ট্রলিং কি আপনার সোশ্যাল মিডিয়া লাইফের বারোটা বাজাচ্ছে?

0

অপর্ণা গাঙ্গুলী:

সোশ্যাল মিডিয়াতে টিকে থাকতে হলে সাহস এবং মানসিক দৃঢ়তা প্রতিটি মানুষেরই যে কম-বেশি দরকার হয়ে পড়ে, সে কথা আমরা জানি। সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার একটি যথাযথ শিক্ষণীয় বিষয়, যা কিনা প্রতিটি বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েকে জানিয়ে, বুঝিয়ে দেওয়া উচিত।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে বোঝাবেন? যে বাবা-মা-শিক্ষক-শিক্ষিকারা এর সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে নিজেরাই অবগত নন? সোশ্যাল মিডিয়াকে যদি খুচরো প্রেমের আখড়া ভেবে নিয়ে ব্যবহার করতে চান, তবে ভুল ভেবেছেন। পরে কেঁদে কূল পাবেন না। এ জায়গা মানুষের চাঁদিতে হাত বুলিয়ে টাকা কামাবারও নয়। মানুষকে অযথা বুলি করা বা ট্রল করার জায়গাও এ নয়। অথচ আজকাল আমরা প্রায় সবাই অল্পবিস্তর এ সবকিছুর শিকার হয়ে থাকি।

কোনো কারণ নেই, কেউ না কেউ আপনাকে বিরক্ত করে মারতেই পারে অযথা। যেসব মানুষ আমাদের ফ্রেন্ডস লিস্টে সামিল হয়ে পড়েন, তাঁরা আদৌ আপনার বন্ধু কিনা সে কথা ভেবে দেখেছেন? হয়তো তাঁরা আপনার আপডেট নিতেই সঙ্গে রয়েছেন। কোনো ব্লক করা লোকজনের প্রাণের বন্ধু তারা, খবর পাচারের কাজ দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন ওইভাবেই। অথবা বিনা কারণে আপনাকে হ্যারাস করে তাঁরা আনন্দ পাচ্ছেন।

আপনার লেখাজোখা আপনার ভাবনার বহিঃপ্রকাশ এবং এক সচেতন মানুষ হিসেবে সেই প্রস্তাবনার দায়িত্ব পুরোটাই আপনার। তাই অনেকেই এই সব পোস্টে এসে খিল্লি উড়িয়ে যায় যখন, তখন তাঁদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আপনার কর্তব্য।

মনে রাখবেন কণ্ঠ দৃঢ় করতে কিন্তু বাহুবল লাগে না, মানুষকে না মেরে ধরে, বোমা না ফাটিয়েও আমরা শিক্ষা দিতেই পারি, একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করতেই পারি।

কিছু মানুষ আছেন, দেখেছি, আপনার লেখা কোনো বিশেষ বন্ধুর পোস্টের কমেন্টে এসে লাইক দিয়ে যাবেনই। আপনি গদগদ – আহা কী ভালোই না লেখেন আপনি, তবে একটু ভাবুন। এ ক্ষেত্রে আপনার ভালো লেখার থেকেও তার উদ্দেশ্য আপনাকে ফলো করা এবং অন্য কোনো বন্ধুকে আপনার কমেন্ট সম্পর্কে অবগত করানো। এরপর বডি শেমিং, সাইবার বুলিয়িং, ইনসাল্ট, ট্রলিং তো রয়েছেই। এদের নিজেদের জীবনের এতো খারাপ লাগা যে এরা ফেসবুকে এসে ঐসব উগড়ে দিতে চান সবার ওপর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এদের মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন বলেই মনে হতে পারে।

এর মধ্যেও কিছু ভালো ট্রোলিংয়ের কথাও বলি। গ্র্যামার বা স্পেলচেকার ট্রলাররা আদপে হয়তো সমাজের জন্য ভালো কাজই করছেন। ওদের থেকে শেখার কিছু আছে, কিংবা পারসিস্টেন্ট ডিবেট ট্রলাররা? প্রতিদিন নিত্যনতুন কিছু নিয়ে ডিবেট বাঁধিয়ে বসছেন, আর লাইকের আর কমেন্টের হুড়োহুড়ি পড়ে যাচ্ছে। বেশ তো নিন এদের থেকে, উপযোগী কিছু, এনজয় করুন – ‘Take what you like and leave the rest’. তবে এরা বড্ডো একবগ্গা ট্রোলার, এরা নিজেরাই সবক্ষেত্রে রাইট আর অন্যরা খুব ভুল। না ভাই ওরকম করলে খেলবো না বলে দিলুম।

