তসলিমার পুরো কবিতাটাই যেন ওই মেয়েটি

0

সুপ্রীতি ধর:

নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনের ‘ও মেয়ে শোনো’ কবিতাটা পড়েননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল, বিশেষ করে এই অনলাইনের যুগে এই কবিতাটা দুদিন পরপরই আমাদের সামনে চলে আসে। বোঝাই যায়, কতোটা অনুপ্রেরণা কাজ করে আমাদের মাঝে এই কবিতাটি। তাছাড়া শক্তিদায়ক তো বটেই!

পাঠকদের সুবিধার জন্য আরেক ঝলক পড়ে আসি কবিতাটি:

তোমাকে বলেছে –আস্তে,
বলেছে –ধীরে.
বলেছে –কথা না,
বলেছে –চুপ।
বলেছে– বসে থাকো,
বলেছে– মাথা নোয়াও,
বলেছে — কাঁদো।

তুমি কি করবে জানো?
তুমি এখন উঠে দাঁড়াবে
পিঠটা টান টান করে, মাথাটা উঁচু করে দাঁড়াবে,
তুমি কথা বলবে, অনর্গল বলবে, যা ইচ্ছে তাই বলবে,
জোরে বলবে,
চিৎকার করে বলবে,
এমন চিৎকার করবে যেন ওরা দুহাতে ওদের কান চেপে রাখে।
ওরা তোমাকে বলবে, ছি ছি! বেহায়া বেশরম
শুনে তুমি হাসবে।
ওরা তোমাকে বলবে, তোর চরিত্রের ঠিক নেই,
শুনে তুমি জোরে হাসবে
বলবে তুই নষ্ট ভ্রষ্ট
তুমি আরও জোরে হাসবে
হাসি শুনে ওরা চেঁচিয়ে বলবে, তুই একটা বেশ্যা
তুমি কোমরে দুহাত রেখে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে বলবে, হ্যাঁ আমি বেশ্যা।
ওদের পিলে চমকে উঠবে। ওরা বিস্ফারিত চোখে তোমাকে দেখবে। ওরা পলকহীন তোমাকে
দেখবে। তুমি আরও কিছু বলো কি না শোনার জন্য কান পেতে থাকবে।
ওদের মধ্যে যারা পুরুষ তাদের বুক দুরু দুরু কাঁপবে,
ওদের মধ্যে যারা নারী তারা সবাই তোমার মত বেশ্যা হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।

সুপ্রীতি ধর

এখন একটু মেলাই। গত দুদিন ধরে ঢাকার রাস্তায় গভীর রাতে পুলিশের চৌকিতে তল্লাশির নামে এক নারীকে নিপীড়নের যে ভিডিওটি ভাইরাল হলো, তার মূল কথাগুলো কী ছিল?
পুলিশ ওই তরুণীর মুখে লাইট মেরে তাকে বলছে, ‘অভদ্র’, ‘বেয়াদপ’, ‘অ্যাডিক্টেড’, ‘এমন কোন বিশ্বসুন্দরী না’, ‘কোন মিনিস্টারের মেয়ে?’, ‘হোটেল থেকে নেমে আসছে’, ‘র‍্যাম্পমডেলিং করতে যাবে মনে হয়’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

এখন কবিতাটা আবার পড়ুন, এবং চাইলে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটা আরেকবার দেখুন এবং শুনুন। মেয়েটি কোন প্রশ্নের উত্তরে কী বলেছে, এবং কীভাবে বলেছে। জোরে বলেছে, চিৎকার করে বলেছে। শুনে পুলিশ মিউ মিউ করেছে, ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। ওরা মেয়েটিকে বলেছে, রাতে বাইরে কেন? মেয়েটি বলেছে,  আপনার সমস্যা? ওরা বলেছে, বেয়াদব। মেয়েটির উত্তর, হ্যাঁ, আমি বেয়াদব, আপনার সমস্যা? ওরা বলেছে, চ্যাংদোলা করে থানায় নিয়ে যাবে, মেয়েটি বলেছে, আমি নিজেই যাবো, আমার অপরাধটা কোথায়, জানবো।

