আসুন, মেয়েদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা সৃষ্টি করি

0

মার্টিনা দেওয়ান:

সময়টা ছিল ২০০০ সাল। আমার পিসিমা, পেশায় স্কুল শিক্ষিকা। প্রতিদিন অনেকদূর পথ চাঁদের গাড়িতে করে স্কুলে আসা যাওয়া করতেন। উনার নিজ মুখে শুনেছিলাম-শাড়ি, ব্লাউজ,পিনন-হাদি (চাকমা ড্রেস) পড়ে স্কুলে ক্লাস করতে যাওয়া কঠিন ব্যাপার ছিল।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন গো পিসিমা? শাড়ি, পিনন পরা কি এতোই কঠিন কাজ যে স্কুলে পড়ে যেতে পারতে না?
পিসিমা উত্তরে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন, সেসময় চাঁদের গাড়িতে মেয়ে যাত্রীদের গাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে ছেলে যাত্রীদের দাঁড় করিয়ে নেয়া হতো। আর শাড়ি বা পিনোন পরলে পুরুষরা সুযোগ নিয়ে লুঙ্গির ভেতরের পুরুষাঙ্গ ব্লাউজের খোলা পিঠে ঘষতে ঘষতে পিসিমাদের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যেতেন। মানে মেয়েদের এরকম পরিবেশের মধ্যে দিয়ে যেতে হতো। তাদের সেসময়ের পরিবেশে লজ্জায় কেউ প্রতিবাদ করতো না।

সময়টা এখন ২০১৮ সাল। আমি পেশায় কলেজ শিক্ষিকা। দুর্গম এলাকায় কলেজ হওয়ার কারণে প্রতিদিন আমাকেও অনেকদূর পথ বাসে এবং মোটর সাইকেলে আসা যাওয়া করতে হয়। যেহেতু অনেকদূর পথ আসা যাওয়া করতে হয়, ক্লান্ত হয়ে যাই, তাই বেশিরভাগ সময়ে বাসে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকি। আর বাসে উঠতে, নামতে প্রায় সময় অযাচিত জায়গায় হাতের ছোঁয়া, ধাক্কা, ঝগড়া করা এগুলো নিত্যনৈমিত্তিক সহ্য করতে হয়। সম্প্রতি প্রতিদিনের মতো কর্মক্ষেত্র শেষে ফিরছিলাম। ক্লান্তির কারণে বাসে উঠেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
হঠাৎ শুনি একটি কন্ঠস্বর। বলছে – চিক্কো, ও চিক্কো ভাড়া দাও। বাংলা করলে দাঁড়ায় – প্রিয় ও প্রিয় ভাড়া দাও। চিক্ক শব্দটি সাধারণত চাকমা ভাষায় প্রেয়সী বা পরিচিত আপন কেউকে আদর অর্থে বুঝানো হয়। আধা ঘুম থেকে জেগে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম – কী বলছেন? বাসের স্টাফ আমাকে নিসংকোচে উত্তর দিয়েছিল – চিক্কো বলেছি। সবাই যা বলে আরকি!
উত্তর শোনার পর আমি আমার মতো করে প্রতিবাদ করে বুঝিয়েছিলাম, মেয়েদের সম্মান করে কথা বলতে শেখো। কিন্তু আফসোস! আমি আর আমার সহকর্মী ছাড়া কেউ প্রতিবাদ করার ছিল না। বাসভর্তি মানুষ কেউ প্রতিবাদ করেনি। বাসের অন্য স্টাফরা বড়জোর দোষ কাটানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে টিজকারী সেই বাস স্টাফ তার দোষ স্বীকার করেনি।
”সবাই যা বলে আরকি!”

