এই বাদানুবাদের ফসল কাদের ঘরে উঠবে?

0

সুপ্রীতি ধর:

একাত্তর টিভির টকশোতে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির সাথে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের অসদাচরণের প্রতিবাদে যখন তীব্র প্রতিক্রিয়া চলছে, সংবাদ সম্মেলন করে মঈনুল হোসেনকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে, মানববন্ধনে গ্রেপ্তারের দাবি থেকে শুরু করে বিষয়টি যখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, ঠিক এমন সময়ই মাসুদা ভাট্টির দিকে অভিযোগের আঙ্গুল উঠিয়েছেন নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। ঘটনার মোড় যেন অন্যদিকে ঘুরে গেছে এর মধ্য দিয়েই।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনি মাসুদা ভাট্টির বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগ তুলে ধরে বলেছেন, ‘মাসুদা ভাট্টি একটা ভীষণ রকম চরিত্রহীন মহিলা’। এটা বলার পিছনে তিনি বেশকিছু কারণের কথাও উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে মাসুদা ভাট্টিও ফেসবুকে আলাদা পোস্ট দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।

কথা হচ্ছে, এই যে ঘোট পাকালো বিষয়টার, এতে করে কারা লাভবান হবে? ব্যারিস্টার মঈনুলের বিরুদ্ধে যখন একজন নারীকে অপদস্থ করার অভিযোগ উঠলো, নারীবাদ-পুরুষতন্ত্র সবকিছুকে মুখোমুখি করা হলো, সমগ্র জাতি যখন তাকিয়ে আছে, এবার বুঝি পুরুষের দাপট কিছুটা হলেও কমবে, ঠিক তখনই আরেকজন স্বনামধন্য নারীর কাছ থেকে এরকম একটি আঘাত আসায় পুরো বিষয়টিই যেন খেলো হয়ে দাঁড়ালো। মঈনুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটা যেন তার ওজন হারিয়ে ফেললো। ঘটনার আকস্মিকতায় আন্দোলনকারীরা বিহ্বল হয়ে পড়লো। দ্বিধাদ্বন্দ্বের দোলাচলে দুলতে থাকা এ অবস্থার সুযোগটা লুফে নিল অন্য একটি পক্ষ, যারা প্রথম থেকেই মঈনুল তথা সমগ্র পুরুষকুলের প্রতিনিধি হয়ে নিজেদের তাগিদেই নারীদের একহাত দেখে নেওয়ার ব্রত নিয়ে মাঠে নেমেছিল।

তসলিমা নাসরিন ও মাসুদা ভাট্টি

পুরো অনলাইন সমাজ আজ দ্বিধাবিভক্ত। যদিও বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে, ব্যারিস্টার মঈনুল টকশোতে প্রকাশ্যে মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলে খুবই গর্হিত কাজ করেছেন, সেজন্য তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করায় কোনো দ্বিমত থাকার কথা না কারোরও, তথাপি বিষয়টিকে নিয়ে যেভাবে লাফালাফি শুরু হয়েছে, লেবু চিপার মতোন করে কচলানো হচ্ছে, রাজনীতিকরণ হচ্ছে, একটা দলের ব্যানারে মানববন্ধন করে ব্যারিস্টার মঈনুলকে গ্রেপ্তারের দাবিও জানানো হয়েছে, তাতে করে শেষপর্যন্ত বিষয়টা এখন কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বলা মুশকিল। মানুষের সেন্টিমেন্ট বেশিক্ষণ ধরে রাখা সম্ভব হবে না বলেই আমার আশংকা। এবং অধিকাংশ মানুষ বিগড়ে গেলে তা হিতে বিপরীতই হবে।
অন্যদিকে, তসলিমা নাসরিন যে অভিযোগ করেছেন মাসুদা ভাট্টির বিরুদ্ধে, এটা পুরনো অভিযোগ। আগেও শুনেছি, তখনও বিশ্বাস করেছি। যে ভাষা তখন মাসুদা ব্যবহার করেছিলেন তসলিমার বইয়ের সমালোচনা করতে গিয়ে, কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এমন সমালোচনা করা আদৌ সম্ভব কীনা, তা আমার ক্ষুদ্র জানায় কুলোয় না। এরকম একটি মন্তব্যের কোনো ক্ষমা কখনও হয় কীনা, তাও জানা নেই।

