বাচ্চা নিচ্ছো না কেন?

0

শাহরিয়া খান দিনা:

আমি যে বাসার তিন তলায় থাকতাম তার নিচ তলাতেই থাকতো সাবিনা। ২৪/২৫ বছরের শ্যামলা, মায়াভরা চোখের মেয়ে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের সংসার। স্বামীর কারওয়ান বাজারে নিজের ব্যবসা আছে। বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। টাকা-পয়সার তেমন কোনো অভাব নেই। অভাব হচ্ছে একটা বাচ্চার। এই অভাব যতটা না তাদের কষ্টের কারণ, আত্মীয়স্বজনের সেটা বারবার মনে করিয়ে দেয়াটা আরও বেশি কষ্টের ব্যাপার।

আমার প্রেগন্যান্সির সময় সে নিয়মিত খোঁজখবর নিতে আসতো। একদিন কথা প্রসঙ্গেই বললো, বিয়ের প্রায় ৬/৭ বছর হলো এখনও বাচ্চা নেই। শাশুড়ি বলেছে, এবার ছেলেকে বিয়ে করাবেন। শাশুড়ির একমাত্র ছেলে তার স্বামী, আর বাকি পাঁচজনই মেয়ে। তাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাগবে তো!
বলে রাখি, তার শাশুড়ি গ্রামে থাকেন এবং অশিক্ষিত। সাবিনা নিজ থেকেই বললো, চিকিৎসা তো কম করাইনি! এক ডাক্তার একবার অপারেশন করেছিল, অন্য ডাক্তার বললো, সেই অপারেশনে ভুল করে একটা টিউব নাকি কেটে ফেলেছে। বাচ্চাকাচ্চা হবার সম্ভাবনা খুবই কম। কী যে হয়! ওদিকে শাশুড়ির বাড়াবাড়িও দিনকে দিন বাড়ছে। সংসারেও এসব নিয়ে অশান্তি। ওপক্ষের কেউ আমার বাসায় আসে না। আমার মুখ দেখতেও তাদের আপত্তি।

এর বেশ কিছুদিন পর। আমি ততদিনে আমার বাচ্চা নিয়ে বাসায় ফিরেছি। রেগুলার চেকআপের জন্য ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম, ফেরার পথেই দেখি সাবিনা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই হাসিমুখে বললো, ভেতরে আসেন। আমার বাবু দেখে যান।

বলতে দ্বিধা নেই চমকে গেছি। বলে কী! তবুও যথাসম্ভব কৌতূহল চেপে চুপচাপ তার পিছন পিছন তার বাসায় ঢুকলাম।

বিছানার উপর ঘুমাচ্ছে একটা সদ্যোজাত ছেলে বাচ্চা। কপালে কালো টিপ, পাশেই ফিডার। কীভাবে কী!

ধাঁধা ভেঙে সে জানালো, আমার বান্ধবীর কাজের বুয়ার তিন বাচ্চা। আরেক বাচ্চা পেটে আসতেই স্বামী নিরুদ্দেশ। সে বাচ্চাটা নষ্ট করতে চেয়েছিল। কিন্তু ডাক্তার বলেছে, দেরি হয়ে গেছে, এখন আর কিছু করা যাবে না। তো, বান্ধবীর মাধ্যমেই একে আমি পেলাম। পরশু দিন বাসায় নিয়ে আসছি, তার একদিন আগে জন্ম। একদম স্ট্যাম্পে লিখিত করে বাচ্চার মা’কে ৫০,০০০ টাকা দিয়ে আসছি। সে কখনো খোঁজ নিতেও আসবে না কথা হয়েছে।

ছেলেটাকে দেখে ফেরার পথে খারাপ লাগলো। তার মা বুকের দুধ খাওয়াতে পারছে না বাচ্চাকে। সে হয়তো ফেলে দিচ্ছে, আর এদিকে বাচ্চাটা মায়ের বুকের দুধ কিংবা ওম সবকিছু থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে। কী কঠিন ব্যাপার! পরক্ষণে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, কত বাচ্চা তো ডাস্টবিনেও পাওয়া যায়। সেসব বাচ্চাদেরও জন্মদাতা-জন্মদাত্রী আছে। শুধু জন্ম দিয়েই তো আর মা-বাবা হওয়া যায় না। বাচ্চাটা ভালো পরিবারে স্নেহ-আদরে বেড়ে উঠবে, হয়তো ভালো মানুষ হবে, এটাই বড় ব্যাপার।

কিন্তু এরপরের ঘটনা নাটকীয়। সাবিনা তার শ্বশুরবাড়িতে জানালো তার বাচ্চা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তারা সবাই অবাক! এতদিন জানাওনি কেন? তুমি গর্ভবতী, তাই তো শুনলাম না!

সে এবং তার স্বামী যেভাবেই হোক সবাইকে বুঝাতে সক্ষম হলো যে, ডাক্তার শিওর ছিল না বাচ্চাটা সফলভাবে পৃথিবীতে আসবে৷ তাই তারা প্রেগন্যান্সির খবরটা গোপন রেখেছিল। অবশ্য তাদের মিথ্যে না বুঝিয়ে ওদের উপায়ও ছিল না। পালিত সন্তান তারা মেনে নিবে না সেটা তো স্পষ্ট ছিল।

শ্বশুরবাড়ির সবাই আসল বাচ্চা দেখতে। সাবিনা ঠিকই সদ্য মা হওয়ার মতো অভিনয় চালিয়ে গেল। আত্মীয়রা খুশিতে আত্মহারা। তাকে চুলার সামনেই যেতে দেয় না। তারা থাকা অব্দি শুয়ে- বসে সদ্য প্রসুতি মায়ের মতোই বাচ্চার যত্ন করে সে সময়টা পার করলো।

