অমিতাভ বচ্চন নিজে কি বিশ্বাস করেন ‘NO MEANS NO’!

0

কামরুন নাহার রুমা:

ভারতের ‘পিঙ্ক’ মুভিটা রিলিজের পর অমিতাভের মুখের ‘NO MEANS NO’ ডায়লগটা বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। পিঙ্ক একটা উইমেন সেন্ট্রিক মুভি, যা ক্রিটিক্যালি এক্লেইমড এবং হিট।

পুরুষ বলেই একজন পুরুষ একজন নারীর সাথে তার অনিচ্ছায় যা ইচ্ছা তা ব্যবহার করতে পারে না সেই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে মুভিটাতে। অমিতাভের অভিনয় মুভিতে আমাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিলো তিনি বাস্তবেও এমনই , এতোটাই মানবিক, এতোটাই নারী-বান্ধব (ইতিবাচক অর্থে)। কিন্তু তিনি যে আসলে শুধুই অনেক ভালো একজন অভিনেতা সেটা প্রমাণ হলো তনুশ্রী দত্ত – নানা পাটেকার যৌন হয়রানির ইস্যুতে (প্রমাণিত নয় আবারও বলছি, আংশিক প্রমাণিত ) প্রশ্ন করার পর যখন উত্তর দিলেন ‘না আমি নানা পাটেকার, না আমি তনুশ্রী; আমি কিভাবে এই প্রশ্নের উত্তর দেবো”? কী আরামসে উনি একটা সিরিয়াস ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে বের হয়ে গেলেন! কী ডিপ্লোম্যাটিক অ্যান্সার!! সিনেমায় বলেন ‘NO MEANS NO’ আর বাস্তবে তিনি কিছুই জানেন না কিছুই বোঝেন না!

আমির খানতো আরও এক ডিগ্রী উপরে। অনুষ্ঠান হোস্ট করেন ‘সত্যমেভ জয়তে’ আর একজন নায়িকার আনা যৌন অভিযোগের প্রশ্নে বলেন, “ আমার মুভি রিলিজ হতে চলেছে, এখন যাই বলি আমাদের মুভিটার মুক্তি বন্ধ হয়ে যাবে”। বাহ আমির খান! আপনার কথা ভেবে বহু মেয়ে রাতে ঘুমায় না , বহু পুরুষের আপনি আইডল, আর আপনার কাছে আপনারই ইন্ডাস্ট্রির এক নারী সহকর্মীর ‘সম্ভ্রমের’ চেয়ে আপনার মুভি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো! এই আপনারা আইডল! এতো ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে ঘুরে বেড়ান আপনারা, এতো নোংরা মুখোশ আপনাদের!!

কামরুন নাহার রুমা

২০০৮ সালে বলিউড প্রায় ছেড়ে দেয়া আশিক বানায়া আপনে খ্যাত অভিনেত্রী মিস ইন্ডিয়া তনুশ্রী দত্ত ১০ বছর পর নতুন করে নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে পুরনো যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন। ২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ (২০০৮ এ শুটিং হয়েছিলো) মুভির একটি আইটেম সং শুটিং এর সময় নানার উদ্দেশ্য প্রণোদিত স্পর্শের বিষয়ে তনুশ্রী সেট এবং মুভি দুটো ছেড়েই চলে যান চার ঘণ্টা নিজের ভ্যানিটি ভ্যানে নিজেকে অবরুদ্ধ রাখার পর। তনুশ্রী বের হয়ে যাবার সময় তার গাড়ি ভাংচুর হয়। তখন তনুশ্রী অভিযোগও করেছিলেন, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

আবার ১০ বছর পর অভিযোগ প্রসঙ্গে তনুশ্রী বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া এখন অনেক বেশি ভাইব্রেন্ট। তার মানে হলো কোনো ইস্যু সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্থাপিত হলে খুব দ্রুত সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব। হয়েছেও তাই। তার সাক্ষাৎকার দেখার পর বলিউডের নায়ক-নায়িকারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে টুইট করেছেন – কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে।

