নারীশক্তির প্রতীক যখন একেকজন ‘দেবী’

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

ক্ষমতা আর নারীবাদ নিয়ে লেবু কচলানো আর দ্বিধা বিভক্তি দেখেশুনে তিক্ত-বিরক্ত আমি ভাবছিলাম এতোসব রথী মহারথীদের নিয়ে ভেবে আমার কাজ নেই। সব বাদ দিয়ে বরং “দেবী” চলচ্চিত্র দেখার পর আমার অনুভূতিটুকু লিখবো, যা ইতিমধ্যে আমার দুই কিশোরী কন্যার কাছে ব্যক্ত করেছি।

‘দেবী’ দেখে বা না দেখে যারা এটিকে ভৌতিক কাহিনী বা স্রেফ মিসির আলীর গল্প বলে ভাবতে চাইছেন, তাদেরকে নিরাশ করে বলতে চাই, এক কথায় “দেবী ” আসলে নারীশক্তির গল্প। যে সহজাত শক্তি নিয়ে প্রতিটি মেয়ে পৃথিবীতে জন্মায়।

দেবী নিয়ে ভাবতে ভাবতে ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটা ভেসে উঠলো মুঠোফোনের পর্দায়। রাজধানীতে মধ্যরাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় দুষ্কৃতকারী সদস্যের হাতে এক তরুণীর হেনস্থা হওয়ার ভিডিও। গভীর রাতে একটি মেয়ে একা পথ চলতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছে – এ সমাজের কাছে তা নতুন কোনো চিত্র না। কিন্তু এবারের চিত্রটি ভিন্ন মেয়েটির দৃঢ়তার জন্য। রাতারাতি টক অফ দ্যা টাউন হয়ে ওঠে অখ্যাত মেয়েটির সাহসিকতা।

তিন-চারজন পুলিশ সদস্য যখন তল্লাশির নামে তাকে ঘিরে ধরে, মুখের ওপর একটানা লাইট ফেলে সিনেমার খলনায়কের মতো অশালীন ভঙ্গিতে আপত্তিকর কথা বলে যাচ্ছিলো –

“এই আপনি কী বিশ্বসুন্দরী নাকি যে আপনাকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাবো? ”
“রাত কয়টা বাজে এখন? রাত আড়াইটার সময় কোনো ভদ্র ফ্যামিলির মেয়ে বাইরে থাকে? ”
“বেয়াদব মেয়ে। অভদ্র মেয়ে”
“বাড়ি থেকে কিছু শেখায়নি? ”
“আমি আপনাকে দেখবো”
“কোন মিনিস্টারের মেয়ে আপনি?”
“এ-ই ল্যাং মেরে থানায় নিয়ে যাবো”
“হোটেল থেকে নেমে আসছে আবার ঝাড়ি দেয়!”
“কালকে সকাল হলে দেখতে পারবেন পুলিশ ভদ্র না অভদ্র ”
(সিএনজি ড্রাইভারকে) “এই একে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যাবেন “…

যারা ভিডিওটা দেখেছেন তারা বলতে পারবেন ঠিক সেই মুহূর্তে কীভাবে একলা মেয়েটি আঙুল তুলে, গলা উঁচিয়ে বীরধর্পে ঘোষণা করেছে যে, সে বেয়াদব, অভদ্র। সে যদি সারারাত বাইরে চলাফেরা করে, হোটেল থেকে নেমে এসে থাকে তাতে তাদের সমস্যা কী?

মেয়েটির নাম, পরিচয়, পরিবার, পেশা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।
নারীবাদ বা সমঅধিকারের দাবীতে মেয়েটি কখনো দু’লাইন লিখেছে কিনা, কোনো আন্দোলনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছে কিনা তাও আমার জানা নেই। ছয় মিনিটের এই ভিডিও দেখে শুধু জানলাম,
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মেয়েটি ভয়ে, লজ্জায় সংকুচিত হয়নি। অনুনয় বিনয় দেখায়নি। কারো সাহায্য চায়নি।
বাবা -মা, মামা-চাচা – মন্ত্রী – আমলা – হোমড়া-চোমড়া কারো পরিচয় ব্যবহার করে ছাড়া পাবার চেষ্টা করেনি। উলটে নিজে থানায় যাওয়ার কথা বলেছে। পুরোটা সময় সে একা লড়ে গেছে। ক্ষমতার জোর সে দেখিয়েছে ঠিকই। সে ক্ষমতা একটি সাধারণ মেয়ের একা রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। শক্তি প্রয়োগ সে ঠিকই করেছে। সে শক্তি প্রতিবাদ ও প্রতিহত করবার শক্তি। তাকে স্যালুট জানানোর জন্য আপাতত এটুকুই যথেষ্ট বলে মনে করছি।

