আইয়ুব বাচ্চু – নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে

0

কাজী রোকসানা রুমা:

এ এক অপরাধী শ্রোতার বয়ান। গত রাত যার নির্ঘুম কেটেছে।

(কোথা থেকে শুরু করবো ভেবে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছি আমার ছোটবেলায়)
কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আব্বার মনে হতো বাসায় টিভি, ক্যাসেট রাখলে আমাদের পড়ালেখাটা পণ্ড হবে। তাই বাসায় টিভি আসতে ম্যালা বছর লেগে গেলো। আমি তখন ক্লাস সিক্স এ। সাদা কালো টিভি। মধ্যবিত্ত জীবনের মতো স্টুডেন্ট হিসেবেও আমি বরাবরই মধ্যবিত্ত। টিভি না থাকলেও পড়ালেখায় উচ্চবিত্ত হতাম বলে আমি বিশ্বাস করি না।

ক্লাস এইটে উঠে দাবড়িয়ে খেলাধুলা নিয়ে পড়ে থাকলাম। সবাই যখন টিফিনের ফাঁকে আড্ডা দেয়, কৈশোরের জানালার ধারে বসে রাস্তায় ইচ্ছাকৃত এলামেলো হেঁটে বেড়ানো কিশোর, যুবকের আনাগোনা দেখে, আমরা কজন তখন বল হাতে মাঠ মাতাই। স্কুল শুরুর আগে, ছুটির পরে আমাদের হাতে শুধু বলের আকার পরিবর্তন হয়। কখনো সেটা ভলি, কখনো সেটা হ্যান্ড। বাসায় ফিরে সন্ধ্যায় বা রাতে টিভি তো দেখা হয়, গান তো শোনা হয় না। বাসায় যে ক্যাসেট প্লেয়ার নেই। অনেকের বাসায় আছে। খুব দাম নয়, তবু আব্বা কিনবেন না। তাই গান শোনা যা হয় সে ঐ বিটিভিতে।

তখন আমার বেশ প্রিয় শুভ্রদেব। নাকে নাকে গান গায় বলে অনেকে বললেও, তাতেই আমার সই। শুভ্রদেব তখন গ্যালিস পড়তেন। গ্যালিস পরা ছেলে মানে সে একদম চোস্ত। আমার তখন প্রেমে পড়ার বয়স। অবশ্য ততদিনে আমার জীবনে আরও নানা কিছু যুক্ত হয়েছে- ছাত্র রাজনীতি, খেলাঘর, উদীচী।

ক্লাস টেন এ স্কুলে যাওয়া আসার পথে অডিও ক্যাসেটের দোকানে, অথবা পূজার দিনগুলোতে মাইকে ‘দৃষ্টি প্রদীপ জ্বেলে খুঁজেছি তোমায় বা শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হোলো আকাশে’ গানগুলো খুব শোনা যেতো। জানলাম এরা ডিফরেন্ট টাচ। ঐই।

এরপর কলেজ। আমার জীবনে যুক্ত হোলো থিয়েটার। ব্যস্ততা আরও বেড়ে গেলো যেনো। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর বড়পা একটা ওয়াকম্যান গিফট করলেন। কি চাই তার উত্তরে ওটাই চেয়েছিলাম। ওয়াকম্যান তখন খুব ফ্যাশনেবল একটা জিনিস বটে। ওয়াকম্যানে গান শুনলে, বিশেষ করে সেটা নিয়ে রাস্তায় বেরোলে কেমন একটা ভাব আসে। আমার যদিও সেটা করা হয়ে ওঠেনি।

তো, যেহেতু ক্যাসেট প্লেয়ার নেই, ওটাই ভরসা হয়ে উঠলো। নানা রকমের গান শোনার পাশাপাশি কবিতা প্রিয় হয়ে উঠলো একসময়। নির্দিষ্ট কারো গান নয়, যা পেতাম তাই। কিছু ক্যাসেট কিনতাম, কিছু গিফট। রেকর্ডেড গিফটের ক্যাসেটগুলোতে কোন শিল্পীর নাম তো লেখা থাকতো না, তাই আর জানা হোতো না কার গান শুনছি। তবে হঠাৎ আমায় একজন নেশা ধরিয়ে দিলো মান্না দে’তে, এবং পরবর্তীতে জগজিৎ সিংয়ে। সারাদিন রাত ওয়াকম্যানে বুঁদ হয়ে থাকি মান্না দে’তে।

