আইয়ুব বাচ্চু নয়, জাহান্নামে আপনারাই যেতে পারেন ডিয়ার হুজুরস

0

শামীমা জামান:

বাচ্চু ভাইকে নিয়ে স্মৃতিচারণা বা কোনো লেখাই লেখার মানসিক অবস্থা আসলে নেই। অথচ কত স্মৃতি! কত কথা! কিছু মানুষ আমার অতি প্রশংসা করে থাকেন তাদের মধ্যে বাচ্চু ভাই অন্যতম। উনার সাথে দেখা হয়েছে আর সকলের সামনে উনি আমার গুণগানে বন্যা বইয়ে দেননি, এমন কখনো হয়নি। যে মানুষটি আমাকে সম্মানিত করতেন অন্যদের সামনে সেই মানুষটিকে মৃত্যুর পরে অসম্মানিত হতে দেখে কিছু বলা নৈতিক দায়িত্ব মনে করছি।

বাচ্চু ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শহরে ছড়িয়ে পড়ে আচমকাই সেদিন। যানজটের এই শহরের রিকশাওয়ালা, সি এন জি চালকটি পর্যন্ত কেঁদে বুক ভাসায়। কাঁদে সারা দেশ। কাঁদে ফেসবুক। এখন এই ফেসবুকের বিরাট একটি অংশের একদল লোক যারা কেউ কেউ আলেম ওলামা ডিগ্রিধারী, ফেসবুকের ফেরিওয়ালা জামাকাপড় বেচা লাইভ আপুদের সাথে প্রতিযোগিতা দিয়ে এনারা আজকাল লাইভে হাজির হন।

ছবি তোলা তো গুনাহ’র কাজ, সেই হিসেবে ভিডিও তো বেশি গুনাহ। হুজুরেরা সেই কথা ভুলে গিয়ে অবশ্য লাইভে রমরমা। তো উনাদের মধ্যে কজনকে দেখলাম বাচ্চু ভাইয়ের মৃত্যুদিনেই লাইভে এসে তার সম্পর্কে ঘৃণার বাণীতে মুখে ফেনা তুলে ফেললেন। গান গাওয়া হারাম। এই হারাম কাজ করে আইয়ুব বাচ্চু দোযখবাসী হবেন। তাই তার জন্য যারা কাঁদছেন, তারা ঠিক করছেন না। এই সতর্কবাণী তারা দিতে এসেছেন। বিকৃত অঙ্গভঙ্গিতে, রাজ দরবারের কারুকার্য খচিত চেয়ার চাপড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে ওয়াজ মাহফিলের আসর কাঁপিয়ে তারা আইয়ুব বাচ্চুর চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করেন। বয়স্ক কেউ কেউ আবার টিটকারির সুরে ওয়াজ করেন, ‘আজকে একজন গায়ক মারা গেছেন, কী নাম যেন ওর? আইয়ুব বাচ্চু। আহহা! বাবা-মা নাম তো ভালো রাখছিল। কিন্তু কাম করে গেছে কী?

আইয়ুব বাচ্চু

ডিয়ার হুজুরস, শোনেন তবে আইয়ুব বাচ্চু কী কাম করে গেছেন! আপনাদের মতো অশিক্ষিতদের আমি বোঝাতে যাবো না উনি কত বড় একজন গিটারিস্ট ছিলেন। উনি জিমি হেন্ড্রিক্স ছিলেন। উনার রুপালী গীটার, সেই তুমি কালজয়ী গান হয়ে বেঁচে থাকবে। উনার কাজের কোয়ান্টিটির সাথে কোনো কথা হবে না। উনি পশ্চিমবঙ্গে ব্যান্ড সঙ্গীত প্রতিষ্ঠায় কী ভূমিকা রেখেছেন! বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত তথা সমগ্র সংগীত ইন্ডাস্ট্রিতে তার কী ভূমিকা! উনার মতো লেজেন্ড বছরে বছরে রিয়েলিটি শো দিয়ে জন্মায় না। এনিওয়ে এইসব আপনাদের হাদিয়ার টাকায় কেনা গরুর গোস্ত খাওয়া নষ্ট মাথায় বুঝে আসবে না। আমি বরং আপনাদের কথা দিয়েই বলি। বিশ্বাসের কথা দিয়েই বলি। আইয়ুব বাচ্চু জন্মসূত্রে দায়ঠেকা কোনো অবিশ্বাসী মুসলমান নয়।

সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাঁর বিশ্বাসের লেভেল ছিল অনেক উঁচুতে। সেটা লুকানো ফ্যাশনাস্তিকের মতো নয়, বরং প্রকাশ্য। তার কথার আগে পিছে উনি আল্লাহর নাম যুক্ত রাখতেন সব সময়। ভণ্ডদের মতো জনসম্মুখে নাস্তিক ভাব ধরে বাড়ি এসে বিপদে আল্লাহর নিরানব্বই নাম জপা লোক উনি নন। এরপর আসেন আপনার নামাজে। উনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন।যারা তাঁর সাথে কাজ করেছেন, তারা অনেকেই বলতে পারবেন উনি নামাজের সময় হলে কাজ থামিয়ে তাদের নিয়ে নামাজ আদায় করেছেন। আর নামাজ হলো বেহেশতের চাবি।

কী কথা বলেন না কেন এখন? মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। যে বেহেশত চায় সে যেন মাকে খুশী রাখে। আমি আইয়ুব বাচ্চুর মতো মা ভক্ত মানুষ খুব কম দেখেছি। তাঁর কাছের মানুষরাও জানেন মাকে তিনি কেমন জানতেন, মা ছিল তাঁর সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। এমন করে মাকে মায়ের সম্মান দেয়ার গল্প আমরা বায়েজিদ বোস্তামীতে জেনেছি। ওয়াজ কুরনীতে জেনেছি। সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত কে ঠেকাবে উনার জান্নাত! আমি এমন অনেক হুজুরের গল্প জানি, যারা সম্পদ হাসিলের জন্য মায়ের সাথে জঘন্য দুর্ব্যবহার করতো। কী কথা বলেন না কেন?

ডিয়ার হুজুরস, আইয়ুব বাচ্চুর গোপন সদকা সম্পর্কে আপনাদের ধারণা আছে? ঠিক যেমন নেই আইয়ুব বাচ্চুর নাম ভাঙ্গিয়ে ওয়াজ করে আপনাদের অবৈধ উপার্জন এর খবর সম্পর্কে মানুষের ধারণা। অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার জন্য তিনি লাখ লাখ টাকা দিয়ে নিজের নামটি প্রকাশ না করার অনুরোধ করতেন। এমন দু একটি কাহিনী এখন ভাইরাল। এমন দান আপনি হুজুর করেন? নাকি মসজিদ কমিটির টাকা থেকে দামি ফোন কিনে অসভ্য ভিডিও সেভ করে অবসরে আয়েশ করে দেখতে দেখতে শয়তানের কুমন্ত্রণায় অবুঝ শিশুর পায়জামার ফিতা ছিঁড়ে ফেলেন? কী কথা বলেন না কেন?

শামীমা জামান

মা মারা যাবার পর বাচ্চু ভাই হজ করেন। হজ করে আসলে নাকি মানুষের সমস্ত পাপ মাফ হয়ে নিষ্পাপ হয়ে যায়? অবশ্য আপনারা যে সব হুজুরেরা হজ মৌসুমে মাথা প্রতি ৩০ হাজার, কাফেলার নানান ব্যবসায় অংশ নেন, তাদের কথা আলাদা। বলা হয়েছে কেয়ামতের ময়দানে সমস্ত মানুষ পেরেশানিতে থাকবে আর একদল লোক মাটির ঢিবির উপর চিন্তাহীন আনন্দে অবস্থান করবে।

তারা কারা? তারা সেই সব লোক যারা ছোট বড়, গরীব ধনী সমস্ত মানুষের সাথে সদাচারী ছিল। আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন সেইরকম সদালাপী একজন চমৎকার মানুষ। আপনাদের মতো দাঁত সিটকানো, খচ্চর আলাপী লোক নয়। কত কুৎসিত মনের মানুষ হলে আপনারা একটা মানুষের মৃত্যুদিনে তাঁর সম্পর্কে কুৎসায় লিপ্ত হোন!

ডিয়ার হুজুরস, সর্বপ্রথম জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলার কথা নিকৃষ্ট আলেমদের ব্যাপারে বলা হয়েছে। গায়কদের ব্যাপারে বলা হয়নি। তাই তাদের নিয়ে আপনাদের এতো চিন্তা না করলেও চলবে। বাচ্চু ভাই বেঁচে থেকে এসব শুনলে উনি উনার সম্পর্কে এতো ব্যাখ্যা দিতে নিষেধ করতেন। উনি জাস্ট আপনাদের খাসী খাওয়া মোটা ঘাড় গর্দানে দু হাত বাড়িয়ে বুকে জড়িয়ে নিতেন। আর আপনারা উনার মহৎ সান্নিধ্য পেয়ে স্রেফ কেঁদে দিতেন। আর তখন বুঝতেন এতো মানুষ কেন কাঁদে! এতো মানুষ কেন উনার জানাজায় শরীক হয়!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ৫,০৮০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.