথে যে পথ দেখিয়েছেন তা আজো নারীদের অগ্রযাত্রায় দৃষ্টান্ত ভূমিকা পালন করছে। নারীরা যে কেবল খেলার পুতুল বা ভোগের সামগ্রী নয় বরং নারীদেরও নিজস্ব সত্ত্বা ও স্বাধীনতা আছে সে কথা তার রচনা ও কর্মের মাধ্যমে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। রোকেয়া তার চিন্তাচেতনা ও ধ্যান-ধারণায় তখনকার নারীদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে ছিলেন। আজকের আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও অনেক নারী যারা তাদের অধিকারের কথা বলতে দ্বিধা করে। অথচ তিনি সেই শতবর্ষ আগে স্রোতের বিপরীতে দাড়িয়ে দৃঢ় চেতনার পরিচয় দিয়েছেন।

তিনি তাঁর পদ্মরাগ কিংবা সুলতানা’স ড্রিমস সহ বিভিন্ন গ্রন্থে নারী অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পদ্মরাগে প্রথাগত সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙ্গে কিভাবে নারীরা নিজেরাই নিজেদের অধিকার আদায় করে তা তিনি তারিণী ভবন আর সিদ্দিকার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী জন্মের চরম লক্ষ্য নয় আর সংসারধর্মই জীবনের সারমর্ম নয়।

আবার সুলতানা’স ড্রিমসে তিনি প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিপরীতে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে এমন এক সমাজ ব্যবস্হার কথা কল্পনা করেছেন যেখানে নারীরাই সর্বেসর্বা। নারীরাও যে রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, শিক্ষক থেকে ডাক্তার, সৈনিক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক হতে পারে, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীরা যে সরাসরি অবদান রাখতে পারে তার বার্তা তিনি সুলতানা’স ড্রিমসের মাধ্যমে প্রথাগত সমাজকে দিয়ে গেছেন।
তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, যুগ কোনো বাধা নয়, বাধা হলো ইচ্ছা শক্তি, প্রকাশ করার মানসিকতা। আর তাই নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে যুগে যুগে নারীদের কাছে তো বটেই পুরুষদের কাছেও উৎসাহ অনুপ্রেরণার নাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

শুধুমাত্র লেখনীর মধ্যেই তার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সামাজিক ও সাংগঠনিক কাজেও নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তিনি একাধারে লেখক, শিক্ষক, সমাজ সংস্কারক ও সংগঠক। তিনি মাতৃভাষা সমৃদ্ধ করতে যেমন অবদান রেখেছেন তেমনি বৈজ্ঞানিক চিন্তাচেতনায় ছিলেন ক্ষুরধার। তার লেখনী জীবনে তিনি মতিচূর, অবোরোধবাসিনী, পদ্মরাগ, নারীর অধিকারসহ অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং শুধুমাত্র সুলতানা’স ড্রিমস ব্যতীত সকল গ্রন্থ তিনি বাংলায় রচনা করেন। যদিও তিনি সাবলীলভাবে ইংরেজি লিখতে ও বলতে পারতেন এবং সে সময় ইংরেজির ব্যাপক কদর থাকা সত্বেও তিনি মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করতে বাংলাকেই বেঁছে নিয়েছেন। তিনি যে বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক চেতনার ধারক ছিলেন তা সুলতানা’স ড্রিমসে সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ শক্তিতে কৃষিকাজ, মেঘ থেকে পানি সংগ্রহের পদ্ধতি কিংবা এরোপ্লেনের ব্যবহার দেখলেই বুঝা যায়। বিজ্ঞানই হতে পারে নারীমুক্তির হাতিয়ার এমন ধারনা থেকে তিনি বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে জোর দেন।

