যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছায় না

0

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

কিছুদিন আগে সৌদি আরবের নারীদের গাড়ি চালাবার ওপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। সৌদি থেকে সদ্য আগত আমার এক সহপাঠী জানালো নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও সেখানকার নারীরা গাড়ি চালাবার ব্যপারে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করছে না। কারণ নারীর গাড়ি চালাবার বিষয়টি তাদের সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে এখনও গ্রহণযোগ্য নয়।

আমি জিজ্ঞাসা করার লোভ সামলাতে পারলাম না যে, কেন? কেন সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়? এর সাথে তোমাদের ধর্মের কি কোনো সম্পর্ক আছে?

এখানে বলে নেয়া ভালো যে, সাধারণত আমি- কে কোন ধর্ম পালন করছে সেটা তার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার বিবেচনা করে অযথা প্রশ্ন বা সমলোচনা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখি – ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত ধর্মের ঝাণ্ডা নাড়িয়ে অযৌক্তিক তর্ক জুড়ে দিয়ে কেউ আমাকে বিরক্ত করতে চেষ্টা না করে। তবে আমার এই ভব্যতাবোধ ধর্ম বিষয়ক জ্ঞান অর্জনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। তাই যেকোনো ধর্ম সম্পর্কে জানতে এবং যৌক্তিক আলোচনায় আসতে আমার কখনই কোনো আপত্তি নেই।

যাইহোক, আমার প্রশ্নের উত্তরে সে জানালো, না, নারীর গাড়ি চালাবার বিষয়ে তাদের ধর্মে কোনো বারণ নেই। ধর্ম বলছে, পর্দার মধ্যে থেকে নারীর সবকিছু করার অধিকার আছে। তার মতে, এটা ধর্ম নয়, সৌদি আরবের সামাজিক সীমাবদ্ধতা।

আমার পরের প্রশ্নটি ছিল, এ ব্যাপারে তোমারা নারীরা কী মনে করো?

সাবরিনা স. সেঁজুতি

সে জানালো, সৌদি আরবের অনেক নারী-ই আছেন যারা দেশের বাইরে স্বাধীনভাবে নিজের গাড়ি চালাচ্ছেন, বাইরে কাজ করছেন। কিন্তু দেশে ফিরে ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও তারা গাড়ি চালান না। কারণ তাদের দেশের অধিকাংশ পুরুষের সাথে অধিকাংশ নারীও মনে করে যে, গাড়ি চালালে গুনাহ হয়, আল্লাহ নারাজ হন । তাই যে নারী গাড়ি চালায় সে খারাপ নারী। সেক্ষেত্রে গায়ে পড়ে খারাপ নারীর উপাধি পেতে কে চাইবে?

জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য হলাম, তুমিও কি সেরকমই মনে করো?

সে হেসে উত্তর দিলো, আসলে কী জানো, আমাদের সমাজে যখনই কোনো নারী স্বাধীনভাবে কিছু করতে চায়, বেশিরভাগ পুরুষের সাথে অধিকাংশ নারীও তাদের পথের বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় । তাই আমাদের সমাজে একজন নারীকে এগিয়ে আসতে হলে অনেক বেশি লড়াই করতে হয়।

তার একথা শুনে চুপচাপ বসে থাকা আমার অস্ট্রেলিয়ান সহপাঠী আর চুপ থাকতে পারলো না। সে বললো, এটা শুধু তোমাদের সৌদি আরবের সমস্যা নয়। নারী উন্নয়নের পথে অস্ট্রেলিয়ান সমাজের নারী-পুরুষের ভূমিকাও অনেকটা একই রকম। এখানেও নারীদেরকে স্বাধীনভাবে এগিয়ে চলতে হলে নারী-পুরুষ সকলের সাথে লড়াইয়ে করেই এগিয়ে যেতে হয়।

তখন আমিও তাদের সাথে একমত পোষণ করে জানালাম, বাংলাদেশের অবস্থাও ভিন্ন কিছু নয়। তবে আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে দেশের আইন শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এগুলো নির্ধারণ করে দেয় লড়াইয়ের তীব্রতা কেমন হবে! 

