বাংলাদেশে মিটু: অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ

0

সাদিয়া রহমান:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ বুলাতে বুলাতে হঠাত চোখে পড়লো একটা প্রবন্ধ, যার বিষয়বস্তু হচ্ছে এই মিটু আন্দোলনের মাঝে কীভাবে নিজের খেয়াল রাখতে হবে। একটা ভারতীয় প্রতিবেদন। যার কারণে ভারতীয় কিছু পরিসংখ্যান আছে। এই মিটু কোন ধাপের, কীভাবে শুরু হলো ইত্যাদি। সেখান থেকে আরও একবার জানা গেলো এই আন্দোলন নতুনভাবে কতটা সাড়া জাগিয়েছে ভারত জুড়ে। সবকিছু দেখে বুকের মাঝে চিনচিনে ব্যথা হয়। অদ্ভুত এক কষ্ট হয়।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যের কথা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলো যখন উঠে আসছে, তখন অনেকেরই পুরোনো ক্ষত আবার নতুন করে কষ্ট দিচ্ছে। এই অবস্থায় নিজের মানসিক খেয়াল কতটা জরুরি এবং কীভাবে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে হবে তা নিয়ে এই প্রতিবেদন।

প্রবাসী ফেরত তনুশ্রী দত্ত দীর্ঘ দশ বছর পর আবার মুখ খুলেছিলেন নানা পাটেকারের যৌন হয়রানি নিয়ে। তনুশ্রীর পুনরায় নীরবতা ভঙ্গের (দশ বছর আগে ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই তনুশ্রী আইনী আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি) মধ্য দিয়ে ভারতে মিটু মুভমেন্ট নতুন বেগ পায়। এমন না যে তনুশ্রীর বিরুদ্ধে কেউ ছিলো না বা তাকে মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা কেউ করেনি। কিন্তু তার পাশে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়েছিলো বলেই একে একে বের হয়ে আসতে থাকে বড় বড় নামধারী সব সেক্সুয়াল প্রিডেটরদের নাম। আলোক নাথ, সাজিদ খান, অনু মালিক কেউই পার পাননি আর। ভাইয়ের বিরুদ্ধে বলতে হয়েছে স্বয়ং ফারাহ খানকে। অনেকে মনে করছেন ভারতীয় নারীবাদী আন্দোলনে এক মাইলফলক হয়ে দাঁড়ালো এই মিটু মুভমেন্ট।

এবার ফেরত আশা যাক স্বদেশে। গেল বছর এক অভিনেত্রী যখন বললেন প্রযোজকদের অসংলগ্ন প্রস্তাবের কথা, তখন ঠিক এই মহল থেকেই নারী পুরুষ নির্বিশেষে খাবো খাবো করে  উঠেছিলো সেই মেয়েটিকে। অন্য অভিনেত্রীরা লাইভে এসে, পেপারে লিখে, তাকে টেলিভিশন টক শোতে ডেকে এমন কোনো ভাবে নাই যেভাবে তাকে হেনস্থা করেনি।

বিখ্যাত দুটি মন্তব্য ছিলো যার একটার সারমর্ম করলে দাঁড়ায় অভিযোগকারী অভিনেত্রী আসলে ব্যক্তিগত জীবনে প্রচলিত অর্থের সতী সাধ্বী মানুষ নন, তাই হ্যারাজমেন্টের কথা বলা তার সাজে না।

আর দ্বিতীয়টি ছিলো, অভিযোগকারী অভিনেত্রীর অভিযোগ ভুল না হলেও তার এইভাবে বলাটা এই প্রফেশনের দুর্নাম করছে। “ঊনি এমনভাবে বললেন শুনে মনে হলো এই প্রফেশন ছাড়া আর কোথাও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে না”- কমবেশি বাক্যটা এরকম ছিলো। কেউ চাইলে মিলিয়ে দেখতে পারেন। দুইটা মন্তব্যের মধ্য দিয়েই কুৎসিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং “ভিক্টিম ব্লেমিং” এর চূড়ান্ত নোংরা রূপ ফুটে ওঠে।

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম সেই অভিনেত্রী ব্যক্তিগত জীবনে বেপরোয়া। তাতে কি তার অসম্মতিতে তাকে স্পর্শ করা বা প্রস্তাব দেয়াটা জায়েজ? যারা মনে করেন যে খারাপ মেয়ে হলে তার সাথে জবরদস্তি জায়েজ বা অন্যায় হলে সে কিছু বলতে পারবে না তাদের সাথে আসলে আলোচনায় যাবার কোন সুযোগ নেই। তাদেরকে অনেক বড় লাল সালাম।

দ্বিতীয়ত, একটা মেয়ে অভিনেত্রী সে হয়রানির কথা বললো, সে সেই প্রফেশনকে দুর্নাম করলো। মাঠে, ঘাটে, বন্দরে, নিজ ঘরে কোথায় মেয়েরা যৌন হয়রানির শিকার হয় না? দুর্নামের ভয়েই তো এতকালের চুপ থাকা ছিলো। আর কতদিন এই ভয় দেখিয়ে চলবে? অথচ শিক্ষিত ব্যক্তির থেকে ভিন্ন রকম একটা প্রতিক্রিয়া আমরা পেতেই পারতাম। “কে তোমার সাথে এরকম করেছে চলো আগে তাকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেই ,সে সবাইকে দুর্নাম করেছে”- প্রতিক্রিয়াটা এমন হতেই পারতো। এমন কিছু হয়েছে কি না কারো জানা থাকলে জানাবেন অবশ্যই তাতে মানবতায় আস্থা ফিরবে সকলের।
তারপর ধামাচাপা হয়ে গেলো সব।

