শো পিস

0

সোহানা স্বাতী:

আজ যেন একটু বেশী শব্দ করে বাসন মাজছে রহিমা। ঝন ঝন ঠন ঠন, বেসুরো শব্দেই বোঝা যাচ্ছে তার মেজাজের পারদ তুঙ্গে। মনে হয় আজও ঝগড়া করে এসেছে স্বামীর সাথে। গতকাল তো কাজেই আসেনি, যোগাযোগ করা যায়নি তার সাথে, প্রতিবারেই সুরেলা কণ্ঠ বলেছে ‘এই মুহূর্তে আপনার কাঙ্খিত নম্বরে মোবাইল সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ আজ অবশ্য নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এসেছে। কোন কথা না বলেই সোজা কিচেনে ঢুকে বাসন মাজা শুরু করেছে। এ ক’বছরে রহিমার স্বভাব জানা হয়ে গেছে আমার।

কবীরকে অফিসের জন্য গুছিয়ে দিয়ে, ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বিদায় দিয়ে ভেবেছিলাম বিছানায় আরেকটু গড়িয়ে নেবো, একটু ঘুমানোর চেষ্টা করবো। গতরাতে ভালো ঘুম হয়নি। আবার সেই ঠাণ্ডা লড়াই। পাঁচ বছরের দাম্পত্যে যত সহজে দুটো শরীর মিশে যায়, মন দুটো দ্রবীভূত হয় না। শুভার্থীদের কত পরামর্শ, ‘একটা বাচ্চা হলেই দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে’, কিছুই ঠিক হয় না। আরও গুছিয়ে, কাঁধ শক্ত করে তবেই বাবা হতে চায় কবীর। মা হওয়ার ইচ্ছের স্রোতের মুখে বাঁধ গড়ে দেয় সে প্রতি রাতে। বিষণ্ণ মনে সঙ্গীর দৃঢ় পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় তন্দ্রা নেমে আসে চোখে। অভিমান হার মেনে যায় ঘুমের কাছে।

এলার্ম এর ডাকেই ঘুম ভাঙ্গে রোজ, সকালের নাস্তা, দুপুরের লাঞ্চ বক্স গোছাতে হয় দ্রুত হাতে, মাপা সময়ের মধ্যে। এরপর অখণ্ড অবসর কবীরের ফিরে আসা অব্দি। কোন একটা কাজে ঢুকতে পারলে ভালো হতো, যতবারই কথাটা পেরেছি, কবীরের কৌশলী জবাব,’মেয়েদের শিক্ষিত হওয়া জরুরি, কিন্তু চাকরি করতে হবে এমন তো কথা নেই। তুমি বাসায় বসে অনলাইন এ পড়াশুনা করো, নিজেকে আরও আপডেট করো।’
যুক্তি দিয়ে বোঝাতে গেলে কবীরের কঠিন উচ্চারণ, ‘চলা পা আর বলা মুখ আসলেই কন্ট্রোল করা কঠিন।’ এরপর আর কথা চলে না, যুক্তিতর্কে নীরবতা নেমে আসে। অর্থনীতিতে নেওয়া সর্বোচ্চ ডিগ্রী সংসারের বাজেট আর বাজারের ফর্দের মাঝেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

গতরাতের কথাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে দরকার কড়া লিকারের এক কাপ চা। রহিমাকে বলা যাবে না চায়ের কথা, সে এখন দারুণ শব্দে কাপড় কাঁচছে। তার সব রাগ ঝাড়ছে কাপড়ের উপর। বোঝা যাচ্ছে আজ কাপড় বেশ ভালো পরিস্কার হবে। গরম পানিতে চা পাতা ছাড়তেই রঙ ছড়ানো শুরু করলো। এই রঙের খেলাটা দেখতে বেশ ভালো লাগে, তাপের উপর নির্ভর করে রঙ, যত তাপ তত রঙ। একসময় হালকা রঙটা গাঢ় হতে শুরু করে।