শুরুতে বলছিলাম হুমায়ূন আহমেদ রচিত “দেবী” উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র “দেবী” নিয়ে লিখবো। রিভিউ বলতে যা বোঝায় ঠিক তা নয়। অনম বিশ্বাস পরিচালিত দেবীর নির্মাণশৈলী, চিত্রগ্রহণ, গানের দৃশ্যায়ন, শিল্প নির্দেশনা, জয়া আহসানের অনবদ্য অভিনয়, শবনম ফারিয়া, ইরেশ যাকের এবং সুদর্শন অনিমেষ আইচের সুঅভিনয় নিয়ে নিশ্চয়ই অনেকেই লিখবেন।

জয়া আহসান তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ অক্ষুণ্ণ রেখেই চলেছেন। বহুল প্রতীক্ষিত মিসির আলী চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী অন্যমাত্রা এনে দিয়েছেন, তাও ফিরবে মানুষের মুখে মুখে। মিসির আলীর কথা অনুযায়ী পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই ঘটে যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু গল্পের রহস্যময়তায় লেখকের পরাবাস্তব কল্পনা ছাপিয়ে দেবী আমাদের কাছে নারীশক্তির এক অনন্য বার্তা পৌঁছে দেয়।

আমার কাছে আদতে দেবী কোনো অলৌকিক, অতিপ্রাকৃত আত্মার কাহিনী নয়, কোনো বিশেষ সময়ের নয়, সব সময়ের গল্প। গ্রামের প্রাচীন মন্দিরে দেবীমূর্তি দেখার আকর্ষণে বেড়াতে গিয়ে কিশোর বয়সে জালালউদ্দিন নামের এক পেডোফিল দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয় রানু। একদিন সে তার সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করে বাজে লোকটাকে।

তারপর থেকে রানুর জীবনে, আচরণে অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। ঘটনার ভয়াবহতা সে ভুলতে পারে না, নিয়ত বয়ে বেড়ায়। একজন ভালো মানুষের সাথে বিয়ে হয়, সংসার হয়। কিন্তু একা থাকলেই তাকে তাড়া করে ফেরে সেই দুঃসহ স্মৃতি, যার খবর কেউ রাখে না। ব্যাখ্যাতীত অনেক কিছু রানু দেখে, শোনে, আগে থেকেই বিপদ অনুমান করতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে তার এই কিছুটা অপ্রকৃতস্থ আচরণের কারণ বা সমাধান খুঁজে বের করতেই জীবন সহচর আনিস দ্বারস্থ হোন মিসির আলী সাহেবের। এক সময় মিসির আলীও জড়িয়ে যান রানু আর আনিসের জীবনের হ্যালুসিনেশনের সাথে।

রানুদের বাড়িওয়ালার মেয়ে নীলু নিজেকে তথাকথিত সমাজের চোখে কালো আর অসুন্দরী ভেবে খানিকটা গুটিয়ে থাকে নিজের ভেতরে। একটি ছেলের সাথে তার চিঠিতে যোগাযোগ হয় নিয়মিত (এখানে চ্যাটিং এর মাধ্যমে)। এদিকে রানু নিশ্চিত বিপদ দেখতে পায় নীলুর সামনে। নীলুকে বাঁচাতে মরিয়া রানু অসুস্থ হয়ে পড়ে।

গল্পের বিমূর্ত আকর্ষণ বা রহস্যময়তার রেশ রেখে দিতেই হয়তো মিসির আলী সবটুকু রহস্যের সমাধান খুঁজে পেতে চান না। কিন্তু কিশোর বয়সে পড়া দেবী উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন দেখা শেষে আমি আমার মতো করেই কূল-কিনারা খুঁজে নিই।

সাথে থাকা দুই কন্যাকে ব্যাখ্যা করি –
তুমি, আমি, আমরা – প্রতিটি মেয়ের মধ্যেই একেকজন শক্তিময়ী দেবীমূর্তি বাস করেন। দেবীতে মিসির আলী সেই সূত্রটিই ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করেন সম্ভবত।

জীবনের কোনো না কোনো সময় আমরা মনের সেই অদম্য শক্তিকে প্রয়োগ করার আশ্চর্য ক্ষমতা অর্জন করি। যেন কোনো দৈবশক্তি ভর করে আমাদের ওপর। যে শক্তির রহস্যের সমীকরণ মেলাতে খোদ মিসির আলীকেও হিমশিম খেতে হয় বৈকি!

মন্দিরের দেবীমূর্তি কিংবা রানু, নীলু আমি, তুমি আর ওই যে মাঝরাতে পুলিশের হেনস্থার শিকার অচেনা মেয়েটি – আমরা সকলেই সেই দৈবশক্তির অধিকারী। বিকৃতমনস্ক জালালউদ্দিনে কিলবিল করা সমাজে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন দেবী।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 459
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    459
    Shares

লেখাটি ১,০০১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.