সুতরাং এটুকুই বলতে পারি যে, প্রকৃতির শোধ বলে যে একটা বিষয় আছে, তার ফল সবাইকেই কখনও না কখনও ভোগ করতেই হয়, মাসুদারও সময় হয়েছে তা শোধ করার। এখন সে কীভাবে তা শোধ করবে এটা তার একান্ত নিজস্ব। তবে বিশ্বাস যে, তার পিছনে যেহেতু ক্ষমতা আছে, সে পার পেয়ে যাবে। আবারও কথা হলো, মাসুদা না হয় পার পাবে, আমরা যারা সাধারণ মানুষ ছোট ছোট ভাগে আন্দোলন করছি নারীর হয়ে, নারীর জন্য, আমাদেরকে তো পথে বসিয়ে দেবে। আমরা যতোটা এগিয়েছিলাম, ঠিক ততোটাই পিছিয়ে যাবো এই রেষারেষির কবলে পড়ে।

আমরা যারা যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাঠে নামি, কলম ধরি, যারা আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধাভোগী নই, কোনও দলের কথা যাদের বিবেচনায় রেখে আন্দোলন করতে হয় না, আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে অপমান করা হলো দুই পক্ষ থেকেই। ব্যক্তিগত ক্ষোভ-অভিমান আমাদের সামষ্টিক আন্দোলনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালো। আজ যারা তসলিমা এবং মাসুদা দুজনকেই ‘চরিত্রহীন’ বলছে, তাদের হাতে এই রসদ তুলে দেয়ার জন্য আমি দুজনকেই দায়ী করবো। আমরা কেন সহ্য করবো এ ধরনের কথা? কেন আমরা তামাশায় পরিণত হলাম আজ?

লেখক: সুপ্রীতি ধর

আপনারা নারীবাদের কথা বলেন, কিন্তু এর বারোটা বাজিয়ে দিলেন নিজেরাই। দুজনেই ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে আমাদের এতোদিনের তিলে তিলে গড়ে তোলা আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন।

মাসুদাকে বলবো, আপনি একজন সুবক্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক। টকশোতে নারী সাংবাদিক হিসেবে যান না, সেদিনও যাননি। তাহলে কেন ‘নারী সাংবাদিক’ হিসেবে ট্রাম্প কার্ডটা খেললেন? কেন সব নারীদের জড়ো করলেন এই ইস্যুতে? বিষয়টা তো সবার ছিল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, এবং সেভাবেই এটা মোকাবিলা করা যেতো। যা যা দাবি করা হচ্ছে, সবই আদায় করা যেতো নিজের অবস্থানটাকে শক্ত রেখেই। এতো বহুলভাবে ‘নারী’ শব্দটাকে ব্যবহার করে প্রকৃত অর্থে নির্যাতিত-নিপীড়িত নারীদেরই ভালনারেবল করে ফেলা হলো।

পাঠকদের জন্য দুইজনের বক্তব্যই এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো।

তসলিমা নাসরিনের অভিযোগ:

কে মইনুল হোসেন, কী করেন, কী তাঁর চরিত্র, কী তাঁর আদর্শ আমি জানি না, তবে জানি মাসুদা ভাট্টি একটা ভীষণ রকম চরিত্রহীন মহিলা। চরিত্রহীন বলতে আমি কোনওদিন এর ওর সঙ্গে শুয়ে বেড়ানো বুঝি না। চরিত্রহীন বলতে বুঝি, অতি অসৎ, অতি লোভী, অতি কৃতঘ্ন, অতি নিষ্ঠুর, অতি স্বার্থান্ধ,অতি ছোট লোক। মাসুদা ভাট্টি এসবের সবই।