সোহানা স্বাতী

রঙের খেলায় ছন্দপতন ঘটায় ইন্টারকমের ঝাঁঝালো আওয়াজ। রিসিভার কানে নিতেই কেয়ারটেকারের সাবলীল কণ্ঠ, ‘আপা, রহিমার স্বামী আপনার সাথে একটু কথা বলতে চায়।’ দু এক সেকেন্ডে মাথায় অনেক ভাবনা এলো, কী এমন কারণ থাকতে পারে তার কথা বলার। এর আগেও একবার কথা বলেছিল এভাবে। সেবার একটা বিপদে পড়েছিল। মেইন রোডে রিক্সা নিয়ে ওঠার অপরাধে রিক্সা আটক করেছিল ট্রাফিক পুলিশ। রিক্সা ছাড়াতে এক হাজার টাকার দরকার পড়েছিল তৎক্ষণাৎ। বস্তির প্রতিবেশী কারও কাছে না পেয়ে এখানে এসেছিল। দিয়েছিলাম টাকাটা, এবারও হয়তো তেমনই কিছু হবে।
রিসিভারের ওপার থেকে সংকোচের কণ্ঠস্বর,
আফা, রহিমা তো কাল থাইক্যা না খাইয়া আছে, মুখে কিছু দেয় নাই। আপনি ওরে একটু ভাত খাইতে দিয়েন। আফনার কথা ফেলবো না।
খায় নাই কেন?
আমার লগে কাইজ্যা করছে।
আচ্ছা দেখতেছি আমি।
আফা, আরেকটা কথা। আমি যে আপনার সাথে কথা কইছি, এইডা কইয়েন না ওরে। তাইলে খাইবো না। উল্টা আবার কাইজ্যা করবো।

রিসিভার নামিয়ে রেখে, চুলায় ভাত বসিয়ে চায়ের মগ হাতে বারান্দায় এলাম। রহিমা তখনও কাপড় ধুচ্ছে পানির অবিরাম কলকল শব্দে। লাল ইন্টারকমটা বাজার পর থেকে ভালোই লাগছে। লোকটা বেশ বুদ্ধিমান। ঠিক জায়গা মতো জানিয়ে গেছে ওর খাওয়াটা যাতে হয়, রহিমা তো জানতেও পারেনি। বউয়ের প্রতি টান আছে বলতে হয়। আর্থিক অনটন থাকলেও রহিমা তো ভাগ্যবতী এদিক থেকে।
কত বয়স হবে রহিমার! আমার থেকে দু এক বছরের ছোট হয়ত, অবশ্য ওদের জীবন শুরু হয় অনেক আগে। সামাজিকভাবে দুই শ্রেণির প্রতিনিধি হওয়ায় ওর বিয়ে ১৪ তে, আমার ২৪ এ। একজন তিন সন্তানের জননী, আর আমি অনাগত সন্তানের আসবার পথে মসৃণ করতে মরিয়া হয়ে আছি। একজনের স্বামী সমাজে প্রতিষ্ঠিত, অধিক সচেতন, আরেকজন হোঁচট খাওয়া। হোক না রিক্সাচালক, তবুও তো দরদ আছে বউয়ের প্রতি, ঠিকই ছুটে এসেছে তার খাওয়ার ব্যাবস্থা করতে।

রাতে রান্না করা মুরগীর মাংস দিয়ে গরম ভাতের প্লেটটা এগিয়ে দিতেই, রহিমা প্রথমবার কথা বললো আজ,’ ভাত দিতাছুইন ক্যান?’
এমনি। আমিও নাস্তা করিনি এখনও। ভাবলাম দুজনের জন্যই ভাত করি আজ।
আফনে তো সকালে ভাত খান না আফা?
আজ খাবো।