তবে আর একজন যে আছে সে কিন্তু দারুণ মারকাটারি গোছের। না মানে অতোটাও নয়, তবে মুখেন মারিতং জগৎ বটেন। নিজের কথা বাড়িয়ে বলাই তার ধরন, এ এমন এক ভয়ঙ্কর ট্রোলার যে এই নেশাতে মেতে উঠে, মিথ্যে রটাতে বা গুজব ছড়াতেও পিছপা হয় না, এদের একটা নাম দেওয়া যাক না হয় – দা শো-অফ বা ব্ল্যাবার মাউথ ট্রলার।

আর কাউকে দেখেছি, এক কথায় দু কথায় সারে, ওই যেমন ইয়েস নো ভেরি গুড জাতীয়। এদের নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আর এদের থেকে পাবারও কিছু নেই। তবে মারাত্মক হলো ওই অল ক্যাপস ট্রল কিছু বললেন কী না বললেন ধ্যার ধ্যার করে অল ক্যাপস আপনাকে দিলেন উড়িয়ে l HOW DARE YOU SEND ME A BLACK HEART ON FB!!! ব্ল্যাক হার্ট? বুঝুন, নিন, ঠ্যালা সামলান এবার অল ক্যাপস মানে ব্যাড ম্যানার্স আর কী … আন্তর্জালের কিছু নিয়মাবলী আছে, এসব যদি এখনো না জেনে থাকেন, …. কী আর বলি!

আর একজন ট্রলার ভাই সে চির অভিমানী, আপনার যে কোনো লেখাকে সে তার দিকে তাক করা হয়েছে ভেবে নিয়ে গোমড়াথেরিয়াম হয়ে যায়, তারপর ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছাস, আইলা, টাইফুন, টর্নেডো, নিন, এবারে কী করবেন এদেরকে নিয়ে ভাবুন। সঙ্গে রাখবেন? না ছেঁটে দেবেন? ছেঁটে দিলেও অন্তর্বাক্সোতে এসে আপনার ঝুঁটি নেড়ে জাগাবে – আমাকে বাদ দিলেন কেন? যাক, এঁদের নাম দেওয়া যাক দা ফরএভার অফেন্ডেড ট্রলার।

তবে যাই বলুন, ওই অফ টপিক বা স্প্যামিং ট্রলাররা ভারী বিরক্তিকর। অফ টপিক কথায় কথায় টপিক থেকে বেরিয়ে নিজেদের পছন্দের টপিকে ঢুকে পড়তে চান। কেমন যেন… হচ্ছে ক্রিকেট নিয়ে কথাবার্তা, এর মধ্যে খাবার দাবার আসে কোত্থেকে! হঠাৎ মন্তব্যে রাশি রাশি খাবারের ছবি দিয়ে আড্ডার মুড্ নষ্ট করতে এরা সিদ্ধহস্ত। এরা কী কোনো ঘটনার গুরুত্ব বোঝেন না? না কি সবেতেই গরুর রচনা লিখে যান, কে জানে!

আর স্প্যামিং ট্রলার তো খতরনক … নিজেকে ছাড়া আর নিজের ব্যবসা ছাড়া এরা মুখ খোলেন না। নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত সাদা রাইনোর আলোচনাতে ঢুকে পড়ে এরা ব্রা, জুতো, আরশোলা মারা ওষুধ, বিশুদ্ধ জল, যা কিছুর বিজ্ঞাপন মেরে আসতে পারেন, সে কলজের দম এঁদের আছে … ওই লিংক দিয়ে ক্লিক করে ঢুকলেই এঁদের একাউন্টে এক ডলার জমা পড়ে যাবে কিনা … তাই এর পরেও বলবেন, সোশ্যাল মিডিয়া ডিসগাস্টিং নয়? ভালো আছেন এখানেই?

বেশ তো, তবে একটু মানিয়ে গুছিয়ে বুদ্ধি খাটিয়ে থাকুন না হয়। ভেবে দেখলাম, কমন সেন্সটাই, ওয়ার্ড অফ দ্যা ডে হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 45
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    45
    Shares

লেখাটি ২৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.