মহিলাটির জন্য ১৯৯৬ বা ১৯৯৭ সালে আমার কাছে খুব করে আব্দার করেছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। লন্ডন থেকে স্টকহোমে আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘মাসুদা ভাট্টি বাংলাদেশের মেয়ে। এক পাকিস্তানি লোককে বিয়ে করে এখানে ছিল। পাকিস্তানির সঙ্গে তালাক হয়ে গেছে। এখন ব্রিটেন থেকে ওকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন তুমিই একমাত্র বাঁচাতে পারো ওকে। ওর জন্য ব্রিটিশ সরকারকে একটা চিঠি লিখে দাও। লিখে দাও মাসুদা ভাট্টি বাংলাদেশে তোমার পাব্লিশার ছিল, তোমার জন্য আন্দোলন করেছে। ও যদি এখন দেশে ফিরে যায়, ওকে মেরে ফেলবে মৌলবাদিরা’।

আমি বললাম, ‘মহিলাকে আমি চিনিই না। আর আপনি বলছেন ও আমার পাবলিশার ছিল? আমি মিথ্যে বলি না। আমি মিথ্যে কথা বলতে পারবো না।’ এরপর ওই মহিলা আমাকে ফোন করে কান্নাকাটি, আমাকে বাঁচান। আপনি না বাঁচালে আমি মরে যাবো জাতীয় কান্না। কাউকে কাঁদতে দেখলে নিজের চোখেও জল চলে আসে। ব্রিটিশ সরকারের কাছে মাসুদা ভাট্টিকে না তাড়ানোর জন্য অনুরোধ করলাম। মহিলার জন্য মিথ্যে কথা আমাকে লিখতে হলো, লিখতে হলো, আমার পাবলিশার ছিল সে, দেশে ফিরলে তাকে মেরে ফেলবে মৌলবাদিরা। তখন আমার খুব নাম ডাক। আমার চিঠির কারণে মাসুদা ভাট্টির পলিটিক্যাল এসাইলাম হয়ে গেল, ব্রিটেনের নাগরিকত্বও হয়ে গেল।

তারপর কী হলো? তারপর ২০০৩ সালে আমার আত্মজীবনীর তৃতীয় খণ্ড ‘ক’ যখন বাংলাদেশে বেরোলো,আমি কেন নারী হয়ে দেশের এক বিখ্যাত পুরুষের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করেছি, আমি কেন নারী হয়ে নিজের যৌনতার কথা লিখেছি, সারা দেশের নারী-বিদ্বেষী আর ধর্মান্ধ মৌলবাদি গোষ্ঠি উন্মাদ হয়ে উঠলো আমাকে অপমান আর অপদস্থ করার জন্য, আমাকে অবিরাম অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালি তো দিতেই লাগলো, আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে শুরু করলো, সেই মিছিলে সামিল হলো মাসুদা ভাট্টি।

আমার বিরুদ্ধে এ যাবৎ প্রচুর কুৎসিত লেখা লিখেছে লোকে, সর্বকালের সর্বকুৎসিত লেখাটি লিখেছে মাসুদা ভাট্টি। সবচেয়ে জঘন্য, সবচেয়ে অবিশ্বাস্য, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সবচেয়ে বীভৎস সে লেখা। এত ভয়াবহ আক্রমণ আমার চরমতম শত্রুও আমাকে কোনওদিন করেনি। ক বইটি নাকি ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে শরীরে ঘিনঘিনে ঘা ওলা রাস্তায় পড়ে থাকা এক বুড়ি বেশ্যার আত্মকথন।

মাসুদা ভাট্টি আমার উপকারের জবাব ওভাবেই দিয়েছিল। ও যদি চরিত্রহীন না হয়, দুনিয়াতে চরিত্রহীন কে?

আজ দেশের ৫৫ জন বিশিষ্ট সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির পক্ষে লড়ছেন কারণ কেউ তাকে চরিত্রহীন বলেছে। যত অশ্লীল শব্দ বাক্য পৃথিবীতে আছে, তার সবই আমার বিরুদ্ধে উচ্চারিত হচ্ছে নব্বই দশকের শুরু থেকে। আমি তো জনপ্রিয় কলাম লেখক ছিলাম তখন, জনপ্রিয় লেখক ছিলাম, কই কোনও বিশিষ্ট সম্পাদক আর কোনও সিনিয়র সাংবাদিককে তো আমার বিরুদ্ধে হওয়া লাগাতার অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ করতে কোনওদিন দেখিনি।

