কেন মেয়েগুলোর পাশে থাকতে হবে!

0

শেখ তাসলিমা মুন:

#MeTooBangladesh
কাল এক মেয়ের বা ভদ্রমহিলার পোস্ট চোখে পড়লো। তিনি মি. প্রণব সাহার পক্ষ নিতে সীমন্তি এবং সীমন্তির মায়ের চরিত্র নিয়ে বেশ পাঁক ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন। দেখে বিবমিষা লেগেছে।

পুরুষতন্ত্র এভাবে আমাদের মাথায় ডিম পেড়ে শেকড় বাকড় ছড়িয়ে রেখেছে। একটি মেয়ে যখন যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলে, তখন বিষয়টি নিয়ে এক্সট্রা ভাবতে হবে এ কারনে যে সমাজে ৯৯% নারী তাদের অতীত এবং বর্তমান নিয়ে সাইক্লজিক্যালি এক ভয়ানক জীবন যাপন করছেন। মুখ খুলতে না পারার অনেক কারন তাদের রয়েছে যা কিনা এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই সৃষ্ট।

তাদের ভাবতে হয় এবং সে বেরিয়ার তারা ভাঙতে পারেনা জীবন ব্যাপী এবং এভাবে অপরাধ বাড়ে। অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। আমাদের উচিৎ মেয়েরা যাতে তাদের না বলা দুঃসহ কথাগুলো প্রকাশ করতে পারে সে পরিবেশ তৈরি করা।
যে ভদ্রমহিলা মিঃ সাহার পক্ষে নেমেছেন, সীমন্তিদের চরিত্র হনন করে চলেছেন তিনিও একবার সমাজ ও পরিবারে দিকে চোখ মেলে তাকাতে পারেন। এমন কি তার জীবনেও এমন ঘটনা ঘটেনি সেটি বিশ্বাস করতে অন্তত আমার কষ্ট হয়। তিনি আমি সবাই কোন না কোনভাবে এ অপরাধের শিকার। কেউ গুরুতরভাবে কেউ কম গুরুতরভাবে কিন্তু আমরা সকলে কোন না কোনভাবে এ অরাজকতার শিকার।

সীমন্তি মুখ খুলেছে জন্য মিঃ সাহার নানান ঝামেলা ফেইস করতে হচ্ছে বলে তিনি চিন্তিত। সেটাতো হতেই হবে কিছুটা তাইনা? বরং একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে তিনি যে মানসিক ট্রমার ভেতর ফেলেছেন যা সে এক যুগ একা বহন করে গেছে কিন্তু এ ভদ্রলোককে কোন মূল্য দিতে হয়নি সেটাই কি একটি বড় অন্যায় নয়?
তরতর করে এভাবে পুরুষেরা তাদের ব্যক্তি জীবন ও পেশাগত সিঁড়ি টপকে যান কোন মূল্য না দিয়ে কিন্তু সীমন্তিরা পদে পদে মুল্য দিয়ে যায় যুদ্ধ করে যায় বহির্জগত এবং অন্তর্জগতের সাথে। জীবনব্যাপী।

মিঃ সাহার সাজানো সেটআপে কিছুটা বাতাস লেগেছে বলে তার পক্ষে সহানুভুতি দেখানোর মানুষের অভাব হচ্ছে না। একবারও চিন্তা করেছেন, তার সেই আচরণের বিভীষিকা নিয়ে মেয়েটির একটি যুগ কীভাবে কেটেছে?
যদি ভদ্রলোকের সাথে সীমন্তির মায়ের ব্রেক আপ না হয়ে যেতো এবং মেয়েটি ১২ বছর পর সাহস অর্জন করে বলতো? তখন কী বলতেন আপনি? সীমন্তি তার মায়ের প্রেম সম্পর্ক সংসার ধ্বংস করার জন্য এ গল্প ফেঁদেছে? মেয়েটি এতো খারাপ!
আমার জীবনের ঘটনাতো আমি ৪০ বছরেও প্রকাশ করতে পারিনি। সীমন্তির লেগেছে ১১ বছর মাত্র।

এ ভদ্রমহিলা কি জানেন, একটি শিশুর জন্য এডাল্টদের জগত বিষয়ে জানা কতো কঠিন? কতটা তারা ডিপেন্ডেন্ট থাকে এডাল্টদের প্রতি? প্রতিটি পদে পদে তারা এ বয়সে থাকে আনশিওর। তাদের কনফিডেন্স বিল্ড আপ করতে আমাদের বড়দেরই ভূমিকা রাখতে হয়? সেই এডাল্টদের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করা কতটা কঠিন একজন কিশোরী মেয়ের জন্য, সেটি বোঝার ক্ষমতা একজন প্রাপ্তবয়স্ক ‘নারী’ হয়েও বুঝতে এতো কঠিন?

