#MeToo আন্দোলনের অর্জন অনেক

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)
দুনিয়াটা ভর্তি হয়ে আছে শুকর ও গাধাতে। শুকর মানে? শুকর হচ্ছে ‘মেল শভিনিস্ট পিগ’ গুলি। এরা নারীকে মানুষ মনে করে না, মনে করে পুরুষের বিনোদনের জন্যে ঈশ্বরের উপহার হিসাবে নারীর সৃষ্টি। আর গাধা কারা? যারা সম্মতি বা কনসেন্ট ব্যাপারটা জানে না, যারা দুইজন মানুষের পরস্পরের সম্মতিতে সম্পন্ন ঘটনা বা সম্পর্ক আর একজনের সম্মতি ছাড়া তার শরীর স্পর্শ করা বা স্পর্শ না করে আভাসে ইঙ্গিতে আচরণে ঐসব করা এই দুইটার পার্থক্য জানে না। এইসব শুকর ও গাধা দুনিয়াটা ভরে রেখেছে, সেটা বাংলাদেশই হোক বা আয়ারল্যান্ডই হোক- বা রাশিয়া, পর্তুগাল বা ইরাক বা আফগানিস্তান।

আবার অন্যভাবে দেখলে এই শুকর এবং গাধাগুলিও আবার একই প্রকৃতির এবং তাদের শুকর স্বভাব ও গাধাসুলভ যুক্তিসমুহ একই উৎস থেকেই জন্ম নেয়। যেমন যেসকল গাধা আপনাকে বলে যে, নারী হয়রানীর শিকার হয় তার পোশাকের কারণে বা তার শারীরিক চালচলনের কারণে ওরা এটা কেন বলে? কারণ ওরাও ঐ শুকরের দর্শনটাই নেয়, যে নারী হচ্ছে জিনিস বা বস্তু বা রসগোল্লা, ওর আবার সম্মতি বা অসম্মতি কি?

এইগুলিকে যদি আপনি নিতান্ত একজন বা দুইজন মানুষের বা দুনিয়ার মানুষের একটি অংশের ব্যক্তিগত চারিত্র্যের বৈশিষ্ট্য মনে করেন তাইলে কিন্তু ভুল করবেন। এটা মানুষের নিজস্ব চরিত্রের ব্যাপার না। এইগুলি হচ্ছে যেসব সামাজিক বিধিবিধান বা নর্ম দুনিয়া জুড়ে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে সেইসব নর্মের যে দার্শনিক ভিত্তি সেই দার্শনিক ভিত্তিরই নানাপ্রকার বহিঃপ্রকাশ। আইন, ধর্ম বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বা অন্যভাবে বললে যেটাকে আমরা বলি সমাজের উপরি কাঠামো বা সংস্কৃতি- এর পুরোটাই হচ্ছে সেই শুকরের দর্শনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত।

(২)
একটা উদাহরণ দিই। দুনিয়া জুড়ে প্রতিষ্ঠিত একটি বড় ধর্ম যেটি নারীর শরীরের মোটামুটি পুরোটাই ঢেকে রাখাকে আবশ্যিক বিধান বানিয়েছে, সেই ধর্মের মুল যে গ্রন্থ সেই গ্রন্থে দেখবেন যে ধর্ষণের জন্যে কোন শাস্তির বিধান নাই। বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের জন্যে কড়া শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু নারীর সম্মতির বিপরীতে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে তার জন্যে পুরুষের কোন শাস্তির বিধান নাই। কেন? দুইজন নারী পুরুষ নিজেদের ইচ্ছার মিলিত হলো তার জন্যে দুইজনকেই মেরে ফেলতে হবে, আর একজন পুরুষ জোর করে একজন নারীকে ধর্ষণ করলো সেটার জন্যে শাস্তির বিধান নাই? এইটার কারণ কি? কারণ ঐটা- নারী তো মানুষ না, বস্তু, বস্তুর আবার সম্মতি কি?

