বাঁজা- দ্য আউটসাইডার

0

সুচিত্রা সরকার:

খুব, খুব কানে লাগছিল কথাটা। অন্যান্য বিষয়ের মতো এটিও বাঙালী শিষ্টাচারে পড়ে না। সিরিয়ালে দাদু, নাতনিকে বলছে বিয়ে তো হলো- আমি তিন মাসের মধ্যে সন্তান চাই!
এটা সিরিয়াল নায়িকার ‘দাদু-বাড়ির আবদার’! সিরিয়াল জীবনের অংশ বিশেষ। স্বীকার করুন বা না করুন!

সুচিত্রা সরকার

জীবন নায়িকাদের অবস্থা আরো সমীচীন। কেস স্টাডিতে এবার বেশি দূরে যাবার দরকার নেই। বিয়ের বয়স হলো বেশ ক’বছর! শুরুর দু’তিন মাস যেতেই- ‘দেখো, করো, নিয়ে নাও’। ‘দরকার’! ‘সংসারে স্বামীর মায়া জন্মাবে না’- এরকম নানা কথা শোনা শুরু হলো।
আর এখন শুনছি- ‘না, কপালে নাই ওর!’, ‘ভাগ্য খারাপ!’, ‘জীবনটা মাইয়ার শ্যাষ!’, ‘পড়ালেখা কইর‌্যা কী লাভ, যদি বাচ্চা না হয়’! এসব কথায় আঁতকে আঁতকে উঠি!

এটুকুতে জীবন শ্যাষ? আরে ভাই, আরে বোন- সারাজীবন দেখলেন তো কতো জীবন, একটা সংজ্ঞাতেই চললো! বিয়ে, বাচ্চা, সংসার! এর বাইরে যে জীবনের আরো সংজ্ঞা আছে, তা জানেন?
যাদের শৈশব থেকে মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়, বিয়ে ধর্ম, সন্তানপালন কর্তব্য- তাদের আমি দোষ দিই না। এটা প্রকৃতির কৌশল। যদি মানুষ বিয়ে না করে, যদি সন্তান জন্ম না নেয়, তবে প্রকৃতি ধসে পড়বে!

কথা সত্য! বিলকুল সাচ বাত!

তবে এটাও তো ঠিক, প্রকৃতির ব্যতিক্রম আছে। সমাজে দুটো মানুষ ভিন্ন চিন্তা করতে পারে! ভিন্ন চিন্তা করতে পারে, কারণ সে প্রকৃতির কৌশল জেনে গেছে। অথবা তার বৈরাগ্য আছে।

মেয়েটা হয়তো জেনে বসে আছে, এই যে ছোট থেকে বড় হওয়া, তারপর বিয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া- এটা প্রকৃতি চায় বলে! বিয়ের পরে সন্তান! তার মুখে অমৃতসম ‘মা’ ডাক শুনতে পাওয়া স্বর্গতুল্য- কথাটা প্রলোভন! তাকে ‘রত্নগর্ভা হবার প্রতিযোগিতায় নামতে হবে- এ নীতি অন্যায়! সে আবিষ্কার করতেই পারে! আর তারপর সে চয়েজ করলো, অন্যরকমভাবে বাঁচবে! ভাবতেই পারে!

সে ভাবতে পারে, এই যে সন্তান বড় করবে, পঁচিশ- ত্রিশ বছরের পর সিনারিও যাবে পালটে। সন্তানের সংসার হবে, সন্তান হবে। বিয়ের পর স্বর্গতুল্য সম্পর্কের মাকে নিয়ে টানাপোড়েন হবে (বউ- শাশুড়ি, কন্যা- মাতা)। তারপর অবস্থা তথৈবচ!

তো, এই মেয়েটা যদি ভাবে প্রকৃতির এই মিথ্যার সম্পর্ক সে মানে না- কী এমন অন্যায়? সে যদি সন্তান নিতে না চায়, যদি ভয় পায়, যদি এড়িয়ে যায়, তাতে কী ক্ষতি! একটা মেয়ে সংসার করেও সন্তানের হ্যাপা নিতে না চাইতে পারে না?

জগতে একটা মেয়ে কি সন্তান ছাড়া জীবন চিন্তা করার, স্বাধীনতা পেতে পারে না! স্ব-ইচ্ছায়? পারে না? নিজের মতো করে, সমাজের নিয়মটাকে ভাঙার অধিকার রাখে না?