বিশেষ করে সীমন্তির মতো মেয়েদের কথা, যারা বাবা হারিয়েছে। বাবা আইডল হিসেবে যদি ফ্যামিলিতে কোন পুরুষ আগমন করে, তার থেকে এ আচরণ পেলে সে কতটা হতভম্ব হয়ে যেতে পারে? কতটা ট্রমার ভেতর সে নিক্ষিপ্ত হতে পারে?

একটি কিশোরী মেয়ের ঘাড়ে কতোটা দায় এবং দায়িত্ব এসে পড়ে? সে কি সে দায় বহন করতে সক্ষম? একদিকে তার মা, মায়ের সম্পর্ক, মায়ের প্রতি তার লয়ালিটি, মায়ের সম্পর্ক তার কারণে ভেঙে যাওয়ার দায় ঘাড়ে এসে যাওয়া, অন্যদিকে বাবার বয়সী একজন পুরুষের কাছ থেকে এ কুৎসিত আচরণ! যার সাথে কোপ করা এ বয়সে কতটা কঠিন থাকে? সে কি এডাল্ট এ জগতের সাথে পরিচিত থাকে? তাকে ফেইস করা কতটা কঠিন?

সীমন্তির ভাই কেন ড্রাগ এডিক্টেড, সেটিও তিনি উল্লেখ করে সীমন্তির চরিত্র ব্যবচ্ছেদ করেছেন। আমি যদি বলি, সীমন্তির ভাই তার বোনের বেদনার ভার নিতে পারেনি, কিন্তু জেনেছে সেই ছোট বয়সে। সে দেখেছে বিষয়টি। সেও কাউকে বলতে পারেনি। সে সেলফ ডেস্ট্রাক্টিভ হয়ে গেছে। একটি ছোট্ট ছেলে যখন অসহায়ভাবে বোনের এ ভয়াবহ বেদনার কথা জেনেছে, দেখেছে, কিন্তু বড়দের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কিছু করতে পারেনি এবং সে জন্যই সে অসহায়ত্ব ও হতাশায় ডুবে নিজের ক্ষতি করেছে? আমি যদি বলি, এইসব বড়রা এই ছেলে এবং মেয়েটির সুরক্ষা দিতে না পারার কারণেই তারা দুজনই ভিন্ন ভিন্নভাবে সাফার করছে? মেয়েটি একভাবে, ছেলেটি অন্যভাবে? এবং এর দায় এই মিঃ এরই। সেই এই পরিবারের মেয়েটি ও ছেলেটিকে হতাশা এবং ট্রমার ভেতর ঠেলে দিয়েছে!

আর মা হিসেবে প্যারেন্ট হিসেবে তার মায়ের দৃষ্টিগোচর কেন হয়নি সে প্রশ্ন যেমন করা যায়, আবার তার উত্তরও কিন্তু পাওয়া যায়। মানুষ যাকে ভালবাসে, ঘরে নিয়ে আসে, সন্তানদের সান্নিধ্যে নিয়ে আসে তাকে সন্দেহ করলে বুঝতে হবে সম্পর্কটা বা ভালবাসাটা মিথ্যে। তার মা হয়তো সেই পুরুষটিকে কেবল প্রেমিক ভাবেনি, ভেবেছে সন্তানদের বাবার প্রতিরূপ হিসেবেও। বাবা-আইডল হিসেবেও!

আমার কষ্ট হয় মানুষ কোনদিন এমপ্যাথি চর্চা কী জানেনি। পুরুষতন্ত্রের তোতাপাখি হয়ে তাদের বুলি আওড়ে যাচ্ছে। পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করে যাচ্ছে ডামাডোলে।
বরং এ জেনারেশনের অনেক ছেলেকে আমি দেখেছি সীমন্তি-প্রিয়তির পাশে দাঁড়িয়েছে।

আমার আশা, আমার জেনারেশনের ভন্ডদের মুখ খুলে যাক, যাবে এবং এক নতুন জেনারেশন দায়িত্ব নেবে সেইসব কাজের যেগুলো আমরা কেবল সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছি তাই নয়, চরমভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। তারা এ আবর্জনা জঞ্জালগুলো ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলবে।

পাশে আছি সীমন্তি-প্রিয়তি এবং লক্ষ মেয়ে, লক্ষ নারীর না বলা বেদনার সাথে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 76
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    76
    Shares

লেখাটি ৫০০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.