গণমাধ্যমে তেঁতুল সূত্র

tetulতুষার আবদুল্লাহ: ছয়জন সহকর্মীকে বিদায় জানাতে হলো। বার্তাকক্ষে ছয়জনই ছোট বোন তুল্য। এক-দুই জনের শিক্ষাজীবন শেষ হয়েছে, বাকিদের বিশ্ববিদ্যালয় পেরোতে আরো বছর দু’য়েক বাকি। এদের সবার আমাদের সঙ্গে, অর্থাৎ সময়ের বার্তাকক্ষে কাজ করার বয়সটাও দুই বছরের কোঠা ছুঁয়েছে।

সময় টেলিভিশনে কাজ করতে যারা আসেন তাদের কয়েকধাপ পরীক্ষা’র গণ্ডি পেরোতে হয়। শেষধাপে মেয়েদের সঙ্গে মৌখিক আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য হলো- রাতে কাজ করতে হবে। রাতে কাজ করা মানে রাত ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত এটাও ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেয়া হয়। ঐ সময়টায় সবাই একবাক্যে বলে যায়- কোন সমস্যা হবে না রাতে কাজ করতে। পরিবারের দিক থেকেও সমস্যা নেই। ব্যস বার্তাকক্ষে বরণ করে নেয়া হয়।

বরণ পর্বের পর মধুচন্দ্রিমাকাল না পেরোতেই কারো কারো মুখ শুকনো। কেউ কেউ কাজের বেলাতেও উদাসীন। সমস্যার কথা জানতে চাইতেই জানা যায়- পরিবার থেকে রাতে কাজ করতে দিতে চাচ্ছে না।

দুই একজন আরো দুই একটি উপসর্গ যোগ করে। তারমধ্যে রয়েছে- অফিসের বাইরে কাজ করতেও আপত্তি কোন কোন পরিবারের। এরমধ্যে যারা বিবাহিত তাদের স্বামী, শ্বশুরবাড়ির লোকজন চাকরি ছেড়ে দেয়ারও রায় দিয়ে ফেলেছে। আবার যাদের বিয়ে হয়নি। আছে ছেলে বন্ধু বা এমন একজন যাকে জীবনের সহচর করার কথা ভাবছে মেয়েটি। সেই ছেলেটিও ফতোয়া দিচ্ছে টেলিভিশনে কাজ করা যাবে না। রাতে কাজের কথাতো আরো অনেক দূরের বিষয়। আঁতকে উঠি তখন, যখন জানি মেয়েটির স্বামী, ছেলে বন্ধুটিও গণমাধ্যমের শিক্ষার্থী, কর্মী। মৌখিক সাক্ষাৎকারে মেয়েরা কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই কথাটি ভুলে যাই। চেষ্টা করি মেয়েদেরকে কাজের মধ্যে রাখতে।

সময় টেলিভিশনের কাজের পরিবেশ তৈরিতে প্রথম লক্ষ্যই ছিল পুরো প্রতিষ্ঠানকে মেয়েবান্ধব রাখা। ছেলে মেয়ের আনুপাতিক হিসেবেও দূরত্ব নেই খুব একটা। এই বাস্তবতায় যাদের পরিবার থেকে আপত্তি উঠেছিল গণমাধ্যমে কাজ করার বিষয়ে, তাদের বলি বাবা-মা’কে নিয়ে এসে অফিস দেখাতে। দিনে-রাতে অনেক মেয়েই তাদের বাবা-মা’কে নিয়ে এসেছিলেন। কাজের পরিবেশ দেখে কোন কোন অভিভাবকের ভুল ভেঙেছে। তারা মেয়েকে ২৪ ঘণ্টার কাজের ছাড়পত্র দিয়ে গেছেন। আবার কেউ কেউ তাৎক্ষনিক সম্মতি দিলেও, পরে বাড়ি গিয়ে মেয়েকে না বলে দিয়েছেন। এভাবে গোড়াতেই দুই-একজনকে হারিয়েছি। বাকিরা পালাক্রমে দিন-রাত করে যাচ্ছিল। এরমধ্যে রাতের পালায় লোকবল কম দরকার পড়াতে রাতে রানডাউন প্রডিসার ছাড়া অন্য মেয়েদের আর রাত ১২টার পর কাজে রাখা হয়নি। বেশকিছু দিন পর আবার বার্তাকক্ষে রাতে কাজের চাপ বাড়লো। তখন সবাইকে বলা হলো আবার রাতের পালায় কাজ করতে। রাতের পালায় কাজ না করলে আমাদের সঙ্গে থাকা হবে না সেটাও সোজাসাপ্টা জানিয়ে দেয়া হলো। ছয়জন মেয়ে সহকর্মী ছাড়া বাকি সবাই রাতের পালায় এক বাক্যেই কাজ করতে রাজি হয়ে গেলো। ছয়জনের মধ্যে একজন দীর্ঘ সময় আমাদের সহকর্মী। অন্যদের চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। ভেবেছিলাম পরিবারকে সে অনুকূলে আনতে পারবে। কিন্তু সবার চেয়ে সেই আগে অপরাগতা জানাল। বাকিরা বার্তাকক্ষ থেকে বিদায় নিলেও লড়াই করে যাচ্ছে ফিরে আসার।

