কেন আমি এই আন্দোলনে আছি!

0

সুপ্রীতি ধর:

গত কয়েকদিন ধরেই একজন নারী সাংবাদিককে ‘চরিত্রহীন’ বলার প্রতিবাদে চলছে জোরালো এক নারীবাদী আন্দোলন। বিভিন্ন স্তরের নারীরা একাট্টা হয়েছেন এই এক ইস্যুতে। একজোট হয়ে বিবৃতি দেয়া হয়েছে, সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। দাবি উঠেছে, ‘চরিত্রহীন’ এর বক্তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে লেখক ও সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির কাছে। মি. মঈনুল যদিও ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং অফিসিয়াল প্যাডে একটি চিঠিও দিয়েছেন, তারপরও যেহেতু অপমানের ঘটনাটি প্রকাশ্যে টিভি টকশোতে ঘটেছে, দেখেছে লাখ লাখ মানুষ, তাই ক্ষমাও চাইতে হবে প্রকাশ্যে। পাশাপাশি মঈনুলকে মিডিয়ায় বয়কট করার দাবিও উঠেছে।

এটা অবশ্যই পজিটিভ একটা বিষয়, এবং আশা করতে পারি, দুটো দাবিই মানা হবে যথাযথভাবে। এবং এটা সম্ভব হলে দেশে একটা উদাহরণ সৃষ্টি হবে যে নারীকে অপমান করে পার পাওয়া যাবে না আর। অতীতে যদিও অনেকে পার পেয়ে গেছেন, এখন আর পাবেন না। আরও আশা করবো, এখন থেকে পুরুষেরা, তারা সাংবাদিক হোন, রাজনীতিক হোন বা সরকারি আমলা বা বেসরকারি কর্মকর্তা বা যাই হোন না কেন, এখন থেকে শব্দচয়নে অত্যন্ত সতর্ক থাকবেন। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও বিরোধী দলীয় নেত্রীকে নিয়ে মন্তব্যের ব্যাপারে সতর্ক হবেন।

আরও একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। তাহলো, সামনে দেশে নির্বাচন। এবং সবসময় নারীকে কটাক্ষ করা হয় এসব নির্বাচনি প্রচারণায়, তাদেরকে নানাভাবে অবদমন করেও রাখা হয়। আজকের এই আন্দোলন থেকে সেই নির্যাতকদের প্রতিও একটা বার্তা দেয়া হলো। এটা খুবই ইতিবাচক বলে মনে করছি।

শেষতক সময়ই সব প্রমাণ করবে। আর এজন্যই আমি এই আন্দোলনের সাথে আছি। কারণ আমার মতে, মি. মঈনুল শুধুমাত্র তার হতাশার জায়গা থেকে, এবং পুরুষতান্ত্রিক শিক্ষা থেকেই আজকে একজন নারীকে প্রকাশ্যে এমন কথা বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। তিনি ভুলে গেছেন, তিনি যা বলেছেন, তা তিনি বলতে পারেন না কোনভাবেই। কাউকেই না। নারীকে তো নয়ই। সেই সময়ও আর নেই। সময় পাল্টে গেছে। নারীরাও পাল্টে গেছে। তারা এখন মুখের ওপর কথা বলার সাহস রাখেন। একজন মঈনুল যেন শত শত, হাজার হাজার মঈনুলকে পাল্টাতে সহায়তা করে, এটাই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য, আমার মতে।

আমি আরও একটা আশা করতে চাই যে, এই একটা ইস্যুতে নারী সাংবাদিক থেকে শুরু করে যেভাবে অপরাপর পেশাজীবীরাও একসাথে হয়ে সোচ্চার হয়েছেন, একইভাবে এখন থেকে দেশে যেকোনো ‘নারী’ নির্যাতন, অপমান, নিপীড়নের ঘটনায় এমন জোরালোভাবেই সবাইকে পাশে পাবো আমরা। এবং তা হবে দলমত নির্বিশেষে।
অর্থাৎ নির্যাতিত ‘নারী’র কোনো দল বা রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য হবে না। নির্যাতিত নারী যদি ভিন্নমতের, ধর্মের বা দলেরও হোন, তার সাথে সংঘটিত যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ আমরা করবো একসাথে। ঠিক বলেছি তো?

