লক্ষ্য যখন লাইক উপার্জন

মাহসিনা আফরোজ ইলা:

জনপ্রিয় হবার সহজ মাধ্যম এখন ফেসবুক। যুতসই একটা কথা বলতে পারলেই হাজার হাজার লাইক, কমেন্ট, ফলোয়ার। যুতসই কথাটা হচ্ছে সাধারণ ফেসবুকবাসীর পালস বুঝে কথা বলা। এই যেমন, একটু ধার্মিক কথাবার্তা, কিছু সস্তা জোকস, যার মূল উপজীব্য নারীর প্রতি যৌন ইঙ্গিত মূলক আদিরস, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য (স্বামীর কিন্তু কোন দায়িত্ব কর্তব্য নেই), শ্বশুর, শাশুড়ির প্রতি পুত্রবধূর দায়িত্ব-কর্তব্য (মেয়ের বাবা-মা এখানে অনুপস্থিত), আধুনিক নারীকে কষে গালাগাল ইত্যাদি ইত্যাদি।
মোট কথা নারীর অগ্রযাত্রাকে যতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং বাঁধাগ্রস্ত করা যায় তার সবটুকু। সংসারে দায়িত্ব কর্তব্য মেনেই চলতে হবে কিন্তু সেটা এক তরফা হলে কেমন হয়?

উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, এই লাইনে যখন কোনো নারী কথা বলে তখন সে এক লহমায় সেলিব্রিটি। আর তিনি যদি পোশাক-আসাকে এবং চাল চলনে অত্যাধুনিক হোন, তাহলে একেবারে সোনায় সোহাগা। ভাবটা এমন, দেখো আমি এতো আধুনিক হয়েও প্রচলিত মূল্যবোধ থেকে সরে আসিনি। এমন নারীদের ফ্যান-ফলোয়ারের আধিক্যের কারণ, তারা চোখেরও আরাম, মনেরও আরাম।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যাদের চোখে আরাম হচ্ছে তারাই দিনে পাঁচটা নারীর পর্দা সংক্রান্ত হাদিস শেয়ার দেন। এই একটা আরেকটার সংগে সাংঘির্ষক মনস্তত্ব অনেক মাথা কুটেও আমি বের করতে পারিনি। অন্যদিকে মনের আরাম হচ্ছে, নারীর সাজপোশাক উগ্র হলেও সে বলছে শত বছরের পুরোনো মূল্যবোধের কথা। যা নারীকে পেছনেই টেনে ধরে রাখতে চায়।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বলে জীবনবোধ নিয়ে যারা লিখে গেছেন তারা পাঠকের স্বীকৃতি পেয়েছেন দেরিতে। কেউ কেউ মৃত্যুর পর। আর যারা হালকা রসিকতা, প্যানপ্যানে বাংলা সিনেমা মার্কা আবেগকে উপজীব্য করে লিখেছেন তারা তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন এবং কালের গহ্বরে হারিয়েও গেছেন।

জনপ্রিয় হবার নেশাটা মানুষের সবকালেই ছিল। কিন্তু এখন এটা এতো তাৎক্ষণিকভাবে হওয়া যায় যে, যে কেউ হতে পারে। কিছুই না, চিন্তাশূন্য, ‘হা’ করে বসে থাকা পাবলিকের সেন্টিমেন্টের একটু খোঁচা দিয়ে দেওয়া আর বসে বসে নারীর চরিত্র স্খলন করা। নারী যে একটা মানুষ। তার যে একটা অস্তিত্ব আছে, ব্যক্তিত্ব আছে সেটা একেবারেই অস্বীকার করে যাওয়া। আর কেউ সেই বিষয়টা মনে করে দিতে চাইলে লাখ লাখ ফ্যান, ফলোয়ার নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া।

তবে যখন কোন নারী জনপ্রিয় হবার জন্য এই সস্তা কৌশল অবলম্বন করে তখন আমার খুব চিন্তা হয়। যদিও এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে তারা নিজ নিজ স্থানে যথেষ্ট এমপাওয়ারড, তবু! কেন যেন মনে হয় তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এবং সর্বোপরি নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য মনের অজান্তেই গর্ত খুঁড়ে যাচ্ছেন। কারণ, কে জানে এখন তারা যাদের গালমন্দ করছেন একদিন নিজের অধিকার আদায়ের লক্ষে সেই তাদেরই দ্বারস্থ হতে হয় কি না!

শেয়ার করুন:
  • 407
  •  
  •  
  •  
  •  
    407
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.