‘শিশুরা আসলে সাহসী জাত’

0

আনন্দময়ী মজুমদার:

আট বছরে আমি মাবাবার হাত ধরে ক্লাস কেটে পোল্যান্ড, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, জারমানি, বেলজিয়াম, ঘুরছি বাবার কী সব কনফারেন্সের ব্যাপারে। তখনকার দিনে এমন ঘোরার রেওয়াজ খুব একটা ছিল না। ক্লাস কাটায় আমাদের দারুণ পড়ুয়া সিরিয়াস ইস্কুলে কেমন রেজাল্ট হয়েছিল সেটা মনে নেই। মা বাবা সে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন ব’লে মনে হয় না। সেই সময় মা-কে পথ চিনিয়ে নতুন অচেনা শহরে এদিক ওদিক নিয়ে যাচ্ছি। মা সংসারে যেমন সুপার হিরো, তেমনি নতুন রাস্তাঘাটে একটু ভুলো। এমনি আমি মনে করতাম। তাই বিপুল বিক্রমে নতুন পথঘাটের নক্সা মনে রাখায় আমি ছিলাম তার ছোট্ট বীরপুরুষ। কথাটা ইউনিজেন্ডার বেশ বুঝেছি।

ফিরে দেখলে আট বছরে আমি ক্লাস 4 এ পড়ি। গল্প লেখার চেষ্টা করি (এখনো করি)। শিক্ষক শিক্ষক খেলি (সেই খেলা যে চলতে থাকবে কে জানতো!)। দৌড়ে আফ্রিকানদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে ভালো করি। অংকের টিচার উগান্ডার মিস্টার মুসাজ্জাকাহুয়া আমাদের ক্লাসে আমাদের সিলেক্ট করেন প্রিয় পাত্র হিসেবে। অথচ ক্লাস করতে আমাদের তেমন ভালো লাগে না। আর প্রিয় পাত্র হলে যে তাদের বাঁশের ঝাড়ের মার খেতে হবে না এমন কোনো কথা নেই। ক্লাসে নিয়মিত লুকিয়ে গল্পের বই পড়ি (এখনো ছোটোদের গল্পের বই পড়া বা শোনা আমাকে সেরকম প্রলুব্ধ করে)। সকাল সাড়ে সাতটায় বাড়ি থেকে বেরোই আর সন্ধে সাড়ে পাঁচটা বাড়ি ফিরে ইস্কুল বাসে। মানে দিনের দশ ঘন্টা আমাদের আফ্রিকান স্টাইলে স্বাধীন স্বনির্ভর সংগ্রামের জীবন। আট বছরেই। বাঙালি ছেলেমেয়েদের থেকে আলাদা নিশ্চয়ই, আর চ্যালেঞ্জিং তো বটেই।

সেই শিশুর দিকে তাকিয়ে আমার নিজের শিশুর ছোটো ছোটো চ্যালেঞ্জ গুলোকে নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে সাহায্য করে। আজকে সে প্রথমবার ইস্কুলের বাসে কোথাও একটা গেল সম্মিলিত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। একা একা লাগবে কিনা, বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লাগবে কিনা, এসব সামান্য চিন্তা আমাকে ভাবিত করতে থাকে (দেখা যায় পরীক্ষা নিয়ে আমার তেমন কোনো বাস্তব চিন্তা নেই)। একা একা লাগা বড়ো খারাপ। সেটা কারুর লাগুক আমি চাই না।

আর তারপরই নিজের শিশুবেলার দিকে তাকাই। সেই শিশুকে আমার একটা ছোট্ট বীরপুরুষ মনে হয়। ওই শিশু আমি নই। তৃতীয় কেউ। সময়ের তৈরি। দুই ঝুটি মাথায়। হাঁটতে পারে অঢেল। আইফেল টাওয়ারের সামনে মাঠে মার সঙ্গে লম্বা জিভ বের করে আইসক্রিম খায়। বাবা মা হট ডগ খাবেন কিনা ভাবছেন যখন তখন ব্যাপারটা তার কাছে চরম উদ্বেগ তৈরি করে। পোলিশ এক মহিলার সঙ্গে ভাষা না জেনেও পরস্পরকে নানা জ্ঞান বিতরণ করে বেশ বন্ধুসুলভ আন্তরিকতায়।

বাবা কনফারেন্স করেন বিশ্বাল এক গম্বুজ দেওয়া দালানে, আর সেই সময় তারা বাইরে বসে ঠাকুরমার ঝুলি পড়ে অশেষ নিমগ্নতায়। তার আত্মবিশ্বাস, স্বাচ্ছন্দ্য আর এলেম এই বয়েসে লক্ষ করে আমার আনন্দ হল খানিক। শিশুরা আসলে সাহসী জাত। মা বাবা যেন সেটা মনে রাখে। মানে, ইয়ে আমরা।

বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসার জায়গায় ভয় কুড়িয়ে নেওয়ার বাতিক হয় আমাদের। সেইটা বুঝতে গিয়ে, এই লেখা।

#আমার_শিশুবেলা
#দুই_পয়সা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares

লেখাটি ৩১০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.