তারপর ঢাকা। হলের লম্বা জীবন। চাকরির ব্যস্ততা…কোথাও আর কোন গান বাসা বাঁধে না অমন করে। মান্না দে ছাড়লাম। আসলে সবই ছাড়লাম। তখন ক্যাসেট প্লেয়ারও হোলো, তবে গান আর সাথে থাকলো না আমার। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে আমার এক বন্ধু অডিও ক্যাসেটে তার প্রিয় গানগুলো পাঠালো রেকর্ড করে। তার মাঝে ‘ফেরারী এই মনটা আমার’, ‘হাজার কবিতা, বেকার সবইতা’, ‘আমি আগের ঠিকানায় আছি সময় করে এসো একদিন’সহ আরও নানা গান ছিলো। তখনও হলে সিট পাইনি। মেজো বোনের বাসায় থাকি। বৃষ্টির সময় তখন। বৃষ্টিতে সেই গানগুলো শুনতে শুনতে ঐ গানগুলোর সাথে আমি বৃষ্টির এক বন্ধুত্ব করিয়ে দিলাম। এখনও বৃষ্টি হলে গানগুলো মনে পড়ে অথবা গানগুলো শুনলে একতলা বিল্ডিংয়ের সামনে ঘাসের ডগায় বৃষ্টির ফোঁটা দেখতে পাই।

আমি হিন্দি বুঝি না, তবে সুরটা বুঝি। আমায় টানে সুর। কত হিন্দি গানের সুর শুনে মন খারাপ হয়। তবে আমি কারো গলা মনে রাখতে পারি না। বিশেষ করে শিল্পীদের। তাই কেউ প্রশ্ন করলে বলতে পারি না এ কোন শিল্পীর গান। এভাবেই ‘মাঝরাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায়’ ‘নীলাঞ্জনা ঐ নীল নীল চোখে চেয়ে থেকো না’, ‘ফেরারী এই মনটা আমার’, ‘সুখের পৃথিবী’, ‘ছাইড়া গেলাম মাটির পৃথিবী’, ‘এই রুপালী গিটার ছেড়ে’ – এতো মুগ্ধতা নিয়ে শোনা এই গানগুলো কার, কোন ব্যান্ডের কখনো আমার জানা হতো না।

গত পরশু আইয়ুব বাচ্চু মারা গেলেন, ফেসবুকে ঘুরে বেড়াতে থাকলো গানের কথাগুলো, আর আমি মুষড়ে যেতে থাকলাম। কাল সারাদিন, রাত কি এক অস্থিরতায় পাড় করলাম। খুব অপরাধি মনে হোলো নিজেকে। আজ ভোরের দিকে ঘুমাতে গিয়ে মনে হলো আমি বোধহয় ঘুমাতে পারছি না। গতরাতে ফেসবুকের কয়েকটি লেখা অস্থির করে তুললো আরও।

আমার বিপরীত লিঙ্গের অনেকেই বলছেন তাদের সময় কেটেছে কনসার্টে কনসার্টে। আমি কোনদিন কোন কনসার্টে গানই শুনিনি। যা কিছু গান শোনা সে ঐ ছাত্র ইউনিয়নের নানা আয়োজনে হয় বাবু ভাই বা পলাশের গান। প্রতিবাদী গান।
তবে কোন না কোনভাবে কতবার ঐ গানগুলো শুনেছি, কিন্তু আমার জানাই হোলো না ঠিকঠাক, এটা কার গান……. কী লজ্জা!

এক দারুণ অজ্ঞতার মধ্যে কাটিয়ে অন্তত গতকাল আমার বোধ তো হলো ‘জানা শুরু হোক’। কতজনার কত প্রিয় গান রয়েছে আমার তালিকায়! এখন থেকে সব গান খুঁজে খুঁজে বের করে জেনে নেবো কে তার সুরকার, গীতিকার আর কে বা কারা সেটা ছেড়েছেন বাতাসে ভর করে।

বিষয়টি এমনও নয় যে, বাচ্চু ভাইয়ের গান ছাড়া আমার চলেনি..আমি নানা রকমের গানই পছন্দ করি। তবে তাঁর গান তো আমি শুনেছি অনেক, তবু কেনো জানি না এটা তাঁর গান। এ কেমন শ্রোতা আমি!

তাঁর চলে যাওয়ায় এতো কষ্ট কেনো পাচ্ছি সেটাও তো বুঝতে পারছি না। আমি তাকে তাঁর বেঁচে থাকায় জানতে পারলাম না বলে!? ভীষণ লজ্জা লাগছে বলে?

শ্যামলী ও স্টার সিনেপ্লেক্সে কয়েকদিন আমি কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেছি বন্ধ করে দেয়া মেশিন চালু করতে শুধু সিনেমার এন্ড ক্রেডিট দেখবো বলে, কারণ ওটা সিনেমার পার্ট। ওটা দর্শকের দেখা উচিত। এবার থেকে আমার কর্তৃপক্ষ আমি নিজেই।
সকল সুরের স্রষ্টারা ক্ষমা করবেন আমায়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 69
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    69
    Shares

লেখাটি ৯৭৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.