আমার মাথার দাম ঘোষণা করা হলো, আমার বিরুদ্ধে লক্ষ লোকের লং মার্চ হলো, আমার ফাঁসির দাবিতে সারাদেশে দিনের পর দিন মিছিল হলো, সরকার একের পর এক আমার বই নিষিদ্ধ করলো, আমার মত প্রকাশের বিরুদ্ধে মামলা করলো, আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিল, কই দেশের কোনও সম্পাদক বা সাংবাদিক কেউ তো টুঁ শব্দ করেনি। এই যে আজ ২৪ বছর আমাকে অন্যায়ভাবে কোনও সরকারই দেশে ফিরতে দিচ্ছে না, কোনও বিশিষ্ট জন তো মুখ খোলেন না। একজনের বেলায় বোবা, আরেকজনের বেলায় বিপ্লবী, এ খেলার নাম কী”?

এবার দেখে আসি মাসুদা ভাট্টির প্রতিক্রিয়া:

“তসলিমা নাসরিনকে আমি ধন্যবাদ জানাই, কারণ তিনি এরকম একটি মোক্ষম সময়কে বেছে নিয়েছেন আমার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষোভকে প্রকাশ করে ২০ বছর আগে দেয়া আমার একটি বক্তব্যের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।

যে সকল ঘটনার উল্লেখ তিনি করেছেন তা ২০০০ সালের এবং তিনি সত্যিই আমাকে চিঠি দিয়েছিলেন কারণ তখন আমাকে ব্রিটেন থেকে বের করে দেওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। একটি আলোচিত সাক্ষাতকার গ্রহণের পর থেকে আমার সে দেশে টিকে থাকা মুস্কিল হয়ে পড়েছিল এবং তখনও অনেক সাংবাদিক আমার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, এখন যেমন দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তসলিমা নাসরিন কখনোই আমাকে তার পাবলিশার হিসেবে চিঠি দেননি, দিয়েছিলেন তার একজন ‘ফ্যান’ বা সমর্থক হিসেবে বর্ণনা করে। খুঁজলে সে চিঠি আমি নিশ্চয়ই পাবো।

যখন তার প্রথম আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘ক’ বের হলো তখন এই বই নিয়ে প্রচারণার অংশ হিসেবেই আমি একটি পুস্তক সমালোচনা লিখি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, আমার তখন নারীবাদ, নারীর প্রতি সহিংসতা, উদারনৈতিক ও সমতাভিত্তিক সমাজব্যাবস্থা সম্পর্কে খুব বেশি একাডেমিক লেখাপড়া ছিল না। আমি সমালোচনায় বইটি সম্পর্কে এই কথাই বলতে চেয়েছিলাম যে, একজন ব্যক্তির সঙ্গে আরেকজন ব্যক্তির স্বেচ্ছা-সম্পর্কের দায় দু’পক্ষের সমান এবং তা প্রকাশের আগে অন্যপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন পড়ে – ‘ক’ বইটি পাঠে আমার তা মনে হয়নি। প্রায় কুড়ি বছর আগের লেখা এবং সেখানে আমি তসলিমা নাসরিনকে কোনো ভাবেই ব্যক্তিগত কোনো আক্রমণ করিনি। করতে পারি না কারণ আমি সবসময় একথাই বলে এসেছি যে, আজকে যে আমরা মেয়েরা অনায়াস-লেখা লিখতে পারছি তার মূলপথ আমাদের জন্য উন্মুক্ত করেছেন তসলিমা নাসরিন। অথচ গত কুড়ি বছর যাবত তসলিমা নাসরিন অন্ততঃ কুড়িবারেও বেশি এই প্রসঙ্গে আমাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন তার প্রকাশিত বইতে, লেখায় এবং তার ও আমার জানাশোনা ব্যক্তিবর্গের কাছে।