শিক্ষাগুরু হিসেবে তার অবদান অপরিসীম। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন শিক্ষা ছাড়া নারী জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয় তাই সেই সময় মাত্র আট জন ছাত্রী নিয়ে কলকাতায় সাখাওয়াত মোমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা বিশাল একটা চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল। তার পরিশ্রম, ক্ষমতা, চিন্তাশক্তি, ধৈর্য যেকোনো মানুষের জন্য অনুকরণীয়। আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে মুসলিম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অদম্য রোকেয়ার সাংগঠনিক চিন্তা-চেতনা ও কর্মের প্রতিফলন ঘটে । অনেক বিধবা নারীর অর্থসাহায্য, দরিদ্র মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্হা,অনাথ শিশুদের আশ্রয় ও লালনপালন, নারীশিক্ষা, বেকার নারীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানসহ নারী নেতৃত্ব বিকাশে ব্যাপক অবদান রাখা এই সমিতি পরবর্তীতে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে নারী আন্দোলনের বীজ বোপন করে। এবং এর নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেন রোকেয়া।

আজ একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষের বিদ্যমান জেন্ডার বৈষম্য নিরসন ও সমতা অর্জনের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী যে আন্দোলন দানা বেঁধেছে বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই তা গড়ে উঠেছিল রোকেয়ার সংগ্রাম, সাধনা ও লেখনীর মাধ্যমে। তিনি তার অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধে বলেছেন – “আমরা সমাজেরই অর্ধঅঙ্গ- আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কি রূপে? ‘পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে- একই। তাঁহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যই তাহাই।” রোকেয়া কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও অগ্রগামী ছিলেন তা তাঁর সাম্যবাদী চিন্তার মাধ্যমেই বুঝা যায়।

সমাজে বিদ্যমান ধর্মীয় গোড়ামী ,সামাজিক পশ্চাৎপদতা, কুসংস্কার আর ধর্মীয় অপব্যাখাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রোকেয়া প্রমাণ করেছেন প্রতিটি ধর্মই নারীদেরকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তাদেরকে এ যাবৎকাল ভূল ব্যাখ্যা দিয়ে দমন করে রেখেছিল। তিনি ”আমাদের অবনতি” শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন –
“যখনি কোন ভগ্নী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছে, তখনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন রূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। আমরা প্রথমত যাহা সহজে মানি নাই তাঁহা পরে ধর্মের আদেশ ভাবিয়া শিরোধার্য করিয়াছি। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।”

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করে নারীজাতিকে সমাজের মূলস্রোতে আনতে যার এত অবদান, তাঁর আদর্শ, চিন্তা ও চেতনা আমাদের সমাজ কতটা ধারণ করতে পেরেছে তা কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ! তাইতো প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন-” তিনি যে উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি ক’রে গেছেন, তাঁরা বহু দূরে স’রে গেছেন তাঁর চেতনা থেকে। তাঁর উত্তরাধিকারী নারীরা হচ্ছেন ‘ভদ্রমহিলা’, স্বামীর শিক্ষিত দাসী ও প্রমোদসঙ্গিনী, সামাজিক সুবিধাভোগী এবং তাঁরা ব্যর্থ ক’রে দিয়েছেন রোকেয়াকে।”

আজ ৯ ডিসেম্বর! নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী নারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৩৮তম জন্মবার্ষিকী ও ৮৬তম প্রয়াণ দিবস। নারীজাতির প্রতি তাঁর আহবান ছিল- ‘জাগো গো ভগিনী’। এ বাণী অতীতে যেমন নারীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রেরণা যুগিয়েছে, চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আগামীতেও সে প্রেরণা অব্যাহত থাকবে। নারী জাতির ভাগ্যোন্নয়নে রোকেয়ার অবদান ও তাঁর অগ্রগামী চিন্তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট। এজন্য রোকেয়ার আদর্শ, চিন্তা ও চেতনা মানবমনে ধারণ করতে হবে এবং ছড়িয়ে দিতে হবে লোক থেকে লোকান্তরে।

শিক্ষার্থী
উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ,
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
ইমেইল : [email protected]

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 139
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    139
    Shares

লেখাটি ১৭১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.