নিজদেশে মিটু এর বাস্তবতা

0

ইসাবেল রোজ:

বহুদিন পর আমার এক জুনিয়র বন্ধুর সাথে কথা হয়েছে। বন্ধুটি একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তার হাজবেন্ড থাকেন লন্ডনে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েটির হাজবেন্ডের মত চমৎকার মানষিকতার মানুষ আমার চোখে খুব কমই পরেছে। যাই হোক মেয়েটির নাম ধরে নেই এশা। তিনি একজন এডিশনাল এস.পি হিসেবে বাংলাদেশের একটি জেলায় কর্মরত আছেন।

মেয়েটি যদিও আমার জুনিয়র কিন্তু আমার সাথে তার বন্ধুত্বটি একটু ভিন্ন রকম। যাক সেসব কথা। বিভিন্ন কথা প্রসংগে আমরা আলোচনা করছিলাম সাবেক মিস আয়ারল্যান্ড প্রিয়তি মেয়েটির সাথে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে। আমি আসলে ওর কাছে জানতে চাইছিলাম আইনের আশ্রয় কোনভাবে নেয়া যায় কিনা!

এশা আমাকে তখন একটা গল্প শোনালো, যেটা এই মুহূর্তে শেয়ার না করে পারছি না। ঘটনাটি বাংলাদেশের একটি জেলার গ্রামের ঘটনা। যেখানে ভিক্টিম নিনজা বোরখা পরে ছোটবেলা থেকেই। (নিনজা বোরখা মানে শুধু চোখ দেখা যায় যে বোরখায়)।
আমার আগ্রহ একটু বেড়ে গেলো যে নারী নিনজা বোরখা পরে ছোটবেলা থেকে, সে যৌন হয়রানির মতো ‘লজ্জাজনক’ ব্যাপার নিয়ে পুলিশের সম্মুখীন কী করে হয়?

ঘটনাটি এরকম: মেয়েটির নিজের বাবা দ্বারা ছোটকাল থেকে ধর্ষণের শিকার হয়। একবার মেয়েটিকে এবরশনও করতে হয়। নিজ বাবা দ্বারা মেয়েটি প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ে। এর কিছুদিন পরেই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর মেয়েটি বাপের বাড়ি আসা বন্ধ করে দেয়। আর যদি কখনও আসেও, তাহলে হাজবেন্ড সাথে থাকে এবং হাজবেন্ডের সাথে সে ফেরত চলে যায়। এভাবে দিন কাটতে থাকে।

একদিন মেয়েটি বাবার বাড়িতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসে। সেখানে হঠাৎ চিৎকার শুনে কিছু লোক জড়ো হয়। কিছু মানুষ ঘটনা জানতে চাইলে মেয়েটি চিৎকার করে বলতে শুরু করে, ছোটবেলা থেকে তার বাবা নামক প্রাণীটি তার উপর যৌন অত্যাচার করে আসছে। সে এতোদিন মুখ বুঁজে সহ্য করেছে। কিন্তু এখন তার স্বামী সংসার হয়েছে, এখনও কেন তার বাবা তাকে হেনস্থা করবে? এর বিচার সে চায়। তার বাবাকে পুলিশ গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। ভিকটিম মেয়েটি সবকিছু খুলে বলে নারী পুলিশ (আমার বন্ধু) এর কাছে। কবে কোন হাসপাতালে এবরশন হয়েছে সবকিছু মিলিয়ে নেয়ার জন্য স্টেটমেন্ট দেয়। মেয়েটি যে মিথ্যা বলছে না, তা পুলিশ তদন্ত করে রিপোর্ট দেয়।
মেয়েটির স্বামী মামলা করে।

এখানে কিছু বিষয় লক্ষণীয় যে, নিনজা বোরখা পড়তে অভ্যাস করানো হয়েছে মেয়েটিকে বাইরের পুরুষের কুনজর থেকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু মেয়েটি নিজের বাবার নোংরা থাবা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলো না। মেয়েটির সহ্যের সীমার মাত্রা কল্পনাতীত।

এখন একটু ভিন্ন চোখে ঘটনাটি দেখা যাক। এই মেয়েটি যদি শহরে বাস করতো এবং তার মা একজন প্রতিষ্ঠিত কর্মজীবী নারী হতো, তাহলে ব্যাপারটা কীরকম দাঁড়াতো?