এরাই তো সংখ্যায় বেশী। এরাই সমাজের মুল ধারা। এই কারণে দেখবেন আপনি যাদেরকে মনে করে সমাজের অপেক্ষাকৃত অগ্রসর অংশ, শিল্পীরা সাহিত্যিকরা সাংবাদিকরা শিক্ষকরা, এদের মধ্যেও নারীকে হয়রানী করা লোকের অভাব নাই। কেননা এরাও তো সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলেরই অংশ। এই যে এখন আমাদের মেয়েরা ওদের জীবনে ঘটে যাওয়া হয়রানীর কথা প্রকাশ করছে, এইখানে দেখবেন কতো ক্যারেক্টার আরও বের হয়ে আসবে, একটু অপেক্ষা করেন।

এই যাত্রায় আবার একদল গাধাকেও পাবেন, যারা পরকীয়া আর হয়রানীকে মিলিয়ে দেখবে। কারণ ওদের কাছে তো নারীর সম্মতির কোন গুরুত্ব নাই। একজন নারী যদি হয়রানীর শিকার হয় বা নিপীড়নের শিকার হয় তখন দেখবেন যে এরা এসে বলবে যে, আরে ওর তো আগে আরও তিনজনের সাথে সম্পর্ক ছিল বা আরে, ও তো এর আগে অমুকের সাথে শুয়েছে ইত্যাদি। এঈ গাধাগুলিকে বুঝাতে পারবেন না যে প্রশ্নটা হচ্ছে নারীর সম্মতি আছে কি নাই সেটা। একজন নারী তার নিজের ইচ্ছায় কি করলো না করলো সেটা ওর নিজের ব্যাপার। একজন নারী যদি পেশাগতভাবেও যৌনকর্মী হয় তাকেও আপনি স্পর্শ করতে পারেননা তার সম্মতি ছাড়া। সম্মতি বা কনসেন্ট।

(৩)
এই যে এখন মেয়েরা মুখ খুলছে, তাদের সাথে ঘটে যাওয়া নিপীড়নের বা হয়রানীর ঘটনা খুলে বলছে প্রকাশ্যে- me too আন্দোলন, এটার গুরুত্ব আছে। সকল নারীই খুলে বলুন তার সাথে ঘটে যাওয়া নিপীড়নের ঘটনা। সেটা গতকাল হোক বা গতবছর বা গত দশক বা গত শতাব্দীতে- খুলে বলুক সকলে। একদল নিপীড়কের নাম ধাম পরিচয় সহ বলুন সকলে।

কেন? একান্তে ঘরের কোনে বা নিভৃত কোন জায়গায় লোকচক্ষুর আড়ালে ঘটে যাওয়া এইসব ঘটনা প্রকাশ্যে খুলে বললে কি লাভ? যে ঘটনা বিশ বছর বা ত্রিশ বছর আগে ঘটে গেছে সেটা এখন বলে কি লাভ? এইসব ঘটনা হয়তো আদালতেও প্রমাণ কড়া যাবে না, কোন শাস্তিও হয়তো লোকটির হবে না। তাইলে এইসব ঘটনা এখন বলে কি লাভ?

শাস্তি যে একদম হবে না সেটা বলতে পারেন না। দুই একজনের শাস্তি হতেও পারে। আর সামাজিকভাবে যখন লোকে ঘটনাটা জানে, সেটাও তো একরকম শাস্তি। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে, কাজের ক্ষেত্রে সেইসব নিপীড়ক নিজেদের পজিশনের সুযোগ নিয়ে যা করেছে তার জন্যে শাস্তির বিধান করবে। ভবিষ্যতে এইরকম ঘটনা যাতে না হয় তার ব্যাবস্থা করবে। সাধারণভাবেও সকলে একটু সতর্ক হবে। এইগুলিও একটু প্রাপ্তি বটে। নিতান্ত কম প্রাপ্তি না। কিন্তু এইসব প্রাপ্তির চেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে অন্যত্র। একটা হচ্ছে আপনি যখন কথাটা প্রকাশ্যে সকলকে জানিয়ে দিচ্ছেন, তখন এতদিন আপনার চেপে রাখা যন্ত্রণাটা আর আপনার একার থাকলো না, আমরা সকলে সেই ভারটা নিয়ে নিচ্ছি।

