আপেক্ষিক মানবতা ত্যাগ করুন

0

প্রবীর কুমার:

১. আসলেই কি দেশে এই মুহূর্তে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আছেন নোবেল প্রাইজ পাওয়ার মতো? আমার স্বল্প দৃষ্টির সীমায় কেউ পড়ছে না। যদি পাওয়া যেতো, তবে নিশ্চয় আমিও ভীষণ খুশি হতাম। মনে হতো- এ’দেশে খুব ভালো কিছু হচ্ছে। অর্জনটা নিশ্চয় দেশেরও, আমারও।

যদি কেউ এবারও আমাদের দেশে শান্তিতে নোবেল প্রাইজ আশা করে থাকেন, তারা কোন কর্ম বা অবদানের জন্য আশা করেছিলেন জানতে ইচ্ছে হয়। জানতে পারলে তৃপ্ত হবো। এতোক্ষণে নিশ্চয় এটা জানা হয়ে গিয়েছে- এবার যে দু’জন শান্তিতে নোবলে পেয়েছেন তাদের কর্মের ক্ষেত্র কী ছিলো!

হ্যাঁ, তারা দুজন ধর্ষণবিরোধী প্রচারণা, ধর্ষণের শিকার নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা দেওয়া জন্য তথা যুদ্ধকালে যৌন সহিংসতা রোধের অবদান রাখার জন্য নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। এবার আমাদের দেশের শান্তি শৃঙ্খলার দিকে বা দেশের ধর্ষণ চিত্র, প্রতিকারের ব্যবস্থা বা জনসচেতনতার দিকে তাকান। চিত্রগুলো দেখে কি মনে হয় আমাদের নোবেল প্রাইজ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিলো?

ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখাতে পারবেন? মনে হয়-না। জানাতে পারলে সমৃদ্ধ হবো, আশার বুক আরও প্রশস্ত হবে।

যেদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলায় জিতলো, সেদিন প্রধানমন্ত্রীর চোখে জল ছিলো। ভালো; বেশ আবেগি-ভালোলাগার বিষয়। সেদিন কিংবা তার পরের দিনই ধর্ষণের পর নির্মমভাবে মেরে ফেলা রূপা প্রামাণিককে নিয়ে তার একটা কথাও শুনতে পেলাম না। তনু হত্যা, পাহাড়ি মেয়েদের ধর্ষণ হত্যা নিয়ে তাকে কিছু বলতে শুনলাম না। আবার একাধিক ধর্ষণ আর হত্যার সাথে জড়িত ছাত্রলীগ। তাহলে সরকারের দিক থেকে এবারের শান্তিতে নোবেল পাওয়ার আশা করার বিষয়টা কেমন বিপরীত হয়ে গেল না?

২. যারা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন-

ডেনিস মুকওয়েজ:
কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে গৃহযুদ্ধ, ধর্ষণ, লুট, হত্যা নিয়মিত ঘটনা। গাইনোলোজিস্ট ডেনিস মুকওয়েজ-এর মনে বড় প্রভাব ফেলে ধর্ষণের শিকার নারীদের করুণাবস্থা। তিনি দীর্ঘদিন সেখানে থেকে এই নারীদের অসহায়ত্ব আর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা ভেবে চিকিৎসা দিতে থাকেন। এর সাথে যুদ্ধে নারীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধে জোরালো ভূমিকা রাখেন।

নাদিয়া মুরাদ:
নাদিয়া মুরাদের জীবনের প্রাথমিক চিত্র সেখানকার অন্যান্য ইয়াজিদি নারীর মতোই। আইএস জঙ্গিদের যৌনদাসী হিসেবে তাকেও রেখেছিলো। পালিয়ে এসে তিনি ভয়ে লুকিয়ে না থাকে সোচ্চার হোন, জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত হোন। এই ইরাকি মানবাধিকার কর্মীর জীবনের কালো অধ্যায়ের কথা জেনে মনে পড়ে যায় সেখানকার নিয়মিত ঘটনার একটি। –

একদল আইএস জঙ্গি কয়েকটি ইয়াজিদি পরিবারকে বন্দুকের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সেখান থেকে এই কম বয়সী, সমর্থ, সুন্দরী মেয়েগুলোকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ঘরে, তারপর গাড়িতে করে তাদের আস্তানায়। হ্যাঁ, মা, বাবা, বোন, ভাই, সন্তানের সামানেই তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে; আর তাদের চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বাঁধা দিতে গেলে তাদের বন্দুকের ভয় দেখানো হচ্ছে, গুলি করে মেলেও ফেলেছে অধিকাংশকে। মেয়েগুলোকে যৌনদাসী করে রাখা হবে গনিমতের মাল হিসেবে।

৩. আমরাও কঙ্গো- ইরাকের নারীদের প্রতি চলা ধর্ষণে, চলমান সহিংসতায় থিতু হই। আধুনিক সময়ে এমন অসভ্যতা বড় বেমানান। কিন্তু আমরা কি সামগ্রিকভাবে বা জাতিগতভাবে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে ঘটা অন্যায়ে ব্যথিত হই? সবাই কি প্রতিবাদ জানানোর মানসিকতা রাখি?

