কণ্টকময় কন্যাবেলা

0

সুমি রেক্সোনা পারভীন:

তখন শৈশবের প্রথম কাল।
কিছু নানা-দাদা শ্রেণির লোক ছিলেন,
যারা- ওররে আমার বউরে-
তোরে আমিই বিয়ে করবো-
মাগির কত দেমাগ, কথা কয় না-
এই শহুরে মাগি একটা পান নিয়ে আয়- ইত্যাদি বলে আদর (কখনো কোলে টেনে নিয়ে) করতেন। তাদের পেনিস আমাকে খোঁচা দেয়নি ঠিকই, কিন্তু এসব আদর আমাকে একদম আনন্দ দেয়নি, অত্যন্ত নোংরা লেগেছে। সব মেয়েরই লাগে হয়তো।

‘মাগো দুধ খাবো’ বলে বুকের কাছে মুখ নিয়ে আসা কোন চাচা-ফুফা-খালু-মামা সম্পর্কের কেউ এলে কী করে একটা শিশু! তাদের অসভ্যতায় কেঁদে ফেলাটাও এক সময় ভুলে যেতে হয়। আমার মুখে তখন গালি আসতে শুরু করেছে, তারা অবশ্যই সেটা আশা করেননি। ফলে মায়ের উপর বেয়াদবি শিক্ষার দায়। মায়েরও দায় এড়ানোর পালা- বহমান পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা।।
এটাকে কালচার বলে চালানোর ফাঁকিজুকি পরে বুঝেছি।

সুমি রেক্সোনা পারভীন

কেউ গাল টিপে দিলে তার গলা টিপে দিতে ইচ্ছে করতো। সে কেবলি ইচ্ছে, শিশু মুখের অভিব্যক্তি কী হতো তা আর কেউ দেখতেন কি না জানি না, তবে দাদী বা নানী আমার অস্বস্তি বুঝতেন। যতটা তারা বুঝতেন, কিশোরী মা ততটা নয়। তিনি তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পকর্ম নিয়েই অবসরে মগ্ন থাকতেন, অথবা চাষাবাদ করতেন। দাদী-নানী বা মায়ের কাছে অভিযোগ দিলে পাত্তা পেতাম না। দাদী-নানীরা বলতেন- উনিতো অমুক তমুক হোন। তোমাকে স্নেহ করেন- ইত্যাদি বলে পার পেতে চাইতেন। তাতে কাজ না হলে মার কাছে বলার চেষ্টা, উত্তরে ইঁচড়ে পাকা বলে ধমক, থাপ্পড়- মরে যেতে ইচ্ছে করতো। তখনই আবছা বুঝতে শিখে গেছি, সামাজিক সম্পর্কগুলো কতো ঠুনকো ইগোর উপর দাঁড়ানো।

সেই শিশুবেলায়ই খেলার দলে বিভিন্ন পুরুষবাচ্চা সঙ্গীগুলো ভীতির কারণ হয়ে উঠেছিলো। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝে নিতে হয়েছে, যদি দুর্ঘটনা কিছু ঘটেই যায়, তার দায় অবশ্যই আমার। হাড় মাংস জল হয়ে যাবে।

কতই বা বয়স তখন, আট কী দশ। এই বয়সের অভিজ্ঞতার কথায় ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলেছিলেন, কন্যা শিশু কোনো বয়সেই নিরাপদ নয়।

নিপীড়ক পুরুষে পরিণত হওয়া বাড়তি যত্নের মুখোশধারীগুলোকে বাড়ির আশেপাশে দেখা গেলে বিষাদে বিষিয়ে উঠতে উঠতে কবে বড় হবো সেই ভাবনায় আরেকটা দিন যেত। কত লোভ, কত আদরের হাতছানি – স্রেফ আমার অবিশ্বাসী মন তাতে টানেনি তাই অনেক রক্ষা পেয়েছি। অনেকে টেকেনি। তারচে আমার গাছের কাঠবিড়ালি, পাখির ছানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হয়ে উঠেছিলো। ঝামেলা মেয়েটা তখন মানুষের চোখে ‘গেছো’ ‘মদ্দা’ হয়ে উঠেছিল। বুনো কন্যা কারো যত্নের বস্তু না হলেও এর যে ভবিষ্যত খারাপ, সে বিষয়ে কারো সন্দেহ ছিলো না।

