নীলা ও একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা

0

ইশরাত মাহেরীন জয়া:

১.

– আপা, আপনার চোখটা কার মতো?
কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে নীলা সহকর্মী হারুন সাহেবের দিকে তাকাল।
– আমার দাদীর মতো।
– বাহ, আপনার দাদা খুব ভাগ্যবান ছিলেন।
– নাহ! অনুমান ভুল। আমার দাদী নামকরা ঝগড়াটে ছিলেন। তার ওই বিশাল চোখ, আরও গোল করে আমার দাদার দিকে যখন তাকাতেন, আমার খেয়াল আছে, চোখগুলো ডিম পোঁচের মতো লাগত।
– ইশ আপা, আপনি কি যে বলেন! আমারতো রাগী মেয়েদের খুব ভালো লাগে।
– আপনার তো লাগবেই। পৃথিবীতে এমন কোনো পদের মেয়ে আছে যাকে আপনার ভালো লাগে না?
এবার হারুন সাহেব বুঝলেন, সুবিধা হচ্ছে না।
– ঠিক আছে আপনি কাজ করেন, আপনার আজকে মনটা ভালো নেই।

আসলে অনেকদিন পর নীলার মনটা বেশ ভালো। কাল একটা অন্যরকম ছুটির দিন। মেয়েকে টিচারের বাসায় নেয়া আর টিভি দেখা ছাড়া ছুটির দিনগুলো তার একঘেয়ে কাটে। কাল তার খালাত বোনের আকদ।

ঘরোয়া অনুষ্ঠান হলেও, নীলা ভেবেছে অনেকদিন আগে কেনা নতুন নীল শাড়িটা পড়বে, নীল টিপ দিবে। পার্লারেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এসেছে। এই এক নতুন শখ হয়েছে, সাজগোজ। এটা তার মন ভালো রাখার আরেক পন্থা। অনেক কষ্ট হয়েছে এই জীবনের সাথে মানাতে। অফিসেও অনেকের দেখার দৃষ্টি পালটে গেছে, ডিভোর্সি একজন মহিলা কেন যেন সবার আলোচ্য প্রিয় বিষয়!

২.

পার্লারে হাতে মেহেদি দিয়ে বসে আছে নীলার মেয়ে তুলি। ফোকলা দাঁত বের করে বলে, মা তুমি নাচবে আজকে?
– ধুর বোকা আমি নাচবো কেন?
তুলিকে উৎফুল্ল করতে সে যখন বাসায় নাচ প্র্যাকটিস করে, নীলাও সাথে করে। নীলার ভুলভাল নাচ দেখে তুলি হেসে কুটিকুটি। মেয়েটার হাসি তার জীবনে সব চেয়ে প্রিয়।

শোয়েবের সাথে যখন নীলার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় তখন তুলিকে নিয়ে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। ওই সময়টার কথা মনে হলে নীলার এখনো চোখে পানি চলে আসে। একটা কথা নীলা হাড়ে হাড়ে বুঝেছে, বিয়ে যখন ভাঙতে থাকে তখন সমাজের একটা বড় অংশ মেয়েটার কী দোষ আছে তা বের করার জন্য অস্থির হয়ে যায়। তিন দিক থেকে তীর আসে। নিশ্চয় এই মেয়ে দুশ্চরিত্রা, না হয় সে মা হিসেবে ভালো নয় নয়তো তার মানসিক সমস্যা আছে। মেয়েটার ঘাড়ে দোষ দিতে পারলে তখন পুরুষ মানুষটির আরেকটা বিয়ে করা খুব সহজ হয়ে যায়। ছেলে মানুষ সঙ্গী বিহীন কীভাবে থাকবে?