না, আমরা তা রাখি না।

আমরা নিজেদের তথা ধর্মীয় দিক থেকে আপন বোধ হওয়া স্থান ও ইস্যুগুলোতে আপেক্ষিকভাবে উদ্বিগ্ন হই। তাই আমাদের জাতিগত মানবতায় তেমন আস্থা রাখা যায় না। ব্যতিক্রম দিয়ে মানবতার এতো বড় পরাজয় ঢেকে রাখা যায় না।

কেমন লাগতো- যদি আমাদের চোখের সামনে আমাদের ঘরের মেয়েগুলোকে এভাবে টেনে নিয়ে যেত? তারপর বিক্রি করে দেওয়া হতো বাজারে তুলে! ভাবতেই মাথায় রক্ত উঠে যায় তাই না? একাত্তরে হয়েছিল, মনে আছে? রক্ত উঠে যায় প্যালেস্টাইনিদের প্রতি ইসরায়েলের আক্রমণে। কারণ মানবতা তো আপেক্ষিক, ভাই-ভাই নীতি মেনে চলে।

মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়- যে সব ভাই -বন্ধুরা সিরিয়া-প্যালেস্টাইন-কাশ্মীরের কোনো হত্যায় বা ঘটনায় যতোটা উদ্বিগ্ন হয়, আর কখনও তাদের এমন দেখি না। এমনও দেখি- তারা সারা বছরে কোন পোষ্ট লেখে না। কিন্তু সিরিয়া- প্যালেস্টাইন- কাশ্মীর এলেই তারা মানবতা নিয়ে কয়েক লাইন লিখে ফেলে, কপি-পেস্ট করে, প্রোফাইল ফটো ‘সেইভ গাজা’, হুইল চেয়ারে বসা এক বিক্ষোভকারীর, আইলান কুর্দির ভেসে ওঠা ছবিতে- ভরে যায়। ইস্যু শেষ হলে তারা আবার শীতনিদ্রায় যায়।

এসব আপনাকে-আমাকে- আমাদের সকলেই ব্যথিত করে। আমরা প্রায় সকলেই এর বিরোধিতা করি, কখনও লিখে ক্ষোভ-কষ্ট প্রকাশ করি। অন্যায় ও মানুষের মৃত্যু মানুষকে ভাবিয়ে তুলবে, এটাই স্বাভাবিক। খুব কম পরিমাণ মানুষ আছে যারা ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে শুধু মানবতার জন্য লেখে, উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের প্রতি ভালোবাসা-শ্রদ্ধা না জানানো অন্যায় হবে।

কিন্তু আপনাদের কিছু অস্বাভাবিক আচরণ মানতে কষ্ট হয়, সত্যি কথা বলতে এসব আপেক্ষিক মানবতার ভাই-বন্ধুকে মানুষ ভাবতেও কষ্ট হয়। কারণ এরা বিশেষ জায়গায় চুপ থাকে। আর হতাশার বিষয় হচ্ছে, দেশে এমন চুপ থাকা মৌন সমর্থকের সংখ্যাই বেশি।

এরা-

* আইএস যত ভয়ঙ্কর আর বর্বর রুপ দেখিয়ে মানুষ হত্যা করুক না কেন, এরা চুপ থাকবে।

* ইয়াজিদি নারীদের উপর পাশবিক নির্যাতনে, তাদের বাজারে বিক্রি করলেও এর চুপ থাকে।

* বোকো হারাম স্কুল থেকে শয়ে শয়ে স্কুল ছাত্রীকে তুলে নিলে বা বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১০,০০০ মানুষ মেরে ফেললেও এরা চুপ থাকে।

* ইউরোপ-আমারিকার বিভিন্ন দেশে কোন জঙ্গি হামলায় নির্মমভাবে মানুষ মারলেও এরা চুপ থাকে।

* সৌদি আরব ইমেয়েনে যত হামলাই করুক, যত শিশু -মানুষই মারুক না কেন, এরা চুপ থাকে।

* সৌদি আরব সিরিয়ার মানুষগুলোকে আশ্রয় না দিয়ে তাদের মেয়েগুলোকে কিনে নিয়ে গেলেও তারা চুপ থাকবে।

* এরা বেশিরভাগই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় বড় মনে করে, মানবতা এদের পরে আসে। অথচ রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা হিন্দু তাদের প্রতি অন্যায় ও বৈষম্যে এর চুপ থাকে।

* দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনে এরা চুপ থাকে। এমনকি এরা তাদের ধর্ম ও ধর্মীয় গ্রন্থকে নিম্নভাবে ব্যাবহার করে সংখ্যালঘুদের ফাঁসিয়ে দেওয়া এবং সেই চেষ্টাতেও চুপ থাকে।

* এরা বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা নিয়ে এখনও ক্ষোভ প্রকাশে করে। কিন্তু দেশে প্রতি বছর অজস্র মন্দির-মূর্তি ভাঙ্গার পর এরা চুপ থাকে। এমনকি আই.এস যদি কোন মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়, তাতেও এরা চুপ থাকে।

* দেশে শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি হামলাতেও এরা চুপ থাকে।

* আদিবাসী- পাহাড়িদের ঘর জ্বালালেও এরা চুপ থাকে।

* এরা সমর্থিত কোনো রাজনৈতিক দলের মারাত্মক অন্যায়েও চুপ থাকে।

কী হবে এই পক্ষপাত করে? এতে আসলেই মানসিক শান্তি মেলে কি? ডেনিস মুকওয়েজ এবং নাদিয়া মুরাদ তো চাইলেই এসব থেকে দূরে থাকতে পারতেন। কেন তারা এভাবে নিজেদের সঁপে দিয়েছেন? মানবতার জন্য, পৃথিবীকে সভ্য করার জন্য।

কিন্তু আমরা ভিন্ন গোষ্ঠী আর ধর্মের প্রতি জমিয়ে রেখেছি নীরব ও প্রকাশ্য ঘৃণা। আমরা যতদিন নিজেদের মধ্যে থেকে এসব আপেক্ষিক মানবতা দূর করতে না পারবো, ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীর বড় অংশ অমানবিক ও সহিংস থেকে যাবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 495
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    495
    Shares

লেখাটি ৯৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.