আসো মেয়ে, তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরি।

আমি হলে গলা শুকিয়ে আসতো, মুখ দিয়ে কথাই সরতো না, অথবা অযথা চিৎকার করতাম। যেকোনো একটা হতো আমার সাথে এরকম পরিস্থিতিতে যদি আমি একা থাকতাম।

কিন্তু মেয়েটি সাহসী, ঠিক যেমনটি আমরা হতে চাই, ঠিক যেমনটি হওয়ার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত মেয়েদেরকে বলে যাচ্ছি, বলেই যাচ্ছি, মেয়ে তুমি এই করো, মেয়ে তুমি সেই করো। নিজেদের বেলায় যদিও ভজঘট লেগে যায়, কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে আসলেই।

আমার চোখে এই মেয়েটিই ‘শিরো’, প্রকৃত নারীবাদী সেই। সে আমাদের সোকলড নারীবাদীদের মতোন পুতু পুতু নারী নয়, সে কোনো ভিকটিম কার্ডও প্লে করেনি, গ্রুপিং করতে হয়নি তার বিরুদ্ধে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে, নো সংবাদ সম্মেলনে, নো রাজনীতিকরণ। তাকে বলা প্রতিটি অন্যায় শব্দের মুখে চপেটাঘাত সে করেছে যথার্থ উত্তর দিয়ে, ঠিক যেসব উত্তরের কথা আমরা আমাদের লেখায় লিখি। ব্রাভো মেয়ে, তোমাকে স্যালুট।

তসলিমার কবিতার সেই মেয়েটি আসলে তুমিই। ঠিক তোমার জন্যই উনি এই কবিতাটি লিখেছিলেন বলেই মনে হচ্ছে। এমনি আরও হাজার হাজার মেয়ে একদিন তৈরি হয়ে যাবে, যারা পুরুষতন্ত্রকে ঠিক এইভাবে থাপ্পড় মেরে উড়িয়ে দিতে জানবে। আবারও মেলাই, মেয়েটি যখনই অপমানের উত্তর দিয়েছে, তখনই পুলিশের গলার স্বর স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে গেছে। তাদের মুখে কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ওই উপরেল্লিখিত কয়েকটি শব্দ ছাড়া আর কিছু আসেনি।

বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে তসলিমা নাসরিন, সবাই আমাদের প্রতিরোধের কথা বলেছেন। তসলিমার তো অনেক সাহস, নিজের জীবন বিপন্ন করে তিনি আমাদের পথ দেখিয়েছেন। আমরা আজ অনেকেই বিভিন্ন ইস্যুতে কলম হাতে নিচ্ছি, কীবোর্ডে ঝড় তুলছি, মাঠে নামছি, কোনটাই কিন্তু নতুন না। উনি এসব কথা অনেক আগেই বলে গেছেন। আমরাই বরং ক্ষেত্রবিশেষে মিউ মিউ করি। আপোস তো অনেক আগেই করে বসে আছি।

যা বলছিলাম, পুলিশের হেনস্থার শিকার ওই মেয়েটি যেভাবে তাকে বলা প্রতিটি অপমানসূচক শব্দের প্রতিউত্তর দিয়ে গেছেন, আমি/আমরা এককথায় স্তব্ধ। এতোটুকু ডিলেমা নেই তার আচরণে, প্রতিটি উত্তর যেন তার মুখে বসানোই ছিল, এবং তার ঝটপট উত্তরের কারণে এমেচার ভিডিওকারী পুলিশ সদস্যরাও রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। মাত্র একমাস আগেই মিরপুরে ঘটে যাওয়া প্রায় একইরকম একটি ঘটনায় ‘আমি এমপির মেয়ে’ জাতীয় শব্দের কারণে পুরোটা বিষয়টা পুলিশের পক্ষে গিয়েছিল। মানুষ আসলে ক্ষমতার দাপট দেখতে চায় না বলেই আমরা ওই ভিডিওটার আগে-পিছে কিছুই না দেখে একচেটিয়া বলে গেছি মেয়েটির দম্ভের কথা। তাছাড়া সেখানে রাস্তার রুলস ভাঙারও একটি বিষয় জড়িত ছিল।