১) মুখরোচক গল্প দিয়ে সামাজিক এবং গণমাধ্যম গরম হয়ে উঠতো।
২) ভিক্টিমের মা এতোদিন কী করেছে? জনগণ তা বিচার করে রায় সাথে সাথেই দিয়ে দিত।
৩) ভিক্টিমের প্রতি কোনরকম দায়সারা একটি সহানুভূতির লাইন লিখেই মানুষ শুরু করে দিত ভিক্টিমের মায়ের চরিত্র নিয়ে পোস্টমর্টেম।
৪) কেউ আবার ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করে সম্পূর্ণ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে ছাড়তো না।
আর অভিযুক্ত পুরুষটি যদি কোন প্রভাবশালী কেউ হতো, তাহলে তো কথাই নেই। থানা পুলিশ পর্যন্ত ব্যপারটি গড়ানো দূরে থাক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ভিক্টিমের মাকে নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়তো যে অভিযুক্ত পুরুষের নিজেকে আর নির্দোষ প্রমাণ করতে হতো না। জনতার আদালতে ভিক্টিমের মা এর ফাঁসির আদেশ হয়ে দাফনও সম্পন্ন হয়ে যেত। যেখানে জানাজার নামাযে হয়তো অভিযুক্ত হেনস্থাকারীকে দু ফোঁটা চোখের জল ফেলতে দেখা যেত। নাহ আমি বেশি বাড়িয়ে বলছি না। আমি মোটেই বাড়িয়ে বলছি না। মি টু এর ইফেক্ট আমরা দেখছি তো এই মুহূর্তে।

একটি মেয়ে শুচিস্মিতা সীমন্তি, যার নিজের পরিচয় আছে। অন্য কাউকে দিয়ে তার পরিচয়ের প্রয়োজন নেই। তার সাথে ঘটে যাওয়া কষ্টের অভিজ্ঞতা মেয়েটি প্রকাশ করেছে। কোনভাবে দায়সারা সহানুভূতির এক লাইন লিখে এবং তার মা সম্পর্কে ১০ লাইনের নিন্দা জ্ঞাপনের চর্চা হতে দেখেছি।

এই হলাম আমরা। প্রয়োজনে আমাদের মেয়েদের বেচতেও ছাড়ি না। আমাদের মানসিকতা এতোই নিচে যে একটি মেয়ের জীবনের ঘটে যাওয়া সবচেয়ে নোংরা অধ্যায় আমাদের কাছে কিছুই মনে হয় না। প্রিয়তি অথবা সীমন্তি যারা মিটু এর মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখোশ উন্মোচন করছেন, তাদের প্রতি সহানুভূতি চাই না। আমার মনে হয় না তারা আপনার সহানুভূতির জন্য অপেক্ষা করছেন। বরং তারা উল্টো আপনাকে, আমাকেই সহানুভূতি জানিয়ে চলেছেন।

আপনি আমি কিন্তু এখনও মুখ ফুটে না বলা কথাগুলো উচ্চারণ করতে পারছি না। কিন্তু তারা পেরেছে। তাদের ভালবাসুন। তারা অন্য কেউ না। তারাই আমরা। আমরাই তারা। হয়তো একদিন আপনিও ঘুরে দাঁড়িয়ে বলবেন আর একাকি অপমানিত স্মৃতি বয়ে বেড়ানো সম্ভব নয়। #মিটুবাংলাদেশ

#MeTooBangladesh

#SolidarityShucheesmitaSimonti

#SolidarityMaksudaAkhterPriyoti

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 131
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    131
    Shares

লেখাটি ১,৬৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.