ঘনিয়েছে আঁধার চারধারে…

0

সঙ্গীতা ইয়াসমিন:

ফেসবুকের নিউজফিডে এখনও ভাসছে স্বপ্নেভরা দুটো মিষ্টি চোখ; কত অনাগত স্বপ্ন, সাধ নিয়ে বুকে নিয়ে একটি কুঁড়ি ঝরে গেল সময়ের আগেই! ঝরে যেতে হলো! এই সমাজ, সামজিক আচার-কানুন, আমাদেরই বেঁধে দেওয়া নিয়মের বেড়ি ভেঙে, আমাদের দিকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলে গেল আমাদেরই কন্যা অরিত্রী!
মৃত্যু যে ভূমিতে অতি স্বাভাবিক ঘটনা, সেই মাটিতেই অরিত্রীর মতো কোনো শিশুর মৃত্যু কেবলই মৃত্যু নয়। এই মৃত্যু জন্ম দেয় আরও অনেক প্রশ্নের, এই মৃত্যু আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয় আমাদের ব্যর্থতাসমূহ!

অরিত্রী অধিকারী

নিজের কন্যাটিও অরিত্রীর মতোই নবম শ্রেণির ছাত্রী, প্রতিদিন ওর নতুন নতুন আইডিয়ার এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে যখন হাঁপিয়ে উঠি, তখন নিজের কিশোরীবেলাকে ভেবে মনে মনেই হাসি! মূলত ওতো শিশুই, একটু বড় শিশু! অরিত্রীর দু’চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো বয়ঃসন্ধির এই জীবন ওর কাছেও অনেক কৌতূহলের, অনেক স্বপ্নের, অনেক অজানাকে আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ হওয়ার! এই দুরন্ত কৈশোরেই তো ওরা দামাল হবে, ভুল করবে, ওরা যা নয় তাই তাই করবে, বিধি-নিষেধের বেড়াজালে ডিঙিয়ে অসম্ভবের আগল ভাঙবে ওরা! কৈশোরই যদি কেড়ে নিই ওদের জীবন থেকে, ওরা বাঁচবে কী নিয়ে? কেমন করে ওরা বড় হবে? বড় বড় স্বপ্ন দেখবে? ছোট্ট ওই বুকে কেমন করে একদিন ধরবে লাল-সবুজের এত্তো বিশাল মায়াময় পতাকা!

যখন আমাদের সন্তানেরা প্রবঞ্চিত হয় ঘরে-বাইরে; অসততা, অন্যায় আর অনাচারের মাঝে বেড়ে ওঠা শিশুরা কেন সৎ পথে হাঁটতে শিখবে? গৃহে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেনো শিশুদের কাছে আমরা মানবীয় মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি, কেনো এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারিনি যাতে কঠোর শাস্তি না দিয়েও ভালোবাসা দিয়েই করণীয় আর অকরণীয়গুলো জানিয়ে দিতে পারি!

শিক্ষা মানে যখন বাণিজ্য, শিক্ষা মানেই ভীতি-ভয়, সন্ত্রাস, বাড়তি বইয়ের বোঝা! শিক্ষা মানেই সনদপত্রের ভার, যখন শিক্ষা মানেই কিছু অথর্ব,দাম্ভিক জায়ান্ট পণ্ডিতবর্গের আবাস তখন সেই শিক্ষা আদতেই কি জীবনের কোনো কাজে আসে? সেসব কথা ভাববার সময় অনেককাল আগেই পেরিয়ে গেছে।তবুও আমরা ছুটছি অসম্ভব গতিতে অলীক-অদেখা সোনার হরিণের পেছনে!আজও এই একবিংশ শতাব্দেও আমাদের শিক্ষা বাস্তবমুখী, কর্মকেন্দ্রিক, জীবনঘণিষ্ঠ এবং কোনোভাবেই যুগোপযোগী নয়; এই শিক্ষায় শিক্ষিতরা সার্টিফিকেটধারী হন বটে! তবে মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ নন বলেই জানি,দেখি এবং চিনিও।

এই চেনাজানা আমাদের প্রতিদিনের জীবনেই সমাজের প্রতিটি স্তরে, সর্বক্ষেত্রে, সকল সেক্টরের দিকে তাকালেই দেখতে পাই, বিশেষ কোনো গবেষণা ছাড়াই একথা বলা যায়। আমাদের বস্তাপচা এই শিক্ষাব্যবস্থা আর মুখস্ত বিদ্যার এই পরীক্ষা পদ্ধতির সমূলে কুঠারাঘাত করতে না পারলে দিনে দিনে আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে মানসিকভাবে অসুস্থ একটি জাতিতে পরিণত করব বলেই আমার আশঙ্কা হচ্ছে।

যে স্কুলে ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে সিট জিতে যাওয়া কিংবা না জিততে পারার মনোকষ্টে ছাত্রছাত্রী তথা বাবা-মায়েদের জীবন অর্থহীন(!) হয়ে যায় এমন আহাজারি করতেও শুনেছি, সেই ভিকারুননেসা নূন স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল যখন এমন মানবতা(!) দেখান যে, লজ্জা-অপমানের হাত থেকে বাঁচতে একটি শিশুকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়, শিশুটির জীবন দক্ষতা দিতেই যখন ব্যর্থ আমরা, তখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা যথাযথ এবং সময়েরই দাবী!

এই সেই স্কুল, যারা নাকি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রেষ্ঠ মানুষ বানানোর দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। প্রতিবছর শ’য়ে শ’য়ে গোল্ডেন এ প্লাস প্রসবিত করেন তাঁদের সেই গৌরবকে সমুজ্জ্বল করেন তাঁরা! আজ এই মূহুর্তে তাঁদের অর্জনের সকল ঝকমকি মোড়ক ছাপিয়ে একটি প্রশ্নই কেবল উঁকি দিচ্ছে, এতো এতো জিপিএ আদতেই আমাদের খুব কি দরকার?

সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পরিবারের পরেই আসে বিদ্যালয়,আর বাবা-মায়ের পরেই শিশু পায় শিক্ষকের সান্নিধ্য। শিক্ষককে শিশু তাঁদের ধ্যান-জ্ঞান করে। তাদের জীবনের যাবতীয় বিষয়ে শিক্ষকই পরম ও চরম সত্য বলেই যে শিশুরা জানে, সেই শিশুদের কাছে কি আমরা পেরেছিলাম রোল মডেল হতে? যদি না পারি সেই ব্যর্থতার দায় কেনো অরিত্রীকেই নিতে হলো? আমরা এ কেমন সমাজ বিনির্মাণ করলাম? যেখানে শিক্ষকই শিশুর হন্তারক? আমরা কি চাইলেই এর দায় এড়াতে পারি? রাষ্ট্র কি পারে এর দায় এড়াতে?

উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে সাক্ষর করে। শিশু সুরক্ষার মূল নীতিমালার তৃতীয় অনুচ্ছেদ অনুযায়ী (৩.১, এবং ৩.২) রাষ্ট্র শিশু সুরক্ষায়, ও শিশুর শারীরিক, মানবিক ও আবেগিক ও সামাজিক বিকাশ তথা উন্নয়নে যাবতীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে মর্মে উল্লেখ রয়েছে।

সঙ্গীতা ইয়াসমিন, টরন্টো

এখন সময় হয়েছে কেউ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো শিশুর জীবন সংহারের কারণ হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গৃহীত হবে মর্মে আইন প্রণয়ন করার!
একজন প্রিন্সিপ্যাল যখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ আসনটিতে বসেন, তিনি কি ভুলে যান তিনিও একজন মা? একজন ছাত্রীর পিতা যখন নিজের সন্তানের হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, তখনো মাতৃহৃদয় ভিজে উঠলো না? পিতার লজ্জায় সন্তানের মর্মবেদনা দেখতে পেলেন না তিনি? আর ক্ষমতার দম্ভে অনড় থাকলেন? ভালোবেসে যে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই শিক্ষাই তো আজীবন মনে রাখে মানুষ! সেই শিক্ষাটি আপনিই পাননি বোধ হয়। আপনারও আপনাদের মতো শিক্ষকদের জন্য আমার করুণাও অবশিষ্ট নেই!

বয়োসন্ধিকালে শিশুর শারিরীক মানসিক বৃদ্ধির যে স্বাভাবিক পরিবর্তন ও বৈশিষ্ট্যাবলী, তাতে অরিত্রী যা করেছে, সেটা কাঙ্ক্ষিত না হলেও অস্বাভাবিকও কিছু নয়! তাই এই ঘটনায় এমন কিছু করা দরকার, যাতে মূলসুদ্ধ শেকড় উপড়ে ফেলা যায়, নতুন জমিনে নতুন বৃক্ষ রোপণ করা যায় শেকড় থেকেই, বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলে করা যায় বিষমুক্ত চাষাবাদ।

শিশুদের সাথে কাজ করবেন যারা তাঁদের সকলকেই শিশু মনস্তত্ত্ব জানতে হবে, শিশুর স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণে তাঁরা কাজ করবেন, অন্যথায় তাঁদের কঠোর শাস্তি পেতে হবে। এই মর্মে পলিসি গাইডলাইন করা দরকার শিক্ষক প্রশিক্ষণেও। সি ইন এড থেকে শুরু করে, বি এড, এম এডকে আরও প্রায়োগিক আঙ্গিকে ঢেলে সাজানো দরকার বাস্তবতার নিরিখে এবং সেসব নীতিমালা কিতাবি না করে বাস্তবে সফল প্রয়োগের উদ্যোগও নেওয়া দরকার।

শিশুর সাথে বন্ধুত্বসূলভ আচরণে যে দূরত্ব কমে, তা আখেরে শিশুকে মানুষ হিসেবে মর্যদা লাভ, ব্যক্তিত্বগঠন তথা আত্মবিশ্বাস তৈরিতে দারুণভাবে সহায়তা করে। শিক্ষক মানেই লাল চোখ, বদমেজাজ, ধমকধামক এই সনাতনী ধারণার আবরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

পরিশেষে এটাই বলার- দিন বদলেছে, বদলানো সময়ের হাত ধরে আসুন, আমরা ক্ষমা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে জয় করি প্রতিটি শিশুর হৃদয়! আমাদের ব্যর্থতার রথ কাঁধে করে ওরাই একদিন নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে সঠিক গন্তব্যে! আলোহীন এই আমাদের কাছে ওরা কী দিশা পাবে? ওদেরকে আলো দিতে আসুন আরও একটু উন্মুক্ত করি আমাদের হৃদয় ঘরের বন্ধ দরোজাগুলো!

আলো আসুক! নতুন ভোরের আলোয় আর কোনো অরিত্রিরা বেদনা হয়ে না ঝরুক!

“একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার—সারা বিশ্বের বিস্ময় তুমি আমার অহংকার!” সেই অহংকার যখনই ভূলুণ্ঠিত হয় বিষাদ ভর করে অন্তর তীমিরে, ঘণায় আঁধার চারপাশে! তবুও প্রতীক্ষা করি একদিন সব আঁধার কেটে রাঙা সূর্য ফুটবেই! ভালো থাকবে আমাদের সন্তানেরা, ভালো থাকবে প্রিয় বাংলাদেশ!

সঙ্গীতা ইয়াসমিন, টরন্টো, কানাডা থেকে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 129
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    129
    Shares

লেখাটি ৬৮৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.