বলিউডে MeToo এর ঝড়, বাংলাদেশ কতদূর?

0

নাঈমাহ তানজিম:

দেরিতে হলেও বলিউডে এবার #MeToo মুভমেন্ট শুরু হয়েছে। এক ধাক্কায় সবাই সেখানে নড়েচড়ে বসেছে এবং অধিকাংশই ভিকটিমের পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, তারা চান ‘বিষয়টির সুরাহা হোক। অন্যায় আর অসততার বিরুদ্ধে ন্যায় ও সততার জয় হোক’।

সবচেয়ে প্রথমে মুখ খুলেছেন মডেল ও অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। বলিউড এর অন্যতম প্রবীণ এবং সফল অভিনেতা নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন এবং গুণ্ডা দিয়ে হুমকি দেওয়া ও গাড়ি ভাংচুর করার অভিযোগ এনেছেন তনুশ্রী। ঘটনাটা ঘটার সাথে সাথে অর্থাৎ ১০ বছর আগেও অভিযোগ এনেছিলেন তিনি। অভিনয় ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু ১০ বছর পার বলিউডে MeToo শুরু হওয়া এবং নারীবান্ধব কর্মক্ষেত্র নিয়ে প্রশ্ন আসার পর তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি। নির্ভীক হয়ে, কাউকে তোয়াক্কা না করে মুখ খুলেছেন।

যদিও তাকে অনেক প্রশ্ন, অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তারপরেও তার বেশিরভাগ সহকর্মীই সমর্থন জানিয়েছেন। এটাকে তারা কারোর প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণ বা শত্রুতা হিসাবে না নিয়ে, একটা সামাজিক সমস্যা বা অপরাধ হিসাবে নিয়েছে। যেটা খুবই প্রশংসনীয়। দীপিকা পাডুকোন তো বলেই দিয়েছেন যে, মী টু মুভমেন্ট কোনো জেন্ডারভিত্তিক আন্দোলন নয়, নারী বনাম পুরুষের আন্দোলন নয়, এটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের আন্দোলন, এটা অপরাধের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ভুল বা সঠিকের আন্দোলন। অন্যায় যার সাথেই ঘটুক, তা সে নারী বা পুরুষ যেই হোক, এর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশেও কি এরকম কিছু শুরু হওয়ার সময় আসেনি? আর কতদিন আমরা এরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে দেখেও না দেখার ভান করবো? ট্রল করে পরিস্থিতির গুরুত্ব নষ্ট করবো? সমস্যাকে মেনে না নিয়ে ডিনায়াল মুডে থাকবো?

লেখক: নাঈমাহ তানজিম

শুধু মিডিয়াতে না। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ইত্যাদি কর্মক্ষেত্রে নারীরা কী কী সমস্যা ফেস করেন প্রতিনিয়ত, সেটা তো এখন একটু একটু চিহ্নিত করে, ঝেঁটিয়ে দূর করার সময় এসেছে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ার পরেও আমাদের দেশে মিডিয়া বা অন্য কোন ক্ষেত্রে #MeToo মুভমেন্ট শুরু হয়নি। এখানে এখনো সেই ডিনায়াল মুডেই আছে বেশিরভাগ। যারা যৌন নিপীড়ন করে, তারা মানতেই চায় না নিপীড়ন এর কথা, উলটা ভিকটিমকেই দোষ দিয়ে যাচ্ছে। এদের সহকর্মীরা আবার এককাঠি উপরে, তারা তো মুখ খুলেনই না, উলটা নিপীড়ক এর হয়ে মানববন্ধন করেন, মামলা করে দেন। নারী সহকর্মীরা পর্যন্ত এগিয়ে আসে না!

ফারিয়া শাহরিন নামের একজন সাহস করে মুখ খুলেছিলো। ফলশ্রুতিতে এমন কোনো হয়রানি নেই যাতে মেয়েটাকে পড়তে হয়নি। এবং তার চরিত্রে কালিমালেপনে কে কে ছিলেন? শহীদুজ্জামান সেলিম ও বন্যা মির্জার মতোন নামিদামি বেশ কজন অভিজ্ঞ এবং সিনিয়র অভিনেতা ও অভিনেত্রী! অথচ উনাদেরই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব ছিলো এই দিকটা তুলে ধরার, মেয়েটির পাশে দাঁড়ানোর। যাদের এখন আর ক্যারিয়ার হারানোর ভয় নেই, যাদের অবস্থান ইতোমধ্যে শক্ত, যাদের যেকোনো বক্তব্যের মূল্য আছে মিডিয়াতে।

