MeToo মুভমেন্ট: পাইলট ও মডেল প্রিয়তীকে ভালবাসা

0

শাহরিয়া দিনা:
যৌন নির্যাতনবিরোধী #MeToo আন্দোলন শুরুটা করেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ নারী তারানা বুর্কে ২০০৬ সালে৷ এরপর হলিউডের প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনের যৌন কেলেঙ্কারির খবর ফাঁসের সূত্র ধরে মার্কিন অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো #MeToo হ্যাশট্যগের এই প্রচারণা শুরু করেন আবারো ২০১৭ সালে৷
যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা প্রকাশ করতে নারীদের উৎসাহিত করতে এ প্রচারণা দ্রুত জনপ্রিয় হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে৷ একসময় যৌন নিপীড়নবিরোধী এই প্রচারণায় নারীদের পাশাপাশি যোগ দেয় পুরুষেরাও৷ সামাজিক মাধ্যমে ভাগাভাগি করেন তাঁদের যৌন হয়রানির কথাও৷
তারানা বুর্কে বলেন, ‘‘আমি কখনোই ভাবিনি যে, সারা পৃথিবীকে বদলে দেবার মতো কিছু করছি৷ আমি শুরু আমার নিজের সমাজকে পাল্টাতে চাইছিলাম৷ এটা কেবল একটা মুহুর্ত নয়, এটা একটা আন্দোলন৷ এখন সত্যিকার অর্থেই কাজ শুরু হয়েছে৷’’
এইতো সাম্প্রতিক সময়ে হ্যাশট্যাগ #MeToo নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে ভারতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন হেনস্তার অভিযোগে একের পর এক ‘অপরাধী’র নাম প্রকাশ হচ্ছে। চলচ্চিত্রপাড়া বলিউডের অভিনেতা, কৌতুক অভিনেতা, সাংবাদিক, লেখক, পরিচালক থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রের পুরুষের বিরুদ্ধেই এ অভিযোগ উঠছে।

এই সেই রফিকুল ইসলাম

যৌন হেনস্থার ঘটনা নিয়ে যারা মুখ খুলেছেন তারা সবাই বলিউডের বা সংবাদ জগতের বেশ পরিচিত মুখ। এমনকি #MeToo আন্দোলনের আঘাত লেগেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভাতেও। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবরের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন প্রিয়া রমণী নামের এক সাংবাদিক। খবর বিবিসি, এবিপি ও এনডিটিভির।

অভিনেতা নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ তুলেছেন বলিউডের অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। তনুশ্রী দত্তের পাশে দাঁড়িয়েছেন তার সহকর্মী এবং সাংবাদিকেরাও।
এসবের ধারাবাহিকতায় এবার যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ জানিয়ে মুখ খুলেছেন মিস আয়ারল্যান্ড খ্যাত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মডেল ও অভিনেত্রী মাকসুদা আক্তার প্রিয়তী। ঘটনাটা ঘটেছিলো ২০১৫ সালের মে মাসে। তখন তিনি সবে মিস আয়ারল্যান্ড খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।
সেই সময়ে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্যিক গ্রুপের কর্ণধার রফিকুল ইসলাম তার অফিসে তার ওপর যৌন নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ করেছেন প্রিয়তী। তিনি নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে লাইভ হয়ে এসব অভিযোগ করেন। এর আগে নিজের অ্যাকাউন্টে তিনি এই অভিযোগ করে একটি খোলা পোস্ট দেন। প্রিয়তী ফেসবুকে তার লাইভে তিন বছর আগে তার ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের মোটামুটি বিশদ বিবরণও দেন।
তিনি বলেন, একটা বিজ্ঞাপনের পেমেন্ট আনতে গিয়ে তিনি এই হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন। রফিকুল তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন এবং অযাচিতভাবে শরীরের বিভিন্ন অংশে হাত দিয়েছিলেন। তিনি উইমেন চ্যাপ্টারকে বলেছেন, যাদের নাম তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন, তারা হয়তো চাকরি হারানোর ভয়ে আজ কিছুই বলবেন না, কিন্তু তারা জানেন পুরো ঘটনাটি। তাছাড়া ওই অফিসের সিকিউরিটি এমন কড়া যে তিনি রীতিমতো আতংকিত ছিলেন ভেবে যে ওখানে তাকে গুম করে ফেললেও কাকপক্ষি কেউ জানতে পারবে না। তাই তখন তিনি আসলে মুখ খুলতে পারেননি, সব মিলিয়ে পরিবেশটা অনুকূলে ছিল না মোটেও।

