#মি টু: আপনার সন্তানটি সবচেয়ে অরক্ষিত আপনার নিজের ঘরেই

0

মনীষা হক:

হয়তো আমি এই #মি টু আন্দোলনের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ এবং অপ্রতিষ্ঠিত, যার এখনও কোনো সামাজিক পরিচয় নেই। আমি সবেমাত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি।
আজকে আমি যে ঘটনাগুলো শেয়ার করবো সেগুলো আমার দীর্ঘ বারো বছরের অবদমিত কিছু দুঃস্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা। এবং দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাকে একটি পারিবারিক পরিবেশেই এবং পরিবারের সদস্য দ্বারাই এই সেক্সচুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু যে বয়সে আমার সাথে এসব ঘটনা ঘটে, তখন আমার কাছে একটা ছেলে থেকে একটা মেয়ের শারীরিক কী পার্থক্য থাকতে পারে, তাই জানা ছিল না। কারণ তখন আমার বয়স খুব কম, খুব বেশি হলে ৪/৫ বছর হবে। যে মানুষরূপি জানোয়ারটা আমার ছোটবেলাটা বিভীষিকাময় করে তুলেছিল, তার পরিচয় আমি এখন দিতে চাই না, কারণ সমাজে তার পূজনীয় একটা রূপ আছে।

তার কাছেই আমার শৈশবের একটা বিশাল অংশ কেটেছিল। কেননা সে আমাদের পরিবারের এতোই আপনজন যে আমার বাবা মা স্বপ্নেও ভাবেনি যে সেই সোকল্ড মানুষটা তাদের মেয়েকে তার লালসার শিকার করতে পারে। আমার বাবা-মা দুজনেই চাকরিজীবী। চাকরিসূত্রে তারা ১০/৪ টা বাড়ির বাইরে থাকতো। বাসায় তখন আমি, আমার তের মাসের বড় ভাই আর আমাদের নানি আর ওই লোকটা থাকতো।

আমার সাথে যেটা হয়েছে সেটা একদিন বা দুদিনের ঘটনা না। সেটা দীর্ঘদিনের। আমি ছোটবেলা থেকেই তার কোলে পিঠে করে মানুষ হয়েছি। তাই স্বাভাবিকভাবে আমার কোনো পড়ালেখা বা কাজ না থাকলে তার কাছে গল্প শুনতে বা খেলতে যেতাম। সে বিভিন্ন দেশের গল্প শোনাতো। আমার ভাইয়ের সাথে গেলে বেশিভাগ সময়ই সেগুলো খুব মজার আর শিক্ষণীয় হতো। যখন আমি একা যেতাম, তখন সেগুলো হতো ভয়াবহ রকমের কুৎসিত। সুযোগ পেলেই আমার ছোট্ট শরীরটার স্পর্শকাতর অংশগুলোতে হাত দিত। আমি অত ছোট বয়সেও কীভাবে জানি অনুভব করতে পারতাম, এগুলো খারাপ স্পর্শ, এগুলো ঠিক না। আমি বাধা দিতে চাইতাম। চিৎকার করতাম, কেন এসব করছো। আমাকে ছাড়। আমার কষ্ট লাগছে। কিন্তু লোকটা আমাকে বোঝাতো, এটাই খুব স্বাভাবিক। এরকমই হয়। এটা বলে খেলা।
কিন্তু এই খেলাটা প্রকাশ করা যাবে না, তাহলে মহাবিপদ হবে। এই ভয়ে আমি পরিবারের কারও কাছে বলতে পারিনি আমার সাথে কী হচ্ছে।
আমি খুব ভাগ্যবান যে সেসময় আমি আমার ভাইয়ের বয়সী পাশের বাসার একটা বড় বোন পেয়েছিলাম যেও আমার মতো একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। আপুটাকে আমি একদিন খুলে বলি যে আমার সাথে ওই মানুষটা এসব খেলা খেলে। আপুটা আমাকে বলে, যেসব হচ্ছে তা যেন আমি বাসার কাওকে না বলি, কারণ আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না! সে তার ফুপিকে বলেছিল, তার সাথে তার ফুপা নোংরা কাজ করতে চেয়েছে। কিন্তু তার ফুপি তার কথা বিশ্বাস করেনি উল্টো মিথ্যা অপবাদের নামে চড় মেরে বসে।

