উগ্রতা ছাপিয়ে সম্প্রীতি!!

0

তাসলিমা শাম্মী:

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন ছিল শুদ্ধ ব্রাহ্মণ। স্কুলের লাঞ্চ বক্সে করে সে প্রায়ই পূজোর প্রসাদের জন্য বানানো নাড়ু বা বাতাসা নিয়ে আসতো। মজা করে খেতে খেতে আমরা দিব্বি আগের দিনের ঝগড়া ভুলে আবারও একসাথে গল্পে আর খিলখিল হাসিতে লুটোপুটি খেতাম। তার এই লাঞ্চ বক্সের ভিতরে ধর্ম ছাপিয়ে স্বাদ ভাগাভাগির আনন্দ ছিল। স্কুলের পাশের কালি মন্দিরে সে যখন মাথা ঠুকে পূজো দেবার জন্য ঢুকতো, আমরা তখন কাঠফাটা রোদে মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করতাম। আমাদের এই পবিত্র বন্ধুত্ব আর স্বাদের ভাগাভাগিতে ধর্ম বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

ঈদের আগে আগে নতুন জামা আর জুতো কেনার মতো আনন্দে সেও যোগ দিত আমাদের সাথে। আমার জামার রঙের সাথে মিলিয়ে তারও জামা কেনা চা’ই, জুতো কেনা চা’ই! তার এই বিশাল ঈদ শপিং আগ্রহে আমি উৎসবের আনন্দ দেখতাম, কে কোন ধর্মের সেই কথা একদম ভুলে যেতাম।

ঈদের আগের দিন বাবার কড়া হুকুম থাকতো গরুর মাংসের কোনো প্রিপারেশন যাতে তার সামনে দেয়া না হয়! ঈদের সকালে জামাত শুরুর আগেই সে আমাদের বাসায় এসে হাজির হয়ে যেত, সেমাই আর পোলাও মাংস খেত কব্জি ডুবিয়ে। এ বাড়ি ও বাড়ি ঈদের দিন আমাদের সাথে সেও বেড়াতো, সালামি নিতো। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, আমরা পাড়ার যেই ঘরেই যেতাম ওরা তার সামনে গরুর মাংসের কোন আইটেম সারভ করতো না। সবাই তার ধর্মটাকে সম্মান করতো, আর ভালবাসতো তার সম্প্রীতিকে।

এক কোরবানি ঈদে তাকে আসতে মানা করে বলেছিলাম, “গরু জবাই হবে আমাদের বাড়িতে, তুই আসিস না”। সে মন খারাপ করে তার বাবাকে নালিশ দিয়েছিল। তার ব্রাহ্মণ বাবা তাকে সেদিন বলেছিল, “তুই গিয়ে বল, আমরা গরুর মাতৃত্বকে পূজো করি, গরুখোরদের ঘৃণা করা আমাদের ধর্ম নয়”। সেদিন তার বাবার কথা শুনে তাকে হাজার গুণ শ্রদ্ধা আর ভালবাসতে শুরু করেছিলাম। আরও হাজার হাজার এই রকম উদাহরণ আছে আমার ছোটবেলার বন্ধুত্বকে ঘিরে।

তবে আরো ছোটবেলাই থেকে দেখতাম বাড়ি বয়ে মায়ের সহকর্মীরা যখন বাটি ভরে জন্মাষ্টমী বা চৈত্র সংক্রান্তির আনন্দ ভাগ করতে আসতো, আমার দাদু নামাজের সালাম ফিরিয়ে বিসমিল্লাহ বলে তাদের সম্প্রীতিতে কাঁধ মিলাতো। সেই ছোট্ট বেলারই মধুর এক দৃশ্য ছিল, শীতের সকালে ঘুম ভাঙ্গার আগেই রেণুর মা দাদু নতুন গুঁড়ের মোয়া মুড়ি নিয়ে এসে রান্না ঘরে দাদুর সাথে গরম চা এ চুমুক দিচ্ছে। আমার শুচিবায়ুগ্রস্ত দাদু শুধু রেণুর মা দাদুর মোয়া মুড়ির উপর ভরসা রাখতো! কারণ উনি ভোরের পূজো সেরেই পরিষ্কার হাতে যে বানাতো!

কলেজে এসেও সব ধর্মের বন্ধুদের সাথে একসাথে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগিতে সময় কাটে। সংসার করতে এসেও দেখি এখানে ধর্মকে মানতে গিয়ে ভীষণ ধার্মিকরা আগে অন্যের প্রতি সম্মানকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এখানে অল্প কয়েকজন মুসলমান মিলে একজন ক্যাথলিকের কাছে ঈদের নামাজের জন্য হল রুম ভাড়া চাইলে সে এটা ঈদের উপহার হিসেবে বিনামূল্যে একদিনের জন্য ছেড়ে দেয়! কোনো গেট টুগেদারে গিয়ে দেখি আলাদা করে ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে ভেজ আর ননভেজ! এখানেও আগে মানুষের অনুভূতিকে সম্মান, সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার!

একজন লিটন দাশ তার নিজস্ব হাত-পা আর মেধা দিয়ে খেলেই কিন্তু তার দেশের জন্য সম্মান নিয়ে আসে। সেই লিটন দাশ নিজ দেশের মানুষগুলোকে যখন সে তার মন থেকে শুভেচ্ছা জানায়, তখন আমাদেরও কি উচিৎ নয় অনুভূতিকে সম্মান জানানো!

আজ সকালে ফজরের নামাজের পর আমার বন্ধুর স্ট্যাটাস দেখলাম ফেসবুকে, “দুর্গা শুধু “প্রতিমা”তে নয়, প্রতি”মা” তেই দুর্গা দেখি..”, আমি তার সেই স্ট্যাটাসে শ্রদ্ধা দেখলাম, সম্মান দেখলাম।

আমি নিজেই যে ঠিক তা প্রমাণ করার জন্য অন্যকে ভুল প্রমাণ করার যুদ্ধে নামা ভীষণ এক উগ্রতা। উগ্রতা কখনোই সম্প্রীতি আনতে পারে না।
সবাইকে শুভেচ্ছা।

#BeHumaneFirst

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 646
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    646
    Shares

লেখাটি ১,৫২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.