আফসোস দীপিকার মতোন কেউ তখন দাঁড়ায়নি ফারিয়ার পাশে এসে, বরং ওইসব নামিদামিরা ভিকটিম এর চরিত্রগত দোষ খুঁজতে ব্যস্ত ছিলেন। আর এসব কারণেই জয়া আহসান এর মতন গুণী অভিনেত্রীকে চলে যেতে হয় ভারতে কাজ করতে। অথচ উনারা যদি যার যার জায়গাটা পরিষ্কার করতেন, যার যার সময়ে নিজের অবস্থানে থেকে এইসব নোংরামির বিরুদ্ধে মুখ খুলতেন, আজকে এতো আবর্জনা জমতো না।

এই ব্যাপারটা আমার কাছে অ্যান্টিবায়োটিক এর ডোজ এর মতোন মনে হয়। অসুখ ধরা পড়ার সাথে সাথে, এবং ইনফেকশন অল্প থাকতেই চিকিৎসা করে ফেলতে হয়। নাহলে জীবাণু ছড়ায়ে গেলে ইনফেকশন শুধু বাড়তেই থাকে, এবং আরো কড়া ডোজ দরকার হয়। বাংলাদেশি মিডিয়া তো চিকিৎসা করছেই না, উলটা নিজের শরীরের আক্রান্ত অংশকে বকাবকি করে থামিয়ে দিচ্ছে। এতে পরিস্থিতি তো ভালো হচ্ছেই না, উলটা ভিতরে ভিতরে আরো ভয়াবহ, আরো শক্তিশালী হচ্ছে।

তথাকথিত নামিদামি অভিনেতা ও অভিনেত্রীরা কি ভাবেন যে এই জীবাণু কোনওদিন উনাদের স্পর্শ করবে না? ফারিয়া শাহরিনকে দোষারোপ করে চুপ করিয়ে দিলেই ঝামেলা মিটে গেলো? আজকে তারা যেই নিপীড়কদের হয়ে সাফাই গাইলেন, আগামীকাল এরাই যে তাদের কন্যাসন্তান, বা বোন, বা জুনিয়র সহকর্মীর দিকে কুদৃষ্টি দিবে না? তখন কীভাবে প্রতিবাদ করবেন তারা? মুখ খুলতে পারবেন??

এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা পয়েন্ট রয়ে যাচ্ছে। একবার কারো নামে যৌন নিপীড়ন এর অভিযোগ উঠলে সেবারে যদি কোনও সুরাহা না-ওও হয়, ভিকটিম যদি ইনসাফ নাও পায়, তারপরেও ডকুমেন্টেশন এর দরকার আছে। পত্রিকা-টিভি চ্যানেল এর রিপোর্টও অনেক গুরুত্ব রাখে। ওই একই ব্যক্তির নামে আবারও কোন অভিযোগ উঠলে পূর্ববর্তী অভিযোগগুলা অনেক কাজে আসে। কিছুটা হলেও সত্যতা যোগায়। তাই যতই ছোটই হোক, কিছু ডকুমেন্টেশন হলেও রাখা উচিৎ।

তনুশ্রী দত্তর সাথে হওয়া সেই অন্যায়ের ভিডিও ক্লিপ এখন দশ বছর পর চ্যানেলে ব্রডকাস্ট হচ্ছে। এর আগে কোনো অভিনেত্রী কবে নানা পাটেকর এর দুর্ব্যবহার এবং চারিত্রিক সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, সেগুলাও সামনে আসছে। এর একটা এসপার-ওসপার হবেই। আরও অনেককিছু, অনেক নিপীড়ক সামনে আসবে। শুরুটা করেছেন তনুশ্রী, এবং এবার অনেকেই এই মশাল নিয়ে এগোবেন। হলিউডে হার্ভে উইনেস্টন এর বিরুদ্ধে সব অভিনেত্রীরা এক হয়ে অভিযোগ তুলেছেন। এবার আর অস্বীকার করার কোনও উপায়ই নেই।

বলিউড ভারতেরই শুধু নয়, বিশ্বের অন্যতম বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। এর সাথে কখনওই আপোস করবে না ভারতীয়রা।

আর ধামাচাপা দেওয়ার এই মানসিকতা, মুখ চেপে ধরে থামিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাংলাদেশ এর মিডিয়াজগত এর কপালে অনেক দুর্গতি আছে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 491
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    491
    Shares

লেখাটি ৪,০০৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.