২০০০ সালের পরে অসংখ্য লেখায় আমি তসলিমা নাসরিনের প্রশংসা করেছি এবং সে কারণে আমাকে সমালোচকরা ‘নতুন তসলিমা নাসরিন’ আখ্যা দিয়ে আমার বিচার, অপমান এবং ফাঁসিও চেয়েছে। তসলিমা নাসরিন এসব কথা কখনও উল্লেখ করেননি, তিনি সব সময় গত কুড়ি বছর ধরে বহুবার, বহু জায়গায় আমার এই পুস্তক-সমালোচনার কথা উল্লেখ করে আমাকে চরম আঘাত করেছেন। আমি বিরত থেকেছি জনসমক্ষে কিছু বলা থেকে কিন্তু তসলিমা নাসরিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছে আমি বহুবার একথা বলেছি যে, তার বইয়ের সমালোচনায় আমি যা বলেছি সেটা একেবারেই তার বইয়ে সন্নিবেশিত তথ্যের সমালোচনা, তার ব্যক্তি-সমালোচনা নয়। আমি একথা ২০০৩ সালেই প্রকাশ্যেও লিখেছি, এমনকি যখন তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তখন আমি প্রতিবাদ করেছি, লেখকের বিরুদ্ধে মামলা বা বই নিষিদ্ধের দাবীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছি। আমার সেসব প্রতিবাদ, প্রতিরোধ সব ভেসে গেছে, থেকে গেছে কেবল সমালোচনাটুকু। এমনকি এই সেদিনও বাংলা একাডেমীতে আয়োজিত লিট ফেস্ট ২০১৭ তে আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছি যে, তিনি আমাদের পুরোধা লেখক যিনি পথ দেখিয়েছেন, অনেক শব্দকে ছাপার অক্ষরে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, তিনি মুক্ত করে দিয়েছেন।

তসলিমা নাসরিনের প্রতি আমার কোনো ধরনের বিদ্বেষ, রাগ কখনোই ছিল না। বরং আমার দুঃসময়ে তিনি পাশে ছিলেন সেটা আমি ভুলিনি। তাই বলে তার প্রকাশিত বইয়ের সমালোচনা আমি করতে পারবো না সেটাতো হতে পারে না। হতে পারে তিনি মনে করেছেন যে, আমার সমালোচনাটি কুৎসিৎ ব্যক্তি আক্রমণ, কিন্তু আমি নিজে জানি যে, তখনও আমি সেটা করিনি আর এখনতো আরও করবো না। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি একটি লেখার জন্য আমাকে ক’বার শাস্তি দেবেন? এরতো কোথাও না কোথাও একটা শেষ হতে হবে, নয়? হয়তো এবারই সেই চরম শাস্তিটুকু তিনি আমায় দিলেন। আমি মাথা পেতে নিলাম।

তসলিমা নাসরিন তার মতামত দিয়েছেন আমার সম্পর্কে। আমি সে সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা দিতে পারি মাত্র, এর বেশি আর কীই বা করতে পারি? তবে এমন একটি সময়কে ২০ বছর আগে লেখা সমালোচনার (যার জন্য বহুবার তিনি প্রকাশ্যে আমায় গাল দিয়েছেন) জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন যখন আমি কেবল আক্রান্তই নই, আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নটিও তিনি আমলে আনেননি, আমার চেয়ে তার এই নিরাপত্তা-সংকটের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি বোঝার কথা ছিল। আজকে তার দেওয়া চারিত্রিক সার্টিফিকেট নিয়ে যারা আমাকে তুলোধনুা করছেন তারাই প্রতিদিন তার মাথা চায়, নোংরা আক্রমনে জর্জরিত করে, কখনও বা তাকে দেশছাড়া করতে চায়। কিন্তু আজ আমার বিরুদ্ধে তারই দেওয়া ‘ভীষণ চরিত্রহীন’ তকমার করাত দিয়ে আমাকে টুকরো টুকেরো করছে। জানি না, এতে কার লাভ কী হলো? কিন্তু কিছু একটা হলো নিশ্চয়ই।

এরকম একটি চরম সংকটকালে যখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কবলে থেকে একদল মানুষ ন্যয়ের জন্য লড়ছে, তখন মঈনুল হোসেনের দেওয়া তকমা “চরিত্রহীন”-কে একটি “ভীষণ” শব্দ জুড়ে দিয়ে আমার চরিত্রের সার্টিফিকেট-কে আরো শক্ত করেছেন তসলিমা নাসরিন – আমি এ জন্যও তার কাছে কৃতজ্ঞ। অগ্রজ লেখক হিসেবে হয়তো এটুকুই আমার প্র্রাপ্য তার কাছে”।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 751
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    751
    Shares

লেখাটি ৪,২২৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.