একজন নারীকে পুলিশের হয়রানি বনাম চলমান নারীবাদী আন্দোলন

0

সারোয়ার তুষার:

পুলিশ একজন তরুণীর মুখে লাইট মেরে তাকে বলছে, ‘অভদ্র’, ‘বেয়াদপ’, ‘অ্যাডিক্টেড’, ‘এমন কোন বিশ্বসুন্দরী না’, ‘কোন মিনিস্টারের মেয়ে?’, ‘হোটেল থেকে নেমে আসছে’, ‘র‍্যাম্পমডেলিং করতে যাবে মনে হয়’ ইত্যাদি। সেই তরুণী, “না, না, বিশ্বাস করুন, আমি অভদ্র নই, আমি ভদ্র, সুশীল ঘরের মেয়ে, আমাকে কলঙ্কিত করবেন না” টাইপের ন্যাকামি না করে স্পষ্ট পুলিশকে জানিয়ে দিচ্ছে, “হ্যাঁ, আমি অভদ্র, আপনাদের তাতে কী সমস্যা? চেক করতে আসছেন ব্যাগ চেক করেন। মুখের উপর থেকে লাইট নামান। কোন আইনে লেখা আছে রাত আড়াইটায় কোন মেয়ে বাইরে থাকতে পারবে না?”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ১৯৯৮ সালে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন চলছিল, তখন আন্দোলনকারী নারীদের ‘চরিত্রহীন’, ‘অশুচি’ বলে লেবেলিং করার চেষ্টা হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা ধর্ষকের সঙ্গিদের ধরে নেয়া ‘চরিত্রবান/চরিত্রহীন’, ‘শুচি/অশুচি’ মানদণ্ডকে আদর্শ ধরে নিয়ে নিজেদের ‘চরিত্রবান’, ‘শুচি’ প্রমাণ করতে যাননি, তারাও স্পষ্ট বলেছিলেন, আমরা ধর্ষকের বিচার চাই, ঠিক আছে, আমরা ‘অশুচি’।

ধরে নিলাম, ব্যারিস্টার মঈনুল মাসুদা ভাট্টিকে যৌনতার বিচারে ‘চরিত্রহীন’ বলেছিলন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে। যে লেবেলিং এ আপনাকে ঘায়েল করতে চায় প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগ একজন নার্ভাস আলোচক, আপনার তো উচিত সেই শব্দের স্টেরিওটাইপকেই প্রশ্ন করা। আপনার বলা উচিত কী পুরুষ কী নারী, দুর্নীতিবাজ, অসৎ, স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার পদলেহী, রাজনৈতিকভাবে দুর্বৃত্ত হলে, তিনি ‘চরিত্রহীন’ হতে পারেন। ‘চরিত্রহীন’ বলতে আমরা কেবল যৌনতার সাথে সংশ্লিষ্ট কোন ব্যাপার বুঝি না। একজন মানুষ নিজের পূর্ণ সম্মতিতে একাধিকজনের সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়েও সম্পূর্ণ সৎ, চরিত্রবান হতে পারেন। আবার একজন মনোগ্যামাস মানুষও ভীষণরকমের চরিত্রহীন হতে পারেন। ‘চরিত্র’ ধারণাটা ইটসেল্ফ খুবই আপেক্ষিক একটা ধারণা।

কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, একঝাঁক প্রতিভাবান, স্বনামধন্য সাংবাদিক-মানবাধীকারকর্মী-নারীবাদী, মঈনুল যে স্টেরিওটাইপ থেকে ‘চরিত্রহীন’ বোঝাতে চান, সেই স্টেরিওটাইপকেই আলিঙ্গন করে প্রতিবাদ কর্মসূচি ডাকলেন। যেন তারা বলতে চাইছেন, একজন ‘চরিত্রবান’ নারীকে কেন ‘চরিত্রহীন’ বলা হলো? যেন চরিত্রহীনকে টকশোতে চরিত্রহীন বললে সেটা যৌক্তিক ছিল! এই কারণে দেখলাম, তাদের সংবাদ সম্মেলনের ব্যানারে লেখা, “নারী সাংবাদিককে চরিত্রহীন বলায় প্রতিবাদ”।

আমি শতভাগ নিশ্চিত, এই ঘটনার আগে পরে মাসুদা ভাট্টি বা অন্য প্রতিবাদকারীদের কেউই ‘নারী সাংবাদিক’, ‘নারী মানবাধিকারকর্মী’ এইভাবে পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না। আর এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ, সচেতন কিম্বা অবচেতন যেভাবেই হোক, তারা ‘চরিত্রহীন’ বলতে যৌনতার দিক থেকে ‘চরিত্রহীন’ হওয়ার ধারণাকেই এন্ডোর্স করেছেন। তারা যেভাবে লিখেছেন, “ব্যারিস্টার মঈনুলকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে..” ; ঠিক একইভাবে কিন্তু লিখতে পারতেন, “সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলায়…”। সেটা তারা যেকোনো কারণেই হোক বলেননি। এমনকি একজন সাংবাদিককে ‘চরিত্রহীন’ বলা হয়েছে বলেও তারা প্রতিবাদ করতে পারতেন, সেটা না করে ‘নারী সাংবাদিক’ পরিচয় তাদের ধারণ করতে হয়েছে।

এ কারণেই আমার ঘোরতর সন্দেহ, প্রতিবাদকারী সাংবাদিক-মানবাধিকারকর্মী -নারীবাদীরা আসলে ‘চরিত্রহীন’ যে ডিসকোর্স আকারে চালু আছে বাংলাদেশে, অর্থাৎ যৌনতার একটা বিশেষ নর্মসকে আদর্শ ধরে নিয়ে অন্য যেকোনো নর্মসকেই ‘ব্যাভিচার’, ‘চরিত্রহীনতা’ মনে করা, সেটা নিয়ে তাদের আপত্তি তো নেই-ই ; উল্টো তারা সেই ধারণাটাই পোষণ করেন। তাদের আপত্তির জায়গাটা ছিল, একজন ‘ভালো’, ‘চরিত্রবান’ নারীকে কেন ‘চরিত্রহীন’ বলা হলো!

পুলিশি হয়রানি শিকার হওয়া সেই মেয়েটা কি এতো এতো নারীবাদী দার্শনিক তত্ত্বের সাথে পরিচিত? না হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। কিন্তু ওই মুহুর্তে তো তাঁর ভূমিকা যেকোনো নারীবাদীর চেয়ে বেশি নারীবাদী মনে হলো আমার। পুরুষতান্ত্রিক ঘিনঘিনে লেবেলিং এ আক্রান্ত বোধ না করে তিনি ওই লেবেলিংকেই গ্রহণ করেছেন নিঃসঙ্কোচে; ফলে পুলিশের ঘায়েল করতে চাওয়ার মানসিকতাই আক্রান্ত হয়েছে। যাকে বলে বুমেরাং পরিস্থিতি।

গত বছর ‘The Guardian’ পত্রিকায় একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম। সেটার শিরোনাম দিয়েই শেষ করি। শিরোনামের মর্মার্থ ভিন্ন বাস্তবতায় হলেও বাংলাদেশের জন্যও সত্যি:

“Working-class women are too busy for gender theory – but they’re still feminists.”

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 344
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    344
    Shares

লেখাটি ১,৫২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.