পাশাপাশি একজন নারী দ্বারা আরেকজন নারীও নির্যাতিত হবে না। যেন কোনো নারী অবলীলায় আরেকজন নারীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার চেহারা নিয়ে, চরিত্র নিয়ে, তার অবস্থান নিয়ে অপমানসূচক কোনকিছু লিখলেই তার প্রতিবাদ হবে। যেন কেউ শুধুমাত্র ভিন্নমতের কারণেই বলতে না পারে, ‘তাকে চুলের মুঠি ধরে এনে পাছার ছাল তুলে দিতে হবে’।

এসবই জানি অলীক দাবি, তারপরও আশা করতে অসুবিধা কোথায়!

নারীদের এই ঐক্য দেখে বহু প্রশ্ন উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে। কেউ বলছেন, এমন ঐক্য আগেকার ঘটনাগুলোতে আমরা দেখিনি কেন? তারা বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখও করেছেন, যেগুলোতে আসলেই এমন একটি সামাজিক ঐক্যের প্রয়োজন ছিল প্রশ্নাতীতভাবে। কেন সেগুলো দলীয় কারণে গ্রহণযোগ্যতা পেল না আন্দোলনের ইস্যু হিসেবে? এমন প্রশ্ন অনেকেরই। আমি যেহেতু মাসুদা ভাট্টিকে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের ‘চরিত্রহীন’ বলার প্রতিবাদে গড়ে উঠা আন্দোলনে শরীক হয়েছি, প্রশ্নটা আমাকেও করা হয়েছে।
ইস্যু ধরে ধরে বলা হয়েছে, ‘এই সময়গুলোতে তাদের কাউকে আপনার (আমার) পাশে দেখিনি’। আমি একমত হয়েছি তাদের সাথে। কারণ ভিন্নমত হওয়ার অবকাশ নেই এখানে। সেইসাথে এও বলেছি যে, বিগত দিনে আমি বা আমরা সেইসব ইস্যুতে কাকে পাশে পেয়েছি, কাকে পাইনি, সেই বিচার করতে গেলে তো এগোতে পারবো না। তাছাড়া যেকোনো ‘গুড কজ’ এর সাথে আমি সবসময়ই ছিলাম, এখনও আছি, আর ঠিক এভাবেই মাসুদা ভাট্টি ইস্যুতেও আছি। মাসুদা ভাট্টি আমার পূর্ব পরিচিত বা সংবাদ জগতের বলেই শুধু নয়।

অতীতে কে আমার বা আমাদের আন্দোলনের/প্রতিবাদের পাশে থাকলো বা থাকলো না, ভবিষ্যতে কেউ থাকবে কী থাকবে না, তা নিয়ে পা ছড়িয়ে হিসাব করতে বসলে তো কোনোদিন কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে পারবো না। আমি এগুলোই বলেছি সবাইকে। এখনও বলেই যাচ্ছি। আমার অবস্থানটা মনে হয় ক্লিয়ার করতে পেরেছি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় মেয়েদের ওপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছিল রাতের অন্ধকারে, যেভাবে তাদের হয়রানি করা হয়েছিল সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মিদের নিয়ে, পরবর্তিতে সেই ছাত্রসংগঠনেরই এক নারী নেত্রীকে যেভাবে হয়রানি করা হয়েছে, এর পুরোটারই প্রতিবাদ আমি/আমরা করেছি। আমাদের কাছে অন্যায় অন্যায়ই, সে যেই করুক।