স্বামী আশরাফের সাথে মিলিয়ে নাম রাখা হলো আসিফ। কেউ বলে দেখতে মায়ের মতো। কেউবা বলে দেখো, হাত গুলা! নাকটা কিংবা ঠোঁটটা ঠিক বাপের মতো।

দেখতে দেখতে বাচ্চার প্রথম জন্মদিন চলে এলো। সাবিনা ঘটা করে আয়োজন করলো। বিল্ডিংয়ের পরিচিত সবাইকে দাওয়াত করলো। এদের মধ্যে কেউ একজন বললো, কার বাচ্চা আর কে জন্মদিন করে? জন্ম তারিখ ঠিকমতো জানে কিনা কে জানে? আড়ালে বলা এইকথা কীভাবে যেন তার কানে গেল এবং পরদিনই বাড়িওয়ালাকে জানালো বাসা ছেড়ে দিবে।

সে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল যাতে তার সন্তানের সত্যিটা কেউ না জানে বা এককান-দু’কান করে শ্বশুরবাড়িতে না পৌঁছায়। আমার কাছে ফোন নম্বর থাকার পরও কখনো তাকে ফোন দেইনি। কিছু যোগাযোগ মুছে গেলেও ক্ষতি নেই। ঠিক তেমনি সব সত্য প্রকাশেরও দরকার নাই। সে সত্য দেশ জাতি’র জন্য হুমকি নয় তেমন কিছু সত্য গোপনে নিশ্চয়ই খুব বড় পাপ নেই!

এই গল্পটা হয়তো অনেকের কাছে সিনেম্যাটিক মনে হতে পারে। কিন্তু মার্ক টোয়েন এর ভাষায়, Truth is stranger than fiction.

বলা হয় ‘মা’ হতে পারা নারী জীবনের স্বার্থকতা। মাতৃত্বেই নারীর পূর্ণতা। যারা বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় মা হতে পারে না, তাদের জন্য পুরো পৃথিবীটাই জটিল হয়ে যায়। একটা মেয়ের জন্য এটা যে কত দুঃসহ ব্যাপার তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। ঘরে-বাইরে যে কোনো অনুষ্ঠানে, দাওয়াতে, সামাজিকতায় বেশীরভাগের এক প্রশ্ন- এখনো বাচ্চা নিচ্ছো না কেন? তোমার বাচ্চা হচ্ছে না কেন?

কেউবা সান্ত্বনার স্বরে মনে করিয়ে দেন। আহারে তোমার বাচ্চা নেই! কী আর করবা! সব সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা! তা কোন ডাক্তার দেখিয়েছো? কী বলে ডাক্তার? আসলে প্রব্লেমটা কার?

এইসব ছাড়া তার সাথে আলাপের জন্য যেন জগতে অন্য কোন বিষয় নেই। বিশেষ করে শ্বশুরবাড়ির লোকজন, জীবন বিষিয়ে তোলে। কোন অন্যায় না করেই মেয়েটা যেন হয়ে যায় ভীষণ বড় অপরাধী।

কোনো দম্পতির সন্তান হয় না মানে অনেকেই আবার একদম ধরে নেন যে সমস্যাটা মেয়েরই। পুরুষদের সমস্যাও হতে পারে এটা যেন তাদের কল্পনাতীত! আগ বাড়িয়ে মেয়েটাকে তাবিজ-কবজের ব্যবস্থাও করে দেন ক্ষেত্রবিশেষে।

আগের দিনে বন্ধ্যা মেয়েদের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায়, রীতি-রেওয়াজে অংশ নেয়ায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। দিনের পরিবর্তনে সেই নিষেধাজ্ঞা নেই বটে, কেউ গালমন্দ করে না ঠিক, তবে কারণে-অকারণে বিভিন্ন উপদেশ এবং পরামর্শ দিয়ে ‘তুমি সন্তানহীনা’ এটা মনে করিয়ে দিতে ছাড়ে না।

বর্তমানে বন্ধ্যাত্বের বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা আছে, সেসব চিকিৎসায় ফলও হয়। আমাদের দেশেও সফলভাবে শুরু হয়ে গেছে টেস্টটিউব শিশু বা আইভিএফ, আইইউআই ধরনের অত্যাধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি। তাই বিয়ের পাঁচ-ছয় বছরেও ‘মা’ হতে পারেনি যে নারী, তাঁকে নিয়ে অযথা গল্প বানানো, কিংবা তাকে একান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্নবানে জর্জরিত করার কোন মানে নেই।

‘সন্তান হচ্ছে না’ এমন দম্পতি এমনিতেই এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগেন। সহানুভূতি দেখিয়েই হোক, আর যাই হোক, দেখা হলেই মনে করিয়ে দেবার দরকার নাই, তোমার বাচ্চা হচ্ছে না তুমি ব্যর্থ! স্বামী-স্ত্রী’র একান্ত গভীর দুঃখের এবং পরম বেদনার জায়গাটা খুঁচিয়ে তাদের অদৃশ্য রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা না দেবার কোনো মানে নেই।

কারও কারও জীবন খোলা বইয়ের মতন। কারোটা ব্যক্তিগত ডায়রির মতো। কেউ প্রকাশ করতে পছন্দ করে, কেউ গোপনীয়তাকে প্রাধান্য দেয়। প্রত্যেকের একান্ত ব্যক্তিগত বলে কিছু ব্যাপার থাকে। সন্তান নেওয়া না নেওয়া, হওয়া না হওয়া ব্যাপারগুলো তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যেই পড়ে। সে যদি সেখানে গোপনীয়তা বজায় রাখতে চায়, তাকে অহেতুক বিব্রত না করাই ভদ্রতা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 590
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    590
    Shares

লেখাটি ৪,১২৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.