আমি তার অভিজ্ঞতা শুনে আরও ভয় পেয়ে যাই। আমার মনে হতে থাকে, আমার কথাও ওরা বিশ্বাস করবে না, আমি এসব বললে আমাকেও চড় খেতে হবে। আপু আমাকে সাবধান করে দেয়, যা হচ্ছে তা খেলা না। আমি যেন খুব সাবধানে থাকি, যতটা সম্ভব লোকটার থেকে দূরে দূরে থাকি, বাবা মার সাথে থাকি। আমিও খুব সাবধান হয়ে যাই। আমার ছোটবেলায় হয়তো এসব কারণেই খুব শ্বাসকষ্ট ছিল। তাই স্কুল যেতে পারতাম না। সারাদিন বাসায় শুয়ে বসে থাকতাম। লোকটা আমাদের বাসার বাইরে একটা গেস্টরুমের মতো ঘরে থাকতো। খালি খাওয়ার সময় হলে মূল বাড়ির ভিতর এসে খেয়ে যেত। আমি সেই সময়টা খুব আতঙ্কের মধ্যে পার করতাম। বার বার শুধু মনে হতো এই বুঝি লোকটা আমকে ধরতে এলো। ভয়ে কুকড়ে গিয়ে পরদার আড়ালে লুকিয়ে থাকতাম। বুকের ভেতরে দ্রিম দ্রিম করে ঢোল বাজতো। তবুও সেই দৈত্যের কাছ থেকে সবদিন বাঁচা সম্ভব হতো না।

যেদিন হায়নাটা আমাকে ধরতে পেতো, আমার আর পালানোর কোনো সুযোগ থাকতো না সেদিন নিজেকে অপরাধী মনে হতো, মনে হতো আমারই ভুলের জন্য দৈত্যটা সুযোগ পেল। নিজের জীর্ণ শীর্ণ শরীরটায় পাপবোধ ছেয়ে যেত। খুব ঘেন্না হতো নিজের উপর। মনে হতো মরে যাই নাহলে লোকটাকে খুন করে ফেলি। কত রাত যে ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে চমকে উঠেছি, চিৎকার করেছি ঘুমের মধ্যে “মা আমকে বাঁচাও।” মা জড়িয়ে ধরে বলেছে “কী হয়েছে বাবা?” “সেই কী হয়েছে বাবার” উত্তর ক্লাস এইটের আগে দিতে পারিনি। একসময় আর কোনো পুরুষজাতিকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সবসময় মনে হতো সব ছেলেরই মুখোশের আড়ালে ওই কুৎসিত লোকটার মতো একটা রূপ আছে। বাবাকেও সহ্য করতে পারতাম না। মনে হতো, আমার বাবাও হয়তো এমন। সবার কাছ থেকে দূরে দূরে থেকে গল্পের বইয়ের মধ্যে নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করতাম।

ভাগ্য ভালো আমার বয়ঃসন্ধি আসার অনেক আগেই লোকটা মারা যায়। সেদিন লোকটাকে দেখতে অনেকে এসেছিল। সবাই শ্রদ্ধায় নতজানু হয়ে- আহা কী ভালো মানুষ! কী দানশীল মানুষ! এরকম মানুষ হয় না” করছিল। আমার সেদিন লাশের সামনে দাঁড়িয়ে ঘেন্নায় শুধু একদলা থুতু ছাড়া আর কিছু আসেনি।

এরপর ক্লাস এইটে আমার জীবনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। যখন আমার বাবা মাকে আমার সাথে কী কী হয়েছে সব খুলে বলি, তখন আমার বাবা নিজে অনুতপ্ত হলেও মা কথাটা মানতে পারেনি।

আধুনিক বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের নিশ্চিন্তে পরিবারের যেকোনো সদস্যদের কাছে রেখে কাজে যায়। এতো নিশ্চিন্ত হওয়ার আগে একবার দয়া করে ভাবুন, আপনি যার দায়িত্বে আপনার ছোট্ট মেয়ে বা ছেলেটাকে দিয়ে যাচ্ছেন, সে কি প্রকৃত অর্থেই মানুষ! না মুখোশের আড়ালে হায়েনা শকুন! নিজের সন্তানের সোনালী শৈশব কৈশোরকে সুরক্ষিত করা আপনার দায়িত্ব। তাদের কথা শুনুন, বোঝার চেষ্টা করুন তারা কোনো ব্যাপারে আতঙ্কিত কিনা, তারা কিছু বলতে চায় কিনা। আপনার শিশুর সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি আপনিই হতে পারেন, আর কেউ না। নিজের সন্তানকে একটা নিকষ কালো গহ্বরে ফেলে দিবেন না। সবাই সেই জায়গা থেকে ফিরে আসতে পারে না।

শৈশব সুরক্ষিত হোক ভালোবাসায়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 372
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    372
    Shares

লেখাটি ১,৯৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.