‘সত্য বলার সময়’ নির্ধারণের আমি বা আপনি কে!

0

সুষুপ্ত পাঠক:

এটা সত্য বলার সময় নয়? ব্লগে লেখার সময় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ ব্লগাররা নাস্তিকদের নছিয়ত করত সামনে ইলেকশান এখন ধর্ম নিয়ে লিখবেন না এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর দল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে বিএনপি-জামাতের মত স্বাধীনতা বিরোধীরা ক্ষমতায় চলে আসবে, বাংলাদেশকে ওরা বাংলাস্থান করে ফেলবে… ইত্যাদি। ‘আমার ব্লগে’ আমার আইডি খেয়েছিলো ডা. আইজুদ্দিন। একজন নাস্তিক ব্লগার বন্ধু আমার ব্যান উঠানোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে সুশান্ত দাস গুপ্ত’র (আমার ব্লগের মডু ছিলেন) সঙ্গে যোগাযোগ করলে উনি নিজের অপারগতা জানান। ‘ছাগু ফাইটাররা’ আমার লেখাকে নির্বাচনকালীন পার্টির জন্য অসুবিধার কারণ হতে পারে বলে মত দিয়েছিলো সেসময়।

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ এই আদর্শকে একটা কাল্টে পরিণত করে ফেলেছিলো ‘সিপি গ্যাং’ ‘এটিম’ নামের অনলাইন এক্টিভিস্টরা। ব্লগে আইডি খাওয়া ছিলো এখনকার সময় ফেইসবুকে রিপোর্টিং করার পিতামহ। এখন পিনাকীকে রিপোটিং গ্রুপ চালানোর জন্য দায়ী করা এইসব ছাগু ফাইটাররা ব্লগে মুক্তচিন্তক নাস্তিকদের ব্লগের আইডি খেয়ে ফেলত। আর গালি! কুৎসিত কুৎসিত গালি ছিলো তাদের অস্ত্র। তাদের শ্লোগানই ছিলো, ‘হ আমরা গালিবাজ, কোন সমস্যা?’ যুক্তি আর ইতিহাস নির্ভরতার পরিবর্তে গালি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ধরাশই করাই ছিলো শেষদিকে এই গ্রুপগুলোর মূল হাতিয়ার।

এখনো সেই পুরোনো কথা শুনতে পাই। Taslima Nasreen তসলিমা নাসরিনের নাকি উচিত হয়নি এই সময়ে এসে (সামনে নির্বাচন, নির্বাচনে লীগ হেরে গেলে স্বাধীনতা বিরোধীরা ক্ষমতায় চলে এসে বাংলাস্থান করে ফেলবে!) সত্য বলা। ব্রুনোরও উচিত হয়নি তার সময়ে সত্য বলা। বেসময়ে বলেছিলো বলেই তাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছিলো। এই যে ব্লগাররা নিজের জীবনটা দিলো ইসলামিকদের হাতে তারাও সত্যটা সঠিক সময়ে বলেনি?

সত্য বলার কি আসলেই কোন সঠিক সময় আছে? কেউ কি সত্য বলার জন্য সময়টা অনুকূল করে দিবে নাকি সত্য বলে বলেই সময়টাকে মানুষের অনুকূল করে নিতে হবে? তসলিমা নাসরিন আর মাসুদা ভাট্টির বর্তমান বিতর্কটা কেবল ব্যক্তিগত বলা যাবে না। একজন লেখকের যখন কোন বই নিষিদ্ধ করা হয় সেটা তখন ঐ লেখকের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না, কারণ এই সেন্সরশীপ চাপানো হয় মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর।

বইয়ের জবাব পাল্টা বই দিয়ে দিতে হবে, তাকে নিষিদ্ধ করে, পাঠককে পড়তে না দিয়ে নয়। মাসুদা ভাট্টি সেসসময় খুব বাজে একটা লেখা লিখেছিলেন তসলিমার আত্মজীবনী নিয়ে। তসলিম নাসরিনকে বাংলাদেশের কোন কাগজ তখন পর্যন্ত লিখতে দিতো না। এখনকার মত ফেইসবুক তখন এতোখানি ছড়ায়নি। কাজেই তসলিমা নাসরিনের উপর দেশের সুশীল সাহিত্যিকসহ সুশীল সমাজের গণহারে কুৎসার কোন জবাবই তিনি দিতে পারেননি।

এখন কিন্তু মাসুদা ভাট্টির উপর ‘চরিত্রহীন’ গালাগালাজের বিপক্ষে নারী সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ করছে। একটা সময় মাসুদা ভাট্টি বুঝতে পারবেন তিনি ‘নারী’ এই পরিচয়ে একজন ভিকটিম এবং সুযোগ পেলেই তার প্রিয় দলটিও তাকে নাস্তানাবুদ করতে ছাড়বে না। প্রয়োজনে তেঁতুলের বোঝাও যে নৌকা নেয় সেটি তো সামনে আছেই। একজন তসলিমা সাহস করে কথা বলেছিলো বলেই বাঙালী নারীর মুখের আড় ভেঙ্গেছিলো।

পুরুষতন্ত্রের শেখানো ‘মেয়েমানুষের মুখে এসব কথা মানায় না’ বলে বহু শতাব্দী ধরে নারী মুখ বন্ধ রেখেছিলো তার উপর চলা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের। নাসরিনকে সর্বদাই জ্ঞান দেয়া হয়েছিলো তিনি যা নিয়ে লিখছেন সেটা বলার সময় এখনো আসেনি, আগে মানুষের পেটের ভাত আর ন্যায্য মজুরিটা নিশ্চিত হোক, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলেই আপনাআপনি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে।

নাস্তিকদের যেমন বলা হয়, মানুষ শিক্ষিত হয়ে বিজ্ঞানমনস্ক হলেই সমাজ থেকে ধর্ম বিদায় নিবে অতএব অহেতুক এখন ধর্ম নিয়ে লিখে সাধারণ ধার্মীকদের ক্ষ্যাপিয়ে তুলে লাভ নেই। এই শ্রেণীটির কেবলই সময় হয়নি। সময় কী আপনাআপনি আসে, নাকি তাকে ছিনিয়ে আনতে হয়, সেটা ইতিহাস জানে। একজন বিদ্যাসাগর যদি সময়ের আশায় চুপ করে থাকতেন তাহলে কি কলকাতা শহরে শিক্ষিত সমাজে রেঁনেসা আসতো?

আমার মূল কথা হচ্ছে, এই সময়ে তসলিমার একথা বলা উচিত হয়নি- এরকম কিছুতে আড় হয়ে থাকার প্রতি। মাসুদা ভাট্টি ব্যক্তি ইস্যু হতে পারে- কিন্তু যখন সত্যটা একটা জাতির জন্য, একটা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তখন এই আড়টুকু প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। তাই এটাই জারি থাক, সত্য বলার জন্য কোন সময় নির্ধারিত নেই…।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 289
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    289
    Shares

লেখাটি ৮৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.