মার্টিনা দেওয়ান

পাহাড়ে যাতায়াত ব্যবস্থা একটা বিরাট সমস্যা। বিশেষত যদি গন্তব্য হয় অর্ধেক পথ বা কিছুদূরের পথ। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে বাস স্টাফদের চেয়ে যাত্রীদের দায় থাকে বেশি। এ অসুবিধাটাতে সবচেয়ে বেশি পড়তে হয় স্কুলের শিক্ষার্থীদের। বিশেষত মেয়ে শিক্ষার্থীদের। তৃতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীর অনেক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন লোকাল বাসে স্কুলে আসা যাওয়া করতে হয়। এসব মেয়ে শিক্ষার্থীদের হাতের বাহু ধরে বাসে উঠানো হয়, পিঠ চাপড়ে ভাড়া খোঁজা হয়, নানা ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য কানে কানে বলা হয়। এবং এসব শিক্ষার্থীদেরকে ব্যাঙ্গাত্মকভাবেই বলা হয় – “চিক্কো ভাড়া দে। (ও প্রেয়সী ভাড়া দাও)”।
তাই সেই বাস স্টাফের এই ভঙ্গিতে আমার কাছে ভাড়া চাওয়াতে কোন অপরাধবোধ ছিল না, দোষ স্বীকার ছিল না। তারা এসব শিক্ষার্থীদের থেকে এভাবে টিজ করে ভাড়া খুঁজতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। আর ছোট ছোট মেয়েরা লজ্জা,ভয়, সংকোচের কারণে প্রতিদিন নিপীড়নের গ্লানি সহ্য করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব যাতায়াত ব্যবস্থার ফলাফল স্বরূপ অনেক মেয়েদের লেখাপড়া প্রাইমারি পর্যন্ত গড়ায় বা তারও আগে শেষ হয়ে যায়।

বাসে যৌন নির্যাতন, নিপীড়নের ঘটনা নতুন নয়। এমনকি বাসে রেপ, বাস থেকে ঠেলে দিয়ে মৃত্যু এসব খবর আমরা জানি। বাসে সচরাচর যাত্রীপূর্ণ থাকে। কিন্তু দু:খজনক যে এতোগুলো মানুষের ভিড়েও মেয়েদের নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হতে হয়। বাসের স্টাফের চেয়ে সাধারণত সাধারণ মানুষরা সংখ্যায় বেশি থাকি। কিন্তু কোনো মেয়ের সাথে অন্যায় হলে আমরা তা চোখ ব্ন্ধ করে থাকি। আমরা কেন ভাবি না যে, আমাদের মা,বোন, ভাবি, চাচি,মাসি,ফুফি, খালা তাদের সাথেও তো হতে পারে।

তবে কেন আমরা প্রতিবাদ করি না? তবে কেন মেয়েদের প্রতিবাদ করতে সাহায্য করি না?

সময় দ্রুত চলে যায়। ২০০০ সালের পর ২০১৮ সাল আসে, প্রেক্ষাপট বদলে যায়, পিসিমার পর মেয়ে আসে, হয়তো মেয়ের পর নাতনি আসবে। তবু কি এসব কীটদের আচরণ একই থেকে যাবে? তবুও কি পাহাড়ে মৌলিক অধিকার শিক্ষার জন্য মেয়েদের যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন সহ্য করে লেখাপড়া করে যেতে হবে? তবুও কি মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে যেতে এসব কীটদের উত্যক্তটা সহ্য করে যেতে হবে?

আপনার আমার একটি প্রতিবাদ হতে পারতো সময় বদলের নিরাপদ যাতায়াত পরিবেশ। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম, সময় চলে যায় তবু মেয়েদের যাতায়াত পরিবেশের এতটুকু পরিবর্তন হয় না, বাসে নিপীড়ন বন্ধ হয় না।
আসুন প্রতিবাদ করতে শিখি, প্রতিবাদ করতে না পারি মেয়েদের প্রতিবাদ করতে সাহায্য করি, মেয়েদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত পরিবেশ সৃষ্টি করি।

শিক্ষিকা,
খাগড়াছড়ি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 161
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    161
    Shares

লেখাটি ৩৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.