লেখক: ইশরাত মাহেরীন জয়া

নীলা বিয়ের পর ভালোবাসার আতিশয্যে অনেক কিছু মেনে নিলেও এক সময় সে শোয়েবের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ শুরু করে। নীলারও একটা শক্ত ব্যক্তিত্ব আছে যেটা শোয়েব মানতে চাইতো না। শোয়েবের দাবি মেনে নিয়ে নিজের স্কলারশিপ পর্যন্ত নষ্ট করেছে নীলা। শোয়েব তাকে পড়তে যেতে দেয়নি। এখন ভীষণ আফসোস হয় তার। কেন যে সে মেনে নিয়েছিল? চাকরি করেও নীলা নিজের ইচ্ছেতে কিছুই করতে পারতো না। নিজের উপার্জনের টাকার কিছুই তার নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। বাসা থেকে বের হয়ে যে সময়টুকু সে কাজ করতো তার ভালো লাগতো। শুধু ঘর সংসার করে সুখী হওয়ার মানসিকতা নিয়ে সে বড় হয়নি কিন্তু তাতেও আপত্তি উঠলো। মেয়েটা হওয়ার পর শ্বশুরবাড়ি থেকে শুধু চাপ দিচ্ছিল চাকরি ছেড়ে দিতে। শোয়েবের থেকে অনেক ভালো ছাত্রী ছিল নীলা কিন্তু তার ক্যারিয়ার করা যেন বিশাল এক অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। চাকরি সে ছেড়ে দিবে ভেবে ছিল একবার, কিন্তু শোয়েবতো বিয়ের আগে তাকে কখনো বলেনি যে বিয়ের পর তার ক্যারিয়ার এতো বড় একটা বিষয় হবে। তার চাওয়াটুকুর কোনো মূল্য নেই? একদিন কাজ থেকে ঘরে ফিরে শুনল তার শাশুড়ি তার মেয়েটিকে বলছে, তোমার মা সারাদিন অফিসে তোমার ভালো লাগে?
নীলা মাথা ঠিক রাখতে পারেনি।
– মা, আপনি আমার মেয়েটাকে এসব কেন বলছেন?
– আমরা তো চাকরি করিনি! আমাদের কী সংসার চলেনি? নিশ্চয়ই অনেক অযত্ন হয় এই মেয়ের।
– আপনাদের যুগ আলাদা ছিল আর আপনার চাকরি করার মতো শিক্ষাদীক্ষা ছিল না।
শোয়েব ঠিক ওই মুহূর্তে ঘরে ঢুকলো। ভীষণ বাজে ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলো নীলাকে। তার মায়ের সাথে বেয়াদবি করে কত বড় সাহস!
শেষের দিকে অতিষ্ঠ হয়ে মুখে মুখে তর্ক করতো, ঝগড়াঝাঁটি হতো। ঘরের জিনিসপত্র আছড়ে ভেঙেছে কিন্তু এইভাবে কদিন? এরকম জীবনে সব থেকে কষ্টে থাকে বাচ্চারা। তুলি মন খারাপ করে কুঁকড়ে থাকতো।

নীলা খেয়াল করতো নিজের আত্মীয় স্বজন এমনকি ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মনোভঙ্গি- ‘স্বামী তো অন্য মেয়ের কাছে যায়নি, মারধোর করেনি। তাহলে আর কি? তাকে ভালো স্বামী হিসেবে মেনে নাও।‘ এরকম একটা অলিখিত নিয়ম জোর করে মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। ওই দুই জিনিস না থাকলে তার অন্যসব অপমান মাফ কিন্তু নীলা মানেনি। সমস্ত পৃথিবীর সাথে লড়াই করে সে বের হয়ে এসেছে। দিনে দিনে তিলে তিলে পুড়ে সে বুঝেছে যেখানে সম্মান নেই সেখানে ভালোবাসাও নেই। অনেকেই নীলার কাছ থেকে সরে গেছে, নীলার আজকাল আপনজন অনেক কম। কিন্তু নীলা কি খারাপ আছে? কোনো কোনো দিন সে হয়তো একটু বিষণ্ন হয়, কিন্তু অশান্তি আর নেই বরং তার স্বাধীনতা আছে, সে মাথা উঁচু করে হাঁটে। নিজের একান্ত স্বাধীনতা সে উপভোগ করে আর জানের টুকরো মেয়েটা তার পুরো সময়জুড়ে থাকে। জীবনে পুরুষ মানুষের আর দরকার নেই। হৃদয়ের দরজা সে শক্ত করে বন্ধ করে দিয়েছে।

আয়নায় নিজেকে দেখছে নীলা। অনেকদিন পর পার্লারে সেজেছে। অনেকদিন এমন উঁচু করে চুল বাঁধেনি। নিজেকে অন্যরকম লাগছে। আজ মনটা ভালো লাগছে। মেয়েটাও বড্ড খুশি।

৩.

