মাসিক বনাম ছুটি

ফারজানা আকসা জহুরা:

আজকাল অনেক মানুষকে দেখি যারা মাসিক বা ঋতুস্রাবের কারণে নামাজ পড়তে না পারায় খুব দুঃখ কষ্ট পান। তাদের দেখে আমি বেশ অবাক হই। ভাবি আহারে তারা কতোই না ধার্মিক যে নামাজে জন্য তাদের মন ছটফট করে!

অবশ্য আমি এতোটা ধার্মিক নই। আমার কাছে মাসিক বা ঋতুস্রাব খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটি নিয়ে আমার কোনো দুঃখ তো নেই, বরং আমি আনন্দিত। তাই তো পুরো মাস ঋতুস্রাবের অপেক্ষায় থাকি। মাসিক হলে আমি ছুটি কাটাই। ইচ্ছে মতো ঘুমাতে পারি। সময়ের কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম নেই! পুরো সময়টা উপভোগের একটি বিষয়!

খুব ছোটসময়ে যখন প্রথম মাসিক হয়েছিল, তখন ভেবে ছিলাম ছি: ছি: এটা কী হলো? নিশ্চয় আমি কোনো পাপ করেছি! এখন তো আমি অপবিত্র হয়ে গেলাম! এখন তো আর নামাজ কালাম কিছুই পড়তে পারবো না! তাহলে আমি আমার কী হবে? বেহেস্ত যাবো কীভাবে?

ধীরে ধীরে সেই ভুল ভেঙ্গেছে। তখন বরং মাসিক হলে আনন্দ করতাম। ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়াতাম! কখনোই মনে হয়নি আহারে কেন নামাজ পড়তে পারছি না! বরং নামাজ ও রোজা থেকে ছুটি পেয়ে স্বাধীনভাবে দিন কাটাতাম। মাসিকের দিনগুলি ছিল আমার কাছে খুব উপভোগের। অনেক নামাজি পুরুষকে দেখেছি আমাদের এই ছুটি দেখে হিংসে করতে!

আচ্ছা মাসিক হলে আপনার কী হয়? শরীরটা একটু খারাপ খারাপ লাগে, পেট ব্যথা করে, কারোর প্রচণ্ড পেট ব্যথা করে, সারাদিন রক্তক্ষরণ হয়, অস্থির অস্থির লাগে ইত্যাদি ইত্যাদি। তা এমন অসুস্থ অবস্থায় কি আপনার ইচ্ছে করে ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে দিনে ৫’বার কাপড় পাল্টিয়ে পাল্টিয়ে নামাজ পড়তে?

নারে ভাই, আমার কিন্তু একটুও ইচ্ছে করে না। বরং আমি খুব খুব খুশি যে এই সময় আমাকে যাবতীয় ধর্ম কর্ম থেকে ছুটি দেয়া হয়েছে দেখে।
এখন আপনি বলবেন; মাসিকের সময় নাকি মেয়েদের অপবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে বলেই নাকি এই ছুটি!

ও তাই? আসলেই এই জটপাকানো ব্যাপারটা আমি কখনোই বুঝতে পারি না! আমি জানি মানুষ তো তার কর্মের দ্বারা পবিত্র অপবিত্র হয়। মাসিকের জন্য কীভাবে সেটা সম্ভব?

তা, আপনারা কি কখনো মাসিকের রক্ত খেয়েছেন? সেই মাসিকের রক্ত ভেজা কাপড় পরে সারাদিন ইচ্ছে করে ঘুরে বেড়িয়েছেন? কিংবা রক্ত মাখা অবস্থায় দিনের পর দিন থেকেছেন?

না, জানি, আপনারা এগুলি কিছুই করেননি। কারণ একজন সুস্বাস্থ্য সবল মানুষ সময় ও প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকলে ঘন্টা ঘন্টায় কাপড় পাল্টায়। কারণ এসব না করলে মানুষ রোগগ্রস্ত হতে পারে। তা ধর্মে যদি সেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথা তাদের ভাষায় বলে থাকে, তাহলে কি খুব অন্যায় কিছু বলেছে?

দেখুন ধর্মের হাজার হাজার বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা যায়। কিন্তু শরীরের অসুস্থায় কেন নামাজ রোজা রাখতে মানা, এমন উদ্ভট বিষয় নিয়ে কথা বলা খুবই হাস্যকর। এতো নামাজ পড়তে ইচ্ছে করলে যান সব কাজকর্ম দুনিয়াদারি বাদ দিয়ে জায়নামাজ নিয়ে বসে থাকেন। আপনাদের কেউ মানা করেনি। দয়া করে সেই নামাজের বোঝা আমাদের উপরে চাপিয়ে দিবেন না।

ফ্রান্স

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.