আরেকটা প্রাপ্তি হবে এইসব ঘটনা প্রকাশ্যে নিয়ে আসাতে। ঐ যে শুরু থেকে যেসব কথা বলছি, নারীর সম্মতির কথাটা, এই কথাটা যদি এখন ঐসব শুকর আর গাধাদের মাথায় খানিকটা স্থান করে নেয়।

(৪)
শুধু পুরুষদের কথা বলছি না, পুরুষদের মাথায় সম্মতির ব্যাপারটা থাকা তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, এটা তো অবশ্যই। দেখবেন যে এই ধরনের নিপীড়করা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নারীটির উপর প্রভাব বিস্তার করার মতো অবস্থানে থাকে আর সেটারই সুযোগ নেয় এরা। যেমন পিতৃস্থানীয় আত্মীয়, শিক্ষক, অফিসের বস বা এইরকম লোকজন। এদের মাথায় এই সম্মতির ব্যাপারটা থাকে না, কচি মেয়ে দেখলেই ভাবে…। এদের এইসব কাজ তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ আরকি।

কিন্তু নারীদের মাথায়ও এই সম্মতির কথাটা থাকা জরুরী। কেননা প্রচলিত বিশ্বাস প্রথা আইন কানুনের প্রভাবে নিজেকে নিতান্ত পণ্য মনে করেন এরকম নারীর সংখ্যাও কম নয়। সেজন্যে নারীদের মাথায়ও এই চেতনাটার বিকাশ হওয়া জরুরী-, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরীদের মধ্যে- যে আমি কেবল রমণী নই, আমি একজন মানুষ, আমার শরীর আমার, আমার সম্মতি ছাড়া আমার শরীর কেউ স্পর্শ করবে কেন? নারীদের মাথায় এই বোধটা থাকা জরুরী সে কেবল নিজের ডিগনিটি রক্ষার জন্যেই নয়, অপরের ডিগনিটি রক্ষার জন্যেও।

আরেকটা প্রাপ্তি হবে এই আন্দোলন থেকে। নিপীড়নের স্টিগমাটা আর এখন নারীর উপরই কেবল লাগবে না। এমনিতে আমাদের এখানে এইসব নিপীড়নের ক্ষেত্রে সাধারণত নারীটিকেই দোষারোপ করা হয়। আর নারীটিকে দোষারোপ করা না হলেও ধরে নেওয়া হয় যে নারীটি নাকি নষ্ট হয়ে গেল। মানে ঐ যে ঐ ধারনা- যেন মেয়েটা একটা রসগোল্লা, কুকুরে চেটেছে বলে সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। এইটাও ভাঙা দরকার।

আমি জানি যে আধুনিক তরুণদের মধ্যে এইটা অনেকটা কমেছে, নারীকেই সকলে এখন আর দোষ দেয় না। কিন্তু সমাজের বড় অংশে এখনো এই ইয়েটা রয়ে গেছে। এইটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে না? এই যে মেয়েরা মুখ খুলছে, এইটা সেখানে সাহায্য করবে- যে নিপীড়নের দোষ মেয়েটার না বা নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলেই নারীটি মন্দ হয়ে গেল না। মন্দ হয়ে যায় নিপীড়ক, নিপীড়িত নয়।

(৫)
সবার উপরে একটা কথা মনে রাখবেন, এই যে এখন আন্দোলনটা হচ্ছে, সকলে বলছেন তাদের সাথে ঘটে যাওয়া নিপীড়নের কথা, এটা একটা বৃহৎ সংগ্রামের অংশ মাত্র। নারীর সংগ্রাম আরও অনেক বড়, অনেক কঠিন- যেতে হবে আরও অনেক দূর। সেই সংগ্রামটা হচ্ছে মানুষের চূড়ান্ত মুক্তির সংগ্রামের সাথে একসাথে সম্পৃক্ত। সেটার জন্যে প্রস্তুতি শুরু করেন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 432
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    432
    Shares

লেখাটি ১,৫৭৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.