পাইলট হিসেবে প্রিয়তী

পেশায় পাইলট, আর শখের বশে ছোটবেলা থেকে মডেলিং এর সাথে জড়িত প্রিয়তী তার ওই পোস্টে আরও লিখেন, ‘বাংলাদেশে #MeToo এর মুভমেন্ট কীভাবে হবে? এই লোককে নিয়ে কেউ কোনো নিউজ করবে না, কারণ গণমাধ্যম তাদের ভয় পায়, সাংবাদিকদের চাকরি চলে যাবে। কারণ বেশিরভাগ টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা তাদের হাতের মুঠোয়। কীভাবে খুলবে মেয়েরা মুখ? যেখানে জানবে তাদের কিছুই হবে না।

প্রিয়তী বলেন, বাংলাদেশের মেয়েরা যতদিন মুখ খুলবে না, #MeToo ও হবে না, ভারতের মতো যতদিন ওরা অনুভব করবে তাদের জন্য বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্বাধীন এবং তাদের পাশে থাকবে সে যত উপরের মানুষই হোক না কেন। আমি শুধু এতটুকু বলতে চাই, পুরো ঘটনাটি লজ্জায় লিখতে পারিনি, কারণ ঘটনা এর চেয়ে ভয়াবহ ছিল।
এই ধরনের নিপীড়নের ঘটনা সাধারণত সবাই চেপে যান। প্রিয়তী’র মুখ খোলা অবশ্যই সাহসী পদক্ষেপ। বাংলাদেশে এই #মি_টু আন্দোলনে আরেকজন এগিয়ে এসেছেন। এর আগে ফারিয়া নামের এক অভিনেত্রী মুখ খুলেছিলেন। কিন্তু বন্যা মির্জা, শহীদুজ্জামান সেলিমসহ অভিনয় জগতের কিছু দিকপাল তখন মোটামুটি ধমকে তাকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। এখন দেখা যাক, কতদূর কী হয়! প্রিয়তী’র পথ ধরে আরো অনেকেই সাহসী হয়ে #MeToo আন্দোলনে সামিল হবে নিশ্চয়ই। খুলে যাবে কিছু প্রভাবশালী মানুষরুপী যৌন বিকারগ্রস্থের মুখোশ।

লেখক: শাহরিয়া দিনা

#MeToo আন্দোলন এখনো পর্যন্ত সমাজের উচ্চবর্গীয় ও সামাজিক যোগাযোগ  মাধ্যমগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সমাজের অন্য সব স্তরেও এই ঢেউয়ের পৌঁছে যাওয়াটা স্রেফ সময়ের ব্যাপার। এমন টেউ কতটা ঝড় হয়ে আসতে পারে তার প্রমাণ তো বিশ্ববাসী দেখেছে। বাংলাদেশে যদিও আশংকা এর অগ্রগতি নিয়ে, তারপরও কখনও না কখনও যে এটি আলোর মুখ দেখবে না, তা বলা যায় না। স্ফুলিঙ্গ দরকার শুধু।

শুরুটা যখন হলো, তখন এগিয়ে আসুক প্রিয়তীর মতো আরো অনেকে। বাংলাদেশের মেয়েরাও ব্যক্তিগত অন্ধকার অভিজ্ঞতার চাদর ভেদ করে বেরিয়ে আসবে সাহসী আলোর মশাল হাতে। সেই আলোতেই উন্মোচিত হবে সমাজের লম্পটের কদাকার মুখ। হাজারো প্রতিকুলতা, বাধা-বিপত্তি পারি দিয়েই তো ভবিষ্যৎতের জন্য নিরাপদ সমাজ এবং রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে হবে।প্রিয়তীর জন্য শুভকামনা।
বাংলাদেশেও সফল হোক #MeToo মুভমেন্ট।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 354
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    354
    Shares

লেখাটি ১,৭০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.