এই ফিরে আসার লড়াইটা কেনো? আমাদের পরিবার, সমাজে গণমাধ্যমে মেয়েদের কাজ করতে দেয়ার বিষয়ে এলার্জি তৈরি হলো কেনো? আবার গণমাধ্যমের পুরুষ কর্মীরা বা কেনো তার বোন বা স্ত্রীকে কাজ করতে দিতে নারাজি। গণমাধ্যমে পত্রিকা টেলিভিশন মিলিয়ে প্রায় দুই যুগের কোঠায় আছি। শুরুতে যেমন শুনেছি মিডিয়া ভালো জায়গা নয়, তেমনি এখনো শুনছি। শোনা কথা নিয়ে- পত্রিকায় কাজ করা শুরু করি। নানা পত্রিকা ঘুরি। বিশেষ করে যখন প্রদায়ক হিসেবে কাজ করেছি তখন অনেক পত্রিকা অফিসের অন্দর মহল দেখার সুযোগ পেয়েছি। কাজ করেছি অগ্রসর এবং সংরক্ষণ উভয় ঘরানার পত্রিকাতেই। প্রথম ধাক্বা খেতাম যখন দেখেছি, কোন কোন ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি ও ভালো কাজটার সুযোগ পাচ্ছে। মনকে সান্ত্বনা দিতাম- মেয়েদের সাংবাদিকতায় উৎসাহিত করতেই হয়তো এই বণ্টন নীতি। কিন্তু যখন দেখলাম যে এই সুবিধাটি কোন কোন মেয়ে পাচ্ছে আর বাকিরা পাচ্ছে না, তখন রহস্য খোঁজার চেষ্টায় নামি। দেখি বার্তাকক্ষ বা ফিচার বিভাগের পুরুষ আধিকারিকের দ্বারাই কাজটি হচ্ছে। তার বা তাদের সঙ্গে যারা অহেতুক অনন্ত সময় আড্ডা দিচ্ছেন, অফিসে বা বাইরে খাওয়ায় সঙ্গ দিচ্ছেন কাজ বেশি জুটছে সেই মেয়েদের বরাতেই। যে মেয়েরা ঐ পথে হাঁটছেন না তারা প্রত্যাশা মতো কাজতো পাচ্ছেনই না বরং তাদের সকল কাজেই অহেতুক খুঁত ধরা হচ্ছে। যে মেয়েদের বেশি কাজ দেয়া হতো তাদের নিয়ে পত্রিকার আধিকারিকদের মন্তব্য কানে আসতো। কখনো কখনো মেয়েদের সামনেই বা অনুপস্থিতিতে তাদের নিয়ে যে গল্প বা মন্তব্য করা হতো- সেটা প্রকাশ অযোগ্য এবং অবমাননাকর। আমাদের সময়কালে এই জাতীয় মন্তব্য যারা করতেন, তারা এখন অনেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে জনপ্রিয় এবং কেউ কেউ নারী স্বাধীনতা বা নারীকে নিয়ে অশালীন বক্তব্যের বিপক্ষে কড়া বক্তব্য দেন ও কলাম লেখেন। আমি তা দেখি, পড়ি এবং আমার সেই সময়কার অনেক সহকর্মীর সঙ্গে স্মৃতির পাতা উল্টাই। সেই পাতা উল্টাতে গিয়েই মনে পড়ে ঐসব আচরণের কারণে আমরা অনেক সম্ভাবনাময়ী মেয়ে সহকর্মীকে অঙ্কুরেই হারিয়েছি। আবার উল্টো কারণে কাউকে কাউকে এখন তারকা রূপে দেখছি।