তবে হ্যাঁ, চলার পথে কিছু যে ভুলভ্রান্তি আমাদের হয়নি, তা কিন্তু নয়। সময়মতো ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছি। কিছু কিছু ভুল শোধরানোর উপায়ও ছিল না। খুব অসহায় মনে হয়েছে সেইক্ষেত্রে। স্বীকার করছি নিজের অক্ষমতা।

মুহাম্মদ গোলাম সারোয়ার তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এই নারীবাদীরা কবরী সারোয়ার বা ডা. সেলিনা হায়াত আইভী’র প্রতি শামীম ওসমানের অশ্লীল নোংরা আক্রমণের সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানির প্রতিবাদের সময় ছাত্রলীগ যখন নারীদের পেটাচ্ছিলো, তখনও এরা ঘুমিয়ে ছিলেন। কোটা আন্দোলনের নারীদেরকে যখন ছাত্রলীগ পেটাচ্ছিলো তখনও এরা ঘুমিয়ে ছিলো। শহিদুল আলমের সঙ্গী ড. রেহনুমা আহমেদকে নিয়ে যখন এরা অশ্লীল প্রোপাগান্ডা চালায় তখনও এরা ঘুমিয়ে থাকেন। থাকেন না?

তিনি নিচে কমেন্টে আরও লিখেছেন, “আমি এই আলোচনাগুলো থেকে যে পয়েন্টটি প্রধান করে তুলতে চাচ্ছি সেটা হলো, – “নারী সংহতি”। নারীর সংগ্রাম আর গণতন্ত্রের সংগ্রাম এক নয়। নারীর সংগ্রাম আর সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম এক নয়। তাই নারীর সংগ্রামের প্রথম বান্ধব – সারথী – কমরেড হচ্ছেন অন্য নারী। সেখানে আওয়ামী – বিএনপি – সিপিবি – জাসদ – বাসদ কোনও ভেদ নেই। এই ভেদ যারা করেন, তাদের নারীবাদ “ছদ্ম – নারীবাদ”। আমি বলছি – ছদ্ম নারীবাদীদের চিনে নেয়াটা জরুরি”।

ঠিক, নিচের কমেন্টের জায়গাটায় আমি গোলাম সারোয়ারের সাথে ভীষণভাবে একমত। কারণ নারীর সংগ্রাম সম্পূর্ণই ভিন্ন এক সংগ্রাম, এটা যেমন রাজনৈতিক, তেমনি সামাজিক-অর্থনৈতিকও। এখানে যারা হিসাব-নিকাশ করে নারী আন্দোলন করতে চান, এর পাশে থাকবেন, কারণ তারা আপনার দলীয় সমর্থক, ওর পাশে থাকবেন না, কারণ সে আপনার দলের সমালোচক, বা বিরোধী, এমনটি যারা ভাবেন বা করেন, তারা সত্যিকার অর্থেই ছদ্ম নারীবাদী। মুখোশ পরে বা একচোখ বন্ধ করে আন্দোলন হয়তো হয়, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আকাঙ্খিত দাবিও আদায় হয়, কিন্তু আখেরে সামষ্টিক অর্থে ফলাফল ভালো হয় না।

একদম শেষে একটা কথা বলতে চাই। তাহলো, আজকের এই জোরালো আন্দোলনে আমার ভূমিকা নিতান্তই গৌণ। মানুষ হিসেবেও আমি এই আন্দোলনকারীদের কাছে খুবই নগণ্য ব্যক্তি। তবে নিজে যখন বুঝবো যে, এই আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক স্টান্টবাজি হচ্ছে, ফায়দা লোটা হচ্ছে, ঠিক তখনই সরে আসবো। আমার অবস্থান খুবই ক্লিয়ার এক্ষেত্রে। আশা করি আমার সহকর্মি বা বন্ধুরাও আমার অবস্থানটা বুঝতে পারবেন, এখানে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশই নেই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 218
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    218
    Shares

লেখাটি ৭৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.