বুড়ো বয়সে কে দেখবে? সন্তান হলেই কি- সব সন্তান বাবা- মাকে দেখে রাখতে পারে? আরে ভাই, বুড়ো বয়সে ক’টা মেয়ে তার জন্মদাতাকে ভাল রাখার অধিকার পায়? হিসেবটা জানাবেন, জানা থাকলে!

এতো মানুষ দেখলাম। শিক্ষিত- অশিক্ষিত। প্রগতিশীল- গোঁড়া। নাস্তিক- আস্তিক। কাউকে পেলাম না, যে বলেছে, বাচ্চা নেবে না, ঠিক আছে, এটা তোমার চয়েজ! তুমি জীবনটাকে আর জড়াতে চাও না। অন্যরকম করে বাঁচা যায় কিনা, দেখতে চাও। দেখো!

আসলে দাগের বাইরে পা দিতে মানুষগুলো শেখেইনি। তাই তারা বিয়ের বছর না যেতেই চিন্তা করে মেয়েদের কোল আলো হবে! সন্তান আসবে! কোলজুড়ে জ্যোতিকাচিহ্ন দেখা দেবে!
আরে বোন, কোল আলো শুধু মেয়ের না, পুরুষেরও কোল আলোই থাকে!

সন্তান এলে কোল আলো হয়, এটা রাবিশ কনসেপশন। প্রকৃতির চাল! জেনে রাখুন! এটা বলে সমাজে ষাট- সত্তর ভাগ মানুষকে কষ্ট দেয়া হয়। ডিপ্রাইভ করা হয়। আলাদা করা হয় (এই অংশের মধ্যে যাদের সন্তান নেই তারা আছেন- বন্ধ্যা নারী আর পুরুষ)।

সেদিন গল্প শুনছিলাম। একজন ঈদের সালামি দিচ্ছে। অফিসের সব কলিগের বাচ্চাদের! সবাইকে দিতে দিতে একজনের কাছে গিয়ে বললো, আপা আপনার ক’জন? আপাটি উত্তর দিল, ‘নেই’!
প্রশ্ন স্বাভাবিক! কারণ আমাদের মনোজগত ধারণ করে আছে একটি তত্ত্ব- বিবাহিত নারীর বাচ্চা মাস্ট! না থাকাটা অন্যায়! অস্বাভাবিক!

তাই সমাজে বাঁজা (বন্ধ্যাটা এতো বাজে শোনায়!) নারী কোনো শুভ কাজে হাত দিতে পারে না। আড়ালে আবডালে থাকে!

তাই বাঁজা নারী ডাক্তারকে হাজার হাজার টাকা দেন আর বলেন, ডাক্তার সাব, আর কিছু চাই না জীবনে! একটা সন্তান শুধু চাই। কোলটা আমার বাকিদের মতো আলো করে দিন!

চাওয়াটা আসলে তার নয়। চাওয়াটা সমাজের। চাওয়াটা সমাজের প্রচলিত ধারণার!

পৃথিবীর অনেক বয়স হলো। শোনা যাচ্ছে, ধীরে ধীরে পৃথিবীর নিঃশেষের পথেও চলছে! এতো বছর পরে আজকে থেকে ভাবুন না! একটু ভিন্ন কিছু!
যে নারীর গর্ভে সন্তান আসে, তাকে যেমন যত্নে রাখা হয়, আদর আহ্লাদ (করাটা যৌক্তিক নয়, বলছি না) করা হয়- যে নারীর সন্তান নেই, কখনো হবে না, তাকেও যত্নে রাখুন! তাকে বুঝতে দিন, সে সমাজে আলাদা কেউ নয়। সন্তান না হলো মানেই সে ফুরিয়ে গেল না! হেরে গেল না। কপাল মন্দ না! এটা কোনো পাপের ফল নয়।

কারণ প্রকৃতি যেমন মায়ের কোলে সন্তান চায়- প্রকৃতি বাঁচিয়ে রাখতে, তেমনি সে বাঁজাও তৈরি করে সমাজে! এটাই প্রকৃতির সৌন্দর্য!

তাই বাঁজা নারীকে আউটসাইডার না বানিয়ে প্রকৃতির সত্যটা জানুন! তাকে বলুন, এটা স্বাভাবিক ঘটনা। আর যে নারী সন্তান চায় না, তার মতামতকে শ্রদ্ধা করুন!

৫.১২.২০১৮
দারুস সালাম, ঢাকা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 253
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    253
    Shares

লেখাটি ১,৪২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.