বাসায় ফেরার পথে সে লক্ষ করলো, আকাশে একটু একটু মেঘ। মেঘলা আকাশ দেখে নীলা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল। পুরো গলা ছেড়ে গান গাইল আর শাড়ি পরল। কিন্তু সারা বাড়ি খুঁজে নীল টিপ পাওয়া গেল না। কী মুশকিল! বাসা থেকে যখন বের হবে সেই মুহূর্তে খালার ফোন আসলো। উনি উনার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নানা কথা বলছেন, কিন্তু একটু দ্বিধা করে বললেন, নীলা ভাবছিলাম আমি তো ওদের আগে কিছু বলি নাই…।
– কী বিষয়ে খালা?
– শোয়েবকে নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে কী বলবি চিন্তা করিস।
– ওরা কীভাবে জানবে?
– তোর মেয়েকে দেখে বরের কথা জানতে চাইবে। বিয়েটা এখনো হয়নি, পারলে ডিভোর্সের কথা ওদেরকে এক্ষুণি বলিস না।
হঠাৎ নীলার কথা ফুরিয়ে গেল, ত্রিশ সেকেন্ড সময় নিলো আর রাগটা সে বহু কষ্টে সামলাল। তারপর বলল, খালা আপনি চিন্তা করবেন না। আপনাকে বলতে ভুলে গেছি, আমি যাব না।
– ওমা কেন?
– আমার অন্য দাওয়াত আছে।
– তুলি আসবে না?
– আমি আমার মেয়েকে নামিয়ে দিব।

পথে নীলা তুলির মাথায় হাত দিলো। হালকা বাতাস আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। নীলা আদর করে বলল, মা আমি তোমাকে নামিয়ে চলে যাব।
– কেন মা?
– এমনি আমার ইচ্ছা হচ্ছে না যেতে।
– তাহলে তুমি সাজলে কেন?
– এমনি আমার ইচ্ছা হয়েছিল।
মেয়েটা চুপ হয়ে আছে। তার মনের খুশিটাও যেন নিভে গেল। মেয়েটা অনেক কিছু দেখেছে তাই বয়সের তুলনায় সে অনেক পরিণত।
– মা আমিও বিয়েতে যাব না।
– না তুমি যাবে। নাহলে মা মনে কষ্ট পাব।
– আচ্ছা।
পুরো পথে আর কোনো কথা হয়নি তাদের। বাসায় পৌঁছে মাকে জাপটে ধরে আদর করে মেয়েটা বিয়ে বাড়ির ভিতর হারিয়ে গেল।

তুলিকে নামিয়ে দিয়ে নীলা রাস্তায় নেমে দেখল চারদিক অন্ধকার করে ঝুমবৃষ্টি। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে চোখের কাজল, ভিজে যাচ্ছে সে, তবুও সে জোরে জোরে হাঁটছে। পাশ থেকে এক রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করলো, আপা কোথায় যাবেন?
সে উত্তর দিলো, কোথাও না।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের মতো নিজেকেই বলল, মন খারাপের পৃথিবীতে যাব।

মন খারাপের পৃথিবীটা অনেক ছোটো,
তাতে জানালা আছে দরজা নেই,
প্রায়শই থমকে দেখি
ঘুটঘুটে আঁধার আছে বাতি নেই।

মন খারাপের পৃথিবীটা নিঃশব্দ
সেখানে বৃষ্টি হয় অন্তহীন,
অশ্রুজল ঝরে পড়ে
একেবারেই শব্দ বিহীন।

মন খারাপের পৃথিবীতে একজন মানুষ
একটাই ঘর ঠিকানাহীন,
ডাকপিয়ন আর অতিথি
সে ঘর খুঁজে পায়নি কোনোদিন।

বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আর এক অপার্থিব রমণীর মতো সব কিছু উপেক্ষা করে নীলা হাঁটতে শুরু করলো। কষ্ট করে নীলা শিখেছে কোনো কোনো যাত্রার গন্তব্য থাকে না, শুধু জানতে হয় পিছন ফিরে তাকানো চলবে না।

লেখক: ইশরাত মাহেরীন জয়া

ডালাস, টেক্সাস

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 317
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    317
    Shares

লেখাটি ৯৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.