আমাদের আলোচনা শুরু হয়েছিল একটি গবেষণাপত্রের ফলাফল নিয়ে। যেখানে গবেষক দক্ষিণ আফ্রিকার একটি স্কুলে ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে গবেষণা করে স্কুলের খেলার মাঠে জেন্ডারের ভূমিকা আলোচনা করেছেন। গবেষণা পত্রটি পড়ার পর আমরা ঐ ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের সামাজিক আচরণের সাথে সমাজের মূলধারার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষগুলোর সামাজিক আচরণের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি।

যেমন  ঐ স্কুলের বেশির ভাগ ছেলে-মেয়েই মনে করে ফুটবল ছেলেদের খেলা। তাই যেসব মেয়ে ফুটবল খেলে এবং খেলতে চায়, তারা তাদের চোখে ‘ভালো মেয়ে’ নয়। শুধু তাই নয়, বাচ্চারা তাদের ‘টমবয়’ সম্বোধন করে, কারণ ‘টমবয়’ তাদের কাছে অসম্ভব অপমানজনক একটি সম্বোধন।

তবে মজার বিষয় হলো, তাদের স্কুলের এক ফুটবলপ্রেমী মেয়েকে গবেষক যখন প্রশ্ন করেছিল, ছেলেমেয়েরা তোমাকে টমবয় বলে ডাকলে তোমার কেমন লাগে? সে উত্তরে বলেছিল, আই ডোন্ট কেয়ার, অর্থাৎ আমি সেসব পাত্তা দেই না। আমি ফুটবল খেলা পছন্দ করি, আমি ফুটবল খেলেই যাবো। ফুটবলপ্রেমী আরেক মেয়েকে একই প্রশ্ন করা হলে,  সে উত্তরে বলে, যদি আমাকে কোনো ছেলে টমবয় বলে, আমি উত্তরে তাকে গে বলে দেই। আমাদের চোখে এই ফুটবলপ্রেমী মেয়ে দুটো হলো সমাজের স্বাধীনভাবে এগিয়ে চলতে চাওয়া দুই নারী, যাদের নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছা আছে।

তারপর গবেষক এই সকল বাচ্চাদের কাছে আরেকটু গম্ভীর একটি প্রশ্ন করে তাদের চোখে খারাপ মেয়ের সংজ্ঞায়ন নির্ধারণ করার চেষ্টা করলেন। বাচ্চাদের কাছে ‘টমবয়’ এবং ‘গে’, এই দু’টি শব্দের ব্যাখা চাওয়া হলো। তারা যেভাবে এ দু’টি শব্দের সংজ্ঞায়ন করলো, তা সমাজের অন্ধ বিশ্বাসের এক মিশ্র প্রতিফলন। তাদের ব্যাখ্যা অনুসারে, টমবয় হলো সেই মেয়ে, যে শক্তিশালী, প্রতিবাদী এবং সিগারেট খায়। অন্যদিকে গে হলো সেই পুরুষ, যারা স্কার্ট পরে, মেকাপ করে এবং নারী কন্ঠ নকল করে কথা বলে।

দক্ষিণ আফ্রিকার শিশুদের উপর করা এই গবেষণার ফলফল নিয়ে আলোচনা করতে বসে আমরা তিন সহপাঠী কোথায় যেন আমাদের যাত্রা পথের মিল খুঁজে পেলাম। আর নারী উন্নয়নের পথে সমাজের বাঁধা এবং অসামঞ্জস্যতা নিয়ে আলোচনা করতে করতে এই মর্মে উপনীত হলাম যে, নারী যে দেশ বা সমাজেরই হোক না কেন, তাকে স্বাধীনভাবে এগিয়ে যেতে হলে লড়াই করাটা যেন অত্যাবশ্যকীয়। রাষ্ট্রভেদে যাত্রাপথ এবং প্রতিকূলতার ধরন ভিন্ন হলেও, প্রতিকূলতার উৎপত্তিস্থল একই – সমাজের অন্ধ বিশ্বাস, যেখানে শিক্ষার আলো কখনই পৌঁছায় না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 74
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    74
    Shares

লেখাটি ৩০৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.