এখন অনেকে ভাবতে পারেন, ভারতের ইস্যু নিয়ে আমি চিৎকার করছি কেন! ভ্যালিড ভাবনা। একটা কথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে মিডিয়া ইস্যুতে দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি কম বেশি একই রকম। তাই বলিউডের ইস্যু নিয়ে কথা বলা যা, আমাদের ইস্যু নিয়ে কথা বলা প্রায় এক। কারণ নারীদের ভিক্টিম হবার ধরন দুই দেশে একই রকম।

আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে বাংলা লিঙ্ক মডেল ফারিয়া শাহ্‌রিন এই বছরের শুরুতে একটা সাক্ষাৎকারে অভিযোগ তুলেছিলেন যে কেউ একজন তাকে সরাসরি ‘কতো টাকা হলে যাবেন’ বলেও প্রস্তাব দিয়েছিলো? ফারিয়ার এই তথ্যে মিডিয়া বেশ সরগরম ছিলো কদিন। সরগরম ছিলো ফারিয়াকেই দোষী সাব্যাস্ত করতে। টিভিতে টক শো হয়েছে যেখানে দিনশেষে ফারিয়াকেই দোষী করে মিডিয়া পাড়ার পরিচালক প্রযোজকদেরই ভালো দেখানোর চেষ্টা করেছেন সবাই। এমনকি অনেক অভিনেত্রীও ফারিয়াকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানান কটু কথাও বলতে ছাড়েনি। মোটা দাগে ফারিয়ার পক্ষে সেই অর্থে কেউ ছিলো না।

একজন অভিনেত্রী তাকে ‘কেউ দুধে ধোয়া তুলশী পাতা নয়’ বলেও কথা শুনিয়েছেন। যিনি এই কথা শুনিয়েছেন তিনি তার উচ্চারণে প্রমাণ করে দিয়েছেন এখানে কম্প্রোমাইজ না করে, প্রযোজক-পরিচালক কে সময় না দিয়ে, খুশি না করে কেউ উপরে উঠতে পারেন না, বা কোনো রোল পান না।

অর্থাৎ মিডিয়ার নারী তারকাদের মধ্যে চুপ থেকে সয়ে যাবার এবং কম্প্রোমাইজ করার প্রবণতা চলে এসেছে । তাই কেউ স্রোতের বিপরীতে চললে অর্থাৎ পরিচালক প্রযোজকদের কু-প্রস্তাবে রাজি না হোলে সে নিজেই দোষী হয়ে যায়। আরে বোন তোমরা নিজেরাই যদি ভাইব্রেন্ট না হও তোমাদেরকে তো কম্প্রোমাইজ করে , যৌন হয়রানির শিকার হয়েই কাজ করতে হবে। তোমরাই দিনের পর দিন চুপ থেকে পুরুষদের সেই সুযোগটা করে দিচ্ছ, একটা অসুস্থ সংস্কৃতিকে আশকারা দিয়ে রেখেছো।

সব ধরনের কর্মক্ষেত্র নারীর জন্য কর্ম বান্ধব হওয়া, যৌন হয়রানি মুক্ত হওয়া খুব জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সর্বত্রই কর্ম পরিবেশ কমবেশি অসুস্থ, যেখানে নারীরা নিগৃহীত হয় ঠিকই, কিন্তু চাকরি চলে যাওয়া বা পরের মুভি বা নাটকে ভালো রোল না পাবার ভয়ে চুপ থেকে, কম্প্রোমাইজ করে, সব কিছুকে ধামা চাপা দিয়ে মূলত পুরুষ জাতিকে সাহসিকতার দিক থেকে আরও এক ডিগ্রী উপরে তুলে দেয়।