সেই গেছো-মদ্দা মেয়েটাই উলু বনে খাটাশ নেতা এক বর্বর লোকের মেয়ের বন্ধু হয়েছিলো। যিনি নিয়ম করে স্ত্রীকে পিটিয়ে তারপরে সেই স্ত্রীর সাথে শারীরিকভাবে মিলিত হতেন। যিনি তার কন্যার বয়সী মেয়েকে একা বাসায় পাওয়ার সুযোগে ধর্ষণের চেষ্টা করতে একটুও পিছপা হননি। তার হাতে কামড়ে দেয়ার বিবমিষা ভুলতে অনেকদিন লেগেছে। সেদিন আগুনে ভরা রিং এর মধ্য দিয়ে বান্দর যেভাবে লাফিয়ে বের হয়, তেমনি খেলার মাঠে যাওয়ার জন্য দেড় হাত বাই দেড় হাত কেটে রাখা কাঁটাতারের ফাঁকা দিয়ে লাফিয়ে বেরোতে পেরেছিলাম হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত ফেঁড়ে নিয়ে।

ইউনিফর্মে সবে পাজামা পরা শিখেছি, আদুল গায়ে তখনো জামা দিয়ে অভ্যস্ত নই, তাই স্লিভলেস সেমিজ পরে বিকেলে মাঠে যেতে হতো, বয়সের নিয়মে। সেই বয়সে, সেই বিভীষিকার দিনে পায়ে কাঁটার বদলে পাজামা কীভাবে ছিঁড়েছে, মাকে কী কৈফিয়ত দেবো, তাই নিয়েই দুশ্চিন্তা হয়েছিলো। অথচ এই লোককে আমরা মামা বলতাম, মা বলতেন ভাই। তারপরেও নানা ছলে ছুতায় তিনি আমাকেই ডেকে পাঠাতেন, ততোধিক ছল ছুতায় আমাকে পার পেতে হতো শাঁখের করাত থেকে। একদিকে মায়ের নির্মম শাসনের ভয়, অন্যদিকে নিশ্চিত ধর্ষণ। আমার কিশোরী বয়সে সেই পরিণত বুদ্ধির কৌশলগুলোকে এখনও স্যালুট জানাই।

আরও ছোটকালের কথা, বছর দুই কি তিন বয়সে- কোন এক কিশোর সঙ্গী জননাংগে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেয় আমার এক সমবয়সী মেয়ের। মেয়ের পরিবার কিন্তু ছেলেটিকে ধরে আচ্ছা করে কানমলা দিয়েছিলো। ছেলেটির মা যখন সেই ছেলের পক্ষে ঝগড়া করতে এলেন, আমার ‘বিহারী দিদি’- ওই নারীকে তার জননাংগে মরিচের গুঁড়া দেয়ার হুমকি দিলে সব ঠাণ্ডা হয়ে গেছিলো। ওই বুড়িটাকেই আমার বেশি আপন মনে হতো।

সেই পুচকে কালে এক ফুপা তার পিঠের ঘামাচি চুলকে দিতে বললে না করার পরে মায়ের যথা আদেশ, তিনি ফুপা, বড়দের সাথে বেয়াদবি করতে নেই। আমি দূর থেকে পা দিয়ে খামচে দিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পরে মা এই দৃশ্য দেখে তেড়ে এলেন। যথারীতি ঢাল হলেন বিহারী দিদি। শৈশবে তিনিই আমার হাত-পাগুলোকে মেরামত করে নারীর মতো নয়, মানুষের মতো করেছিলেন।

যারা প্রিভিলেজড, যারা এসব জানেন না, যারা পুতুপুতু নারীকে দেখতে চান, তারা কিশোরী আমার সাথে একবার ঘুরে এসেন, ক্যামন?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 552
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    552
    Shares

লেখাটি ৪,৩২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.