এটাও সত্যি ঘটনা

0

তামান্না ইসলাম:

কর্পোরেট অফিসে যারা কাজ করেন তারা নিশ্চয়ই কিউব কালচারের সাথে পরিচিত। হালকা পার্টিশন দিয়ে মুরগির খোপের মতো একেকটা খোপে একেকজন মানুষ বসে একটা টেবিল, একটা চেয়ার আর কম্পিউটার নিয়ে। কোন কোন সময় পার্টিশনের উচ্চতা এক মানুষ সমানও হয় না। এই কিউবের হালকা পার্টিশনগুলো প্রাইভেসির বারোটা বাজিয়ে দেয়।

আজকের গল্পটা সেরকম এক ঘটনাকে নিয়েই।

আমি তখন একটা নতুন কিউবে এসেছি। কিউবের অপর পাশে কে বসে তাদেরকে চিনি না। তারা অন্য টিমের লোক। তাই পরিচয় হওয়ার কোন সুযোগ বা প্রয়োজন কিছুই হয়নি। কিন্তু দু চার দিন যেতেই আমি লক্ষ্য করলাম, ওই টিমের লোকজন সারাক্ষণই ফোনে মিটিং করে। প্রচণ্ড বিরক্তিকর ব্যাপার।
পার্টিশনের এপাশে আমার কান ঝালাপালা, কাজে মনোযোগ দেওয়ার কোনো উপায় নেই। আর এই ব্যাপারে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে আমার ঠিক উল্টো পাশের মেয়েটি। এই মেয়ে প্রচণ্ড জোরে কথা বলে। তবু রক্ষা গলার স্বর কর্কশ নয়। বেশ মিষ্টি। মেয়েটির অফুরন্ত প্রাণ শক্তি আর ভীষণ ধৈর্য্য। সকাল ৮ টা থেকে শুরু করে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত এই মেয়ে ধৈর্য্য সহকারে মিটিং করে। হাসিমুখে কথা বলে। আমার কাজে অসুবিধা হয় বলে আমার ওর মিষ্টি উচ্ছ্বসিত হাসি শুনলেও মাঝে মাঝে মাথা গরম হয়ে যায়।
মিটিং শুরুর আগে সে যখন মিনিট পাঁচেক সৌজন্য বিনিময় করে তখনও বিরক্তি লাগে।

বলে রাখা ভালো, আমি আই ফোন, হেড ফোন জেনারেশনের মানুষ না বলে সারাদিন হেড ফোন কানে দিয়ে বসে থাকতে পারি না। তার মধ্যে এই মেয়ের হাসি রোগ আছে। সে কারণে-অকারণে এমন জোরে হেসে ওঠে, ঝর্নার মতো হাসির শব্দ, কিন্তু কাজের চাপে বিরক্ত আমার মাঝে মাঝেই মনে হয় ‘এতো হাসি আসে কোথা থেকে?’

একদিন লাঞ্চে শুনি মেয়েটি কার সাথে যেন কথা বলছে, কেমন চাপা আতঙ্ক গলায়।
“না না, ওর বাবা আসলে ওকে দেবে না। আমাদের কার কোন দিন, আর দায়িত্ব ভাগ হওয়া এগুলা নিয়ে আরও কথা বলতে হবে।’

আমি এতোদিনে জেনে গেছি মেয়েটার একটা ছোট্ট মেয়ে আছে। বুঝে গেলাম, মেয়েটার স্বামীর সাথে সম্পর্ক নেই। এবং বাচ্চার অধিকার বা দায়িত্ব নিয়ে প্রাক্তন স্বামীর সাথে গোলমাল আছে। সম্ভবত সে বাচ্চার স্কুল বা ডে কেয়ারের সাথে কথা বলছিল। এই প্রথম আমার মেয়েটির জন্য বুকের মাঝে কোথায় যেন একটু কষ্ট হলো।

ডিভোর্সড বলে না, হয়তো ডিভোর্সের কারণে সে একটি অপেক্ষাকৃত খারাপ জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছে। আমার কষ্ট হচ্ছিল, একা একা সে এতো ছোট একটা বাচ্চাকে বড় করছে, এটা সহজ কাজ নয়। তার উপরে যদি থাকে বাচ্চা নিয়ে টানাটানি, এটা বাচ্চার জন্যও ক্ষতিকর। সেদিন ওর গলাটা ছিল একদম আলাদা। এরপর মাঝে মাঝেই শুনতাম ও কলিগদের কাছে গল্প করছে, বাচ্চা অসুস্থ ছিল, সারা রাত জেগেছে, তাই খুব ক্লান্ত।

একদিন শুনলাম বাচ্চার বেবি সিটার ফোন করেছে। বাচ্চা খুব কাঁদছে, কিছু বলছে না। সেদিন মেয়েটার গলা ছিল খুব অসহায়। ছোট্ট মেয়েকে ফোনে বার বার বুঝাচ্ছে, মায়ের মিটিং আছে, মা তো এখন যেতে পারবে না। বাচ্চার এক কথা, সে এই আন্টির কাছে থাকবে না। মেয়েটি বার বার নিজের শিশু সন্তানের কাছে আকুতি করছে, ‘এই আন্টির কাছে আরেকটু থাকতে। মা এসে একটু পরে নিয়ে যাবে।’

সেদিন সেই অচেনা মেয়েটির জন্য আমার চোখে পানি আসছিল। ওর অসহায়ত্ব আমি জানি। আমার স্বামী থাকা সত্ত্বেও এমন হয়েছে, সে আমাকে বলে গেছে সে খুব ব্যস্ত কোন কাজে। আমি হয়তো মিটিঙে, তখন বাচ্চার স্কুল থেকে ফোন এসেছে, পেটে ব্যথা, বা জ্বর। কী যে অসহায় সেসব মুহূর্ত! একমাত্র চাকরিজীবী মায়েরাই জানে, আর সেই মা যদি হয় সিঙ্গেল, তার চেয়ে অসহায় আর কেউ নেই।

এরপরে একদিন শুনলাম এক ভয়ঙ্কর কথা। মেয়েটি কার সাথে যেন ওর বাচ্চা নিয়ে আলাপ করছে। মনে হলো ওর প্রাক্তন স্বামী। বাচ্চাটা আগের দিন ছিল ওর বাবার কাছে। মা বেশ ভয়ে ভয়ে জানতে চাচ্ছে, ‘তুমি ওকে বাথরুমে বা আলমারিতে আটকে রেখে শাস্তি দাওনি তো?’

এদেশে শিশু নির্যাতনের আইন যথেষ্ট কড়া। এই ঘটনা পুলিশ জানলে বাচ্চার বাবার জেল না হলেও অন্তত সে তার বাচ্চাকে কাছে পাবে না আর কখনোই। তার পরেও মেয়েটি কেন পুলিশকে সেটা জানায়নি? আমি অনেক ভেবেও এই প্রশ্নের উত্তর পাইনি।

পুরনো প্রেম? নাকি বাচ্চাকে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করতে চায় না? কিন্তু এতো স্নেহ নয়। নির্যাতন! কী বিচিত্র মেয়েদের জীবন! হোক সেটা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে, জাতি, ধর্ম, দেশ নির্বিশেষে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 364
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    364
    Shares

লেখাটি ৪,৩২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.