এরপর দীর্ঘদিন পর মুখ খুললেন মাকসুদা আক্তার প্রিয়তী। অভিযুক্ত ব্যক্তি আরেক গণ্যমান্য ব্যক্তি। লাইভে প্রিয়তী কথা বললেন। একজন পাইলট, এবং প্রাক্তন মিস আয়ারল্যান্ড। উনার কথাগুলো ছিলো- “আমাকে তৈরি হয়ে আসতে হলো নাহলে আবার সবাই বলবেন এইটা মিস আয়ারল্যান্ড?” কী ভীষণ কষ্টের কথা, ক্ষোভের কথা। কী অদ্ভুত অদৃশ্য এক চাপ। সবসময় সুন্দর দেখানোর চাপ। সুন্দর দেখালে বা তথাকথিত অসুন্দর হলেও কি হয়রানি থেকে মুক্তি মিলবে? মিলবে না। প্রিয়তীর শক্তি, প্রিয়তীর লড়াই, প্রিয়তীর সাহস সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়। সেটা সহ্য হয় না যৌনাঙ্গ সর্বস্ব জাতির। বসে আছে সবাই এখনো, দিন রাত্রি চরিত্র সার্টিফিকেট তৈরি হচ্ছে প্রিয়তীর। তাতে অবশ্য তার কিছু এসে যায় না। একজন প্রিয়তী নিজের খেয়াল রাখতে ঠিকই জানে।

মুখ খুললেন শুচিস্মিতা সীমন্তি। গণ্যমান্য সাংবাদিক “সাহেবকে” নিয়ে। এবারে সবাই শুধু সীমন্তি না, তার মায়েরও চরিত্রের সার্টিফিকেট বানাতে বসে গেলেন। তাদের উদ্দেশ্য, যোগ্যতা সব নিয়েই খেলা শুরু হলো। কিন্তু এভাবে কতদিন? তাই এবারে আশার বিষয় হলো অনেকে ভয়ে ভয়ে একটু একটু করে মুখ খুলছেন। আসমাউল হুসনা, তাসনুভারা মুখ খুললেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি বরাবরের মতই জ্ঞানীমানি মানুষ। নাহ, তাদের নাম নিবো না। যোদধাদের মাঝে কাপুরুষদের নাম নিয়ে পরিবেশ কলুষিত করা যাবে না।

বাংলার একটা আঞ্চলিক প্রবাদ আছে। “বেহায়ার পশ্চাতে গাছ উঠলে বেহায়া বলে আমি ছায়াতেই আছি”। যারা এখনো চুপ আছেন তারা হলেন এই প্রজাতি। চুপ আছেন বলতে যারা এখনো নানা ভাবে প্রফেশনের দুর্নাম, ভাইয়ের দুর্নাম, বাবার দুর্নাম বাঁচাতে উদ্যত তাদের কথা বলছি। চুপ আছেন বলতে যারা এখনো “আমার কিছু হয়নি আমার কী?” অবস্থানে আছেন তাদের কথা বলা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, এখনও কারা চুপ করে আছেন?

আপনারা চুপ থাকবেন, শান্তিতে থাকবেন। কয়েক বছর পর মঞ্চে মিটু নিয়ে গালভরা ভাষণ দিবেন। আমাদের মেয়েরা আপনাদের দৌরাত্ম্যে দীর্ঘ লড়াই চালাতে থাকবে। আপনাদের কপটতায় আমরা বিপন্নবোধ করবো। আপনাদের অসাধুতা দেখে আমরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাবো। কিন্তু আমাদের অসুস্থ্ হলে তো চলবে না। কারণ আপনারাও নির্যাতক। একদিন আপনাদের মুখোশও উন্মোচন করতে হবে। তাই আমাদের মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে। সেই ভারতীয় প্রতিবেদন ভারতের জন্য কতটা ফলপ্রসূ তা জানা নাই, কিন্তু আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সেখান থেকে ধার করা কিছু টিপস ভাগাভাগি করে নিই। এ যে আমাদের বড় প্রয়োজন।

মেয়ে তুমি যদি মনে করো তুমি তোমার অভিজ্ঞতা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছো না, তবে নিজেকে কষ্ট দিয়ে তা বলো না। তোমার পদক্ষেপ আর তোমার চাহনি তোমার হয়ে কথা বলবে।
চারিদিকের এই হট্টগোল যদি বার বার তোমাকে সেই বীভৎস স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, তবে কদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থেকে বিরতি নাও, কেননা মানসিক সুস্থতা এখন মুখ্য।

এমন কিছু করো যা করতে তোমার ভালো লাগে। ইতিবাচক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে নিজের জন্যই।
সবচেয়ে বড় কথা মুখ খুলতে হবে। নিজের কথা নিজেকে বলতে হবে। কারো কাছে নিজেকে অনিরাপদ মনে হলে সেটা বলতে হবে সে সমাজ যাই বলুক। পরিবার, বন্ধু বান্ধব এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের সাহায্য নিতে হবে। নিজেকে ভালো থাকতে হবে।

সবসময় নিজের গা বাঁচানো দেশে কোনো আন্দোলন সহজ না। তবু একদিন হবে। ততদিন পর্যন্ত এই লড়াই আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। প্রস্তুতিটা তাই সেভাবেই নিতে হবে।

মূল লিংকটা পড়ে দেখতে পারেন। নিচে দেয়া হলো:

https://feminisminindia.com/2018/10/10/self-care-me-too/?fbclid=IwAR2wD52thi5cPPFxsUADMSWOyym_91TzIyp3EPD2_xTsIdtytPX3Xo7Lkrg

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 253
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    253
    Shares

লেখাটি ২,৯০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.