বৃত্তভাঙা নারী মানেই খারাপ, বেশ্যা, চরিত্রহীন!

0

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী:

এক ব্যক্তি নিজেকে শিক্ষক পরিচয় দিয়ে প্রেসক্লাবে এসে বললেন,’এক ভদ্রমহিলা তার প্রতিবেশির বাড়িতে এসেছে গতরাতে। মহিলা এসে বাড়িতে ঢুকে সেবাড়ির ছেলের নাম ধরে বলেছে সেই ছেলে তাকে বিয়ে করে দুই বছর ধরে সংসার করছিল ঢাকায় বাসা ভাড়া করে। দুইমাস আগে ছেলেটি বাড়িতে চলে এসে আর ফিরছিল না বলে মহিলা তার খোঁজে চলে এসেছে। মহিলা ছেলেকে নিয়েই ফিরে যেতে চায়। এদিকে ছেলেটি মহিলার আসা টের পেয়ে পালিয়ে গেছে। মহিলা সেই বাড়িতেই আছে।
এখন কী করা যায়?’
একজন প্রবীন সাংবাদিক সব শুনে বললেন, মহিলার বয়স কেমন? সে ব্যক্তি জবাবে বললেন, বুড়ি। বাচ্চার মা মনে হয় দেখলে। ছেলেটির তো এখনো বিয়াই হয়নি। বুড়ি মহিলাটি নিজেকে স্ত্রী দাবী করে কীভাবে? এবার সে সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করলেন, মহিলার কি আগেও বিয়া হইছিল? সে ব্যক্তি বললেন, নিশ্চয় আরও দুই-চারটা হইছে! না হলে কি এভাবে আসে কেউ? এবার সাংবাদিক বললেন, তাহলে ওই মহিলা একটা বেশ্যা!

এক বিধবা মহিলা প্রেসক্লাবে এসে আমার সামনে বসে অভিযোগ করছিল বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে নানাভাবে হেনস্থা করে আসছিল তার প্রভাবশালী প্রতিবেশি। এক পর্যায়ে প্রতিবেশি রাতের বেলা মহিলার ঘরে গুন্ডাসহ ঢুকে তাকে রেপ করে ও মহিলাকে শ্বাসরোধ করে বস্তায় ঢুকিয়ে রাস্তার পাশের ডোবায় ফেলে চলে যায়। ভাগ্যক্রমে মহিলা বেঁচে যায়। পরদিন পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়। সেখান থেকে সুস্থ হয়ে মহিলা প্রেসক্লাবে এসেছিলেন। মহিলা যখন কথাগুলো বলছিলেন আমার পাশে বসা এক সিনিয়র সাংবাদিক মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। আমি মহিলাকে সহায়তা করার আশ্বাস দিলে তিনি চলে যান। তখন আমার পাশে বসা সিনিয়র সাংবাদিক বলে উঠেন, মহিলার নিঃসঙ্কোচ কথা শুনে তার মনে হয়েছে এই মহিলা বেশ্যা। নাহলে বিধবা মহিলা এতো ঝুঁকি নিয়ে একা থাকেন কেন?

কাজেই তাকে সহায়তা করার ব্যাপারে যেন সতর্ক হই।

শুধু দুটি ঘটনা লিখলেও প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় আমাকে। নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কোন পর্যায়ে তা সমাজের দর্পনখ্যাত সাংবাদিকদের মনোভাবে স্পষ্ট। এই সাংবাদিকরাই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। সমাজকে জ্ঞান দেয়।

এক মেয়ে মাঝে মাঝে আমার কাছে আসে। সে সাংবাদিকতা করতে চায়। তার আগ্রহের কথা জানিয়ে পরামর্শ চায়। মেয়েটি একটু ব্যতিক্রম। আর ১০ জন মেয়ের মতো না। সে জেলা শহরের কলেজের মাঠে বসে ছেলে বন্ধুদের সাথে বিড়ি ফুকায়, গিটার বাজায়। চুল ছোট করে ছাটে। জিন্স শার্ট পরে। মেয়েটির সাথে কথা বলতে দেখলেই অনেকেই বলে এই খারাপ মেয়েটিকে কেন প্রশ্রয় দেই।
যদি জানতে চাই কেন মেয়েটিকে খারাপ বলেন? কী জানেন তার ব্যাপারে? কিছু না জেনেই নির্দ্বিধায় বলে দেয় এই মেয়ে চরিত্রহীন! মেয়েটির ছেলে বন্ধুরা কিন্তু চরিত্রহীন নয় কারো চোখে।

জেলা শহরে নানা ক্ষেত্রে বিশাল বিশাল অর্জনের জন্য অনেক নারী সম্মানিত হয় নারী দিবসের সেরা নারীর খেতাবে। সেই নারীরা কোন না কোন প্রভাবশালীর মা, বোন বা স্ত্রী হিসেবে সংসার ধর্ম পালন করে যাচ্ছেন আদর্শিকরুপে, অথবা কর্মক্ষেত্রে সহনশীল নারীর রুপ ধারণ করেছেন, সমাজ যেভাবে নারীকে দেখতে চায় তার একচুলও ব্যতিক্রম করেনি যে নারী।
এর বাইরের নারী মানে বৃত্তভাঙ্গা নারী। তারা খারাপ(!)! নষ্ট(!)! এই খারাপ মানে ছেলেদের খারাপী না। ছেলেরা খারাপ হলে চোর, বদমাশ, মাস্তান, নেশাখোর, জুয়ারু এমন অনেক দুষ্টু টাইপের খারাপ হয়। আর মেয়েরা খারাপ মানেই সে বেশ্যা। যে মেয়ে সবার সাথে মেশে, সাহস দেখিয়ে পথ চলে, মুখের উপর কথা বলে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে সে মেয়ে খারাপ। তাকে নষ্ট বলা সমাজের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এই খারাপ ছেলেদের মতো দুষ্টু দুষ্টু খারাপ না। এই খারাপের নাম বেশ্যা। মেয়েরাই বেশ্যা। সে না হলেও বেশ্যা। ছেলেরা কখনও নয়। যতই তার পঁচে যাওয়ার গন্ধ নাকে লাগুক। প্রকাশ্যে রোজ বেশ্যালয়ে যাওয়া পুরুষটাও বেশ্যা ট্যাগ গলায় ঝুলিয়ে পথ চললেও লোকে বড়জোর তাকে পাগল বলবে, বেশ্যা নয়।

যারা মনে করে চরিত্রহীন শব্দটি নারী পুরুষের জন্য একই অর্থ বহন করে, তারা এর সামাজিক তাৎপর্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। এই শব্দের তেজ বুঝতে হলে তাকে নারীই হতে হবে। যে নারীরা এই পথ ঠেলে ঠেলে নারীবাদের পথে হাঁটতে শুরু করেছে, তারাই জানে কোন শব্দের কী মানে এবং কখন করতে হয়। অন্যরা মোটেও নয়।

লেখক ও সাংবাদিক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ৩,৩৮৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.