কিন্তু রাতের এই ঘটনায় মেয়েটি তো কোনো রুলস ভাঙেইনি, বরং তাকে হেনস্থা করে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাই জাহির করতে চেয়েছে পুলিশ সদস্যরা, ঠিক যেমনটি তারা শিখে আসে নিজ পরিবার থেকে, সমাজ থেকে। এতো এতো কোটি টাকার বাজেট খরচ করে এতো বছর ধরে পুলিশ সদস্যদের তাহলে কী জেন্ডার প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো? সবার আগে আমার মাথায় এটিই এসেছে। আমি নিজে সেইসব প্রশিক্ষণের বুলেটিনগুলো অনুবাদ করেছি। জানতে পেরেছি তাদের কতোরকম প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে শুধুমাত্র তাদেরকে নারীবান্ধব করার জন্য। কিন্তু এই কি তার নমুনা?

আবারও বলি, এরকম নাম না জানা মেয়ের সংখ্যা বাড়ুক প্রতিদিন। এমন মেয়েকেই দরকার আমাদের। আমি চাই, এরাই এখন হাল ধরুক নারীর পথচলার। অনেক পথ হেঁটেছি আমরা, এমন নমনীয়-কমনীয় হয়ে কোনোকিছুই আদায় হয় না। এজন্য দরকার শক্ত এবং পাল্টা আঘাতের।

মেয়েটি দারুণ সাহস দেখিয়েছেন। ‘আওয়ামী নারীবাদীদের পথ তিনি অনুসরণ করেননি। একবারও পারিবারিক, রাজনৈতিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি তিনি দেখাননি”। মাথা নিচু করে বলেননি, ভাই, আমি ভদ্রঘরের মেয়ে, আমি অমুক নই, তমুক নই, আমাকে খারাপ মেয়ে, বেয়াদব বলবেন না, আর রাতে বেরুবো না, ছেড়ে দিন আমাকে। বলেননি তিনি।

বরং উল্টোটা বলেছেন। সাবাশ মেয়ে! বার বার তোমার কথাই শুনতে ইচ্ছে করছে আমার। এমন আগুনমুখো মেয়েদেরই যে ভীষণ প্রয়োজন সমাজটার খোলনলচে পাল্টে দেবার জন্যে। সাধারণের জায়গা থেকে চমৎকার লড়াইয়ের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে মেয়েটি। ‘পুলিশের বৈষম্যমূলক, সেক্সিস্ট, পুরুষতান্ত্রিক এবং মিসোজিনিস্ট (নারী বিদ্বেষী) আচরণের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি একাই একশো’। যে থানাকে আমরা এড়িয়ে চলি নানাকারণে, তিনি নিজেই থানায় যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আসলে কথাটা এখানেই। কেউ যদি অপরাধী না হয়, তাহলে তার গলার স্বর এমনই উচ্চ হয়, এটা আবারও প্রমাণিত।

গত কয়েক বছরে একেকটা রোমহর্ষক ধর্ষণ এবং ধর্ষণপরবর্তি হত্যার ঘটনায় আমরা যখন দিশেহারা, একমাত্র লেখা ছাড়া যখন আমাদের হাতে কোনো অস্ত্রই নেই, ‘তখন এই মেয়েটির মতোন সাধারণের এইভাবে বৈপ্লবিক বেয়াদব হওয়া ছাড়া কোন উপায় দেখি না’।

এবং আমার ধারণা ও আশা যে, এই একটি ঘটনাই অনেক মেয়ের জন্য সাহসের প্রতিভূ হয়ে উঠবে।

(সারোয়ার তুষার এবং পাপলু বাঙালীর লেখা থেকে কিছুটা সংকলিত)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2K
    Shares

লেখাটি ৪,৪২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.