তারা একজনকে হয়রানি করার পর যখন সফল হয়ে যায়, তখন সামনে এগিয়ে যায় নতুন আর একজনকে ভিক্টিম বানাতে। মিডিয়া পাড়ার খবর চাউর হয় দ্রুত, কিন্তু যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো কমবেশি ঘটে সবখানেই। নারীদের চুপ থাকার বিষয়টি আমার ধারণা এবং বিশ্বাস পুরুষকে সিন্ডিকেট করে নারীদের হেনস্থা করতে সাহায্য করে এবং পুরুষরা একজন আর একজনকে সেই অপকর্মে সমর্থন দেয়ার ও রক্ষা করার সুযোগ দেয় – ফারিয়ার ঘটনায় সবার নিগেটিভলি ভাইব্রেন্ট হওয়া এবং তনুশ্রীর ঘটনায় অমিতাভ, আমির খান , সালমান খানদের পাশ কাটানো উত্তর সেটাই প্রমাণ করে। নিজে সরাসরি একজন নারীকে হয়রানি করা এবং অন্য আর একজন হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধে কোনো স্টেপ না নিয়ে চুপ থাকা বা ঘটনাকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা সমান অপরাধ।

২০০৮ সালে তনুশ্রী যখন অভিযোগ করেছিলো তখনও বলিউডের বাঘারা চুপ ছিলেন, এবারও চুপ আছেন। বলিউড শুধু নয়, সমাজের সবকিছুই সবখানে নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষরাই। তাই নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার পর বিশেষ করে অমিতাভের মতো পুরুষরা যখন পাশ কাটিয়ে যান , অক্ষয়রা নানার সাথেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলেন, তখন এটা তো স্পষ্টই নারীরা নারীদের পক্ষে না এলে কোনো লাভ নাই। কারণ শুরু থেকেই আমরা নারীরা কিছু ক্ষুদ্র লাভের আশায় চুপ থেকে থেকে, এক নারী আর এক নারীর পক্ষে না দাঁড়িয়ে বিপক্ষে কথা বলে যে সংস্কৃতি কায়েম করেছি, তা এতো সহজে সমাজ থেকে তিরোহিত হবে না। পুরুষরা পুরুষদের সমর্থন দিয়েই যাবে। এটা একটা শক্ত সিন্ডিকেট – আমরা নারীরা অব্যাহতভাবে আওয়াজ না তুললে, এর বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ালে, কর্মক্ষেত্রে এই পুরুষদের বয়কট না করলে দিনের পর দিন নিজেদের সব বিসর্জন দিয়েই কাজ করতে হবে, যারা কাজ করতে চায় তারা কাজ পাবে না, আর পুরুষরা হবে আরও শক্তিশালী ।

তনুশ্রী তার সাক্ষাৎকারের একটা অংশে বলেছেন যে বলিউডের সেলিব্রিটিরা শক্ত পিআরের সাহায্যে কিছু লোক দেখানো চ্যারিটির মাধ্যমে একটা ইমেজ বানিয়ে রাখেন। তাই তারা সবার কাছে দেবতার মতো। কিন্তু তাদের অরিজিনাল রূপটা খুবই কদাকার।

খুবই অবাক করা বিষয় আনুশকা, দীপিকা, পরিনীতি ,বরুণ ধাওয়ানের মতো তরুণ প্রজন্ম যেখানে এই বিষয়টা নিয়ে সোচ্চার, সেখানে সিনিয়ররা টোটালি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। অধিকাংশ নারী অভিনেত্রীই ভালো বলেছেন যে, মেয়েরা এমনিতেই তাদের নিগৃহীত হবার কথাগুলো বলতে চায় না, তাই যারা বলছে তারা অনেক সাহসের কাজ করছে। এই ঘটনাগুলো আরও বেশি বেশি সামনে আসা উচিৎ ‘#MeToo মুভমেন্টের মাধ্যমে যেমনটা সামনে আনার চেষ্টা হয়েছিলো এবং এখনও চলছে। আর এমন কিছু ঘটলে আমাদের তাদের পাশে অবশ্যই থাকা উচিৎ। চুপ করে থাকার দিন অনেক আগেই শেষ। তাই নারীদের বলছি কিছু ক্ষুদ্র স্বার্থের লোভে চুপ থেকে, নিজেরা চুলোচুলি না করে নিজের ডিগনিটি নিয়ে নিজেই এভাবে ছিনিমিনি খেলবেন না। কথা বলুন, আওয়াজ তুলু্ন,‌ নানাদের মুখোশ টেনে খুলে ফেলুন। জাগো বাহে (নারী) কৌনঠে সবাই!!

সহকারী অধ্যাপক
বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 450
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    450
    Shares

লেখাটি ৩,৯৩৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.