জুঁই ফুলের মতো সাদা গরম ভাতের কাছে নমনীয় হয় কর্মক্লান্ত ক্ষুধার্ত নারীর অনশন। মোড়াটা টেনে নিয়ে আমিও ওর পাশে বসি। একথা, সে কথায় জানতে চাই গতকাল না আসার কারণ।
রহিমার সরল স্বীকারোক্তি, ঝগড়া বাঁধছিল আফা।
আমার কৌতূহলী চোখে তখন কারণ খোঁজার চেষ্টা।
গরীবের আর কী কারণ? কারণ ঐ একটাই ট্যাঁহা। রিক্সা কিনন্যা দিছি আমি নিজের ট্যাঁহায়। তার খাটতে মুঞ্চায় না। শুইয়া বইসা দিন পাড়ি দ্যায়। আমি খাইটা মরি, বাচ্চা গো পড়ার খরচ চালাই। হেরপরও তার আমার ট্যাঁহার দিকে নজর।
গায়ে হাত টাত তোলে?

সেই দিন আর নাই গো আফা। এহন রোজগারি মাইয়ারা আর মাইর খাইয়া চুপ থাকে না।
আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওর খাওয়া দেখি। বেশ গুছিয়ে খায় মেয়েটা। কথাও বলে আত্মবিশ্বাস নিয়ে।
তোমার কখনো নিজেকে অসহায় লাগে না? স্বামী যদি ফেলে চলে যায়?
যাউক গা। আমার চিন্তা কী? হাত আছে রথ আছে …
হাত তো বুঝলাম, রথটা কী?
রথ হইল আমার এই দুইখান পা। হাত পা যতক্ষণ ঠিক আছে, কোন চিন্তা নাই গো আফা।

আমি ওর কথা শুনছি মুগ্ধতা নিয়ে, টুং করে একটা মেসেজ এসে শব্দ ছন্দ পতন ঘটায় আলাপচারিতায়।
“সন্ধ্যায় পার্টি, তৈরি থেকো, গাড়ি পাঠিয়ে দেব।”

৭ টা শব্দের এক কঠিন বার্তার সরলরেখা। তৃষ্ণার্ত চোখে আর কোন শব্দ বা সাইন পেলাম না, না কোন ইমোজি। বার্তায় কাল রাতের কোন রেশ, কোন অনুশোচনা কিচ্ছু নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলাম চুপিসারে, যেন এই শক্তিশালী মেয়েটার কাছে ধরা না পড়ে যাই।

গোসলে যাবার প্রস্তুতি নেই, মুছে ফেলতে হবে সব দুশ্চিন্তা, ধুয়ে ফেলতে হবে ক্লান্তি, সুন্দর করে সাজাতে হবে নিজেকে। রাত জাগার ছাপ ঢেকে ফেলতে হবে প্রসাধনে, সুন্দরী বউয়ের গর্বিত মালিক হবার হাসিটায় যেন কমতি না পড়ে কবীরের মুখে।

রহিমা এখন শান্ত হাতে ফার্নিচার মুছছে, বাথরুমে যেতে যেতে ওকে মনে করিয়ে দেই সাবধানে শো পিসগুলো ঝেড়ে মুছে রাখার কথা। এগুলো কবিরের খুব শখের জিনিস, বিভিন্ন দেশ থেকে আনা স্যুভেনিয়ার।
প্রতিদিনের মতো আজও বললাম,’ রহিমা! সাবধানে শো পিসগুলো মোছো …’
কোথায় যেন একটা ধাক্কা খেয়ে কথাটা ফিরে আসলো নিজের কাছেই বুমেরাং হয়ে। ইথারে ভেসে থাকা ‘শো পিস’ শব্দটার রেশ থেকে গেল মনে।

জলের ধারার নিচে অনেকক্ষণ ভিজবো আজ যতক্ষণ না মনের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যায়। তারপর অনেক কাজ বাকি। সন্ধ্যায় পরার শাড়ি, জুতো, কুন্দনের গয়না বের করার আগে একটা কাজ করতে হবে আমাকে, অসম্পূর্ণ সিভিটা সম্পূর্ণ করতে হবে আজই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 262
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    262
    Shares

লেখাটি ১,২৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.