টেলিভিশনে পা রেখে শোনা কথা’র মিল খুঁজতে থাকি। এখানেও আগের অভিজ্ঞতা। তার উপর দৃশ্যমান মাধ্যম। চেহারা অনএয়ার হলেই মুহূর্তেই তারকা। তাই এখানে প্রলোভন, হাতছানি আর ঝলমলে। এই ফাঁদে পা দেবার জন্য সব মেয়ে তৈরি নয়। কেউ হয়তো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফাঁদে পড়ে যায়। এক-দুইজন স্বেচ্ছায় ফাঁদে ধরা দিতে রাজি। একটা বড় অংশ চাকরির স্বার্থে যতোক্ষণ সম্ভব মানিয়ে বা লড়াই করে যাচ্ছে। টেলিভিশনে মেয়েদের দিকে লোলুপ দৃষ্টি স্বয়ং মালিকপক্ষের দিক থেকে নেমে আসে। অন্য আধিকারিকদের কেউ কেউ মুরিদের মতো তাদের অনুসরণ করে।

যে মেয়েরা লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না, তারা নিজেরাই শেষমেষ নিজেদের গুটিয়ে নেয় সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমের চাকরি থেকে। টেলিভিশনের বার্তাকক্ষেও মেয়েদের কোন দৃষ্টিতে দেখা হয় বা হতো তার কিছু উদাহরণ আমার সাবেক সহকর্মী শামিমা বিনতে রহমান একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলেন। অনেক মেয়ে সহকর্মীকে নিরুপায় হয়ে উর্দ্ধতন আধিকারীকদের ‘লুইচ্চা’ বলে গাল দিতে দেখেছি। এই আচরণের কারণেই অনেক উর্দ্ধতন আধিকারিককে প্রকাশ্যেই মেয়ে সহকর্মীদের তোপের মুখে পড়তে দেখেছি। কোন কোন মেয়ে সহকর্মীকে আগ বাড়িয়ে চাকরি দিতে উৎসাহিত হওয়া আবার কাজ জানে এমন মেয়েকে কাজ না দেয়ার উদাহারণ বিস্তর আছে। খবর কে বেশি পড়বে আর কে কম পড়বে তাও অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। এসাইনমেন্ট বিলি-বণ্টনেও ঝামেলা আছে।

এই সব কিছুর জন্যই কিন্তু দায়ী গণমাধ্যমের তেঁতুল সূত্র। আমরা যতোই অন্যের তেতুঁল কাহিনী নিয়ে মেতে উঠি না কেনো, আমাদের গণমাধ্যমের তেঁতুল কাহিনী কিন্তু সমাজ- পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে। অনেক সহকর্মীকেই বলতে শুনি- তিনি তার বোন, স্ত্রীকে গণমাধ্যমে কাজ করতে দেবেন না। তাদের কাছেই আমি প্রশ্ন রাখি- আপনার মেয়ে সহকর্মী’র সঙ্গে আপনার আচরণ, তার প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি শালীন?

অনেক নেতিবাচক এবং নিরাশার কথা শোনালাম। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেইতো রাত্রির পরে আসে স্নিগ্ধ ভোর। এবার সেই ভোরের কথা বলি। এখন সাংবাদিকতায় যোগ হয়েছে তরুণ রক্ত। তারা কিন্তু এই বিষয়ে সচেতন। পাশের পুরুষ সহকর্মীটি নারী সহকর্মী’র সঙ্গে কি আচরণ করছে সেই বিষয়ে সজাগ এবং প্রতিবাদী। প্রবীন রক্তের মধ্যে যে ভিমরতি ছিল, সেখান থেকে অনেকটাই পরিশোধিত হচ্ছে বার্তাকক্ষ বা গণমাধ্যম। আর সবচেয়ে বড় সুখবরটি হচ্ছে এখন গণমাধ্যমের উদ্যোক্তারাই কাজের জায়গাটিকে নারী বান্ধব করতে আগ্রহী। ফলে মেয়েদের ভিড় বাড়ছে গণমাধ্যমে। তবে একথাও সত্যি তেঁতুল সূত্র থেকে মুক্ত হয়নি গণমাধ্যম। তাই মেয়েদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে হয়তো আরো কিছু সময়। সেই লড়াইয়ে যদি পুরুষ সহকর্মী তার সঙ্গী হয়, তাহলেই গণমাধ্যমে তেঁতুল সূত্রধরদের নিষ্ক্রিয়করা সম্ভব হবে।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন
(বাংলানিউজ24 ডট কম থেকে নেয়া)

মূল লিংক: http://banglanews24.com/EidMag/detailsnews.php?nssl=eccbc87e4b5ce2fe28308fd9f2a7baf3

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.