বেঁচে থাকতেই বলি ভালোবাসি…ভালোবাসায় বাঁচি

0

শাহরিয়া খান দিনা:

‘তুমি চমৎকার একজন মানুষ’- এই কথাটি শুনতে কে না পছন্দ করে! কথাই ভাব প্রকাশের মাধ্যম। আমরা অনেক কথা বলি। কাজের কথা, প্রয়োজনীয় কথা, অর্থহীন কথা। কিন্তু ভালোবাসা বা ভালোলাগার কথাগুলো এড়িয়ে যাই। এসব আমাদের কাছে আদিখ্যেতা মনে হয়।

আবার কেউ বাবা-মা’কে ‘আই লাভ ইউ’ বলে এটা নিয়েও হাসাহাসি করি। এগুলা কি বলতে হয় নাকি! আমরা তো বলি না, তবুও তো আমরা ওদের থেকে আমাদের বাবা-মা’কে বেশিই ভালোবাসি। আর দাম্পত্যকালের বয়স যতো বেশি হয়, ভালোবাসি বলার হার তত কমতে কমতে শূন্যে গিয়ে ঠেকে। আরেহ! ও তো জানেই আমি ভালোবাসি। বলে ন্যাকামি করার কী দরকার!

যতটুকু ভালোবাসি তার প্রকাশে আরও গোপনীয়তা বজায় রাখি। আমরা যখন অফিস যাচ্ছি, বা বাইরে থেকে বাসায় ফিরছি, সন্তানের সামনে আলতো করে কপালে একটা চুমু খেতেও লজ্জা পাই। বাবা’র কাঁধে মা শুয়ে আছে এমন দৃশ্যও সব সন্তান দেখতে পায় না। অথচ রাগ হলে ঠিকই সন্তানের চোখের সামনেই আমরা দুনিয়ার জঘন্যতম শব্দে প্রবল আক্রোশে একে অপরকে গালি দেই। মারামারি করি।

জন্মের পর থেকেই মানুষকে ভালোবাসা শেখানো হয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা কিংবা ধর্ম মানুষকে ভালোবাসার কথা বলে। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকগণ বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন, কতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তবুও কেমন জানি বিশুদ্ধতা হারিয়েছে ভালোবাসা।

অন্যদিকে ঘৃণা করতে কেউ শেখায় না। মন্দ ধারণা, নেতিবাচক মানসিকতা, পারিপার্শ্বিকতায় নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে সে শিখে যায় ঘৃণা করা। এইজন্যই ঘৃণা এখনও অকৃত্রিম ভেজালবিহীন বিশুদ্ধ আবেগ। কেউ যখন ঘৃণা করে, নিশ্চিত থাকা যায় সে ঘৃণাই করে, কিন্তু কেউ ভালোবাসলে নিশ্চিত হওয়া যায় না সে আসলেই ভালোবাসে।

মন্দ এবং ভালো ধারণা মূলত ব্যক্তির মানসিকতার সাথে সম্পর্কিত। যার মানসিকতা যেমন, অন্যের প্রতি তার ধারণাও তেমন। সুগন্ধি ফুলের কাছ থেকে সুগন্ধ ছড়াবে এবং পঁচা ময়লার ভাগাড় থেকে দুর্গন্ধ ছড়াবে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

যে প্রয়োজন ছাড়া কাউকে প্রিয়জন ভাবে না, অন্য কেউ তাকে প্রিয় ভাবলেও তার মনে সন্দেহ হয়, ভালোবাসি বললেও পিছনে স্বার্থ কী ভেবে হয়রান হয়ে যায়, ভোরের আলো, গোধূলীর রং, সমুদ্রের নীল অথবা জোছনার ছায়ার মতোই মানুষকেও শুধুমাত্র ভালোবাসতে ভালো লাগে বলেই ভালোবাসা যায়, তার ধারণায় তা ধরা পড়ে না।

কিন্তু কী জানেন, মানুষ ভালোবাসার কথা শুনতে চায়। জানতে চায় কে তাকে ভালোবাসে, কে তাকে পছন্দ করে বুঝতে চায়। ফেইসবুকে অনেকেই বিভিন্ন এ্যাপসের ফলাফল শেয়ার করে যেমন, কে আপনাকে ভালোবাসে/কে আপনার সারাজীবনের বন্ধু ইত্যাদি। এতে আবার অনেকে বিরক্ত হোন। আসলে মানুষ নিজেকে জানতে চায়। নিজের সম্পর্কে অন্যের কী ধারণা বুঝতে চায়।

ঘৃণা এবং ভালোবাসা দুই-ই মানুষের শরীর মনে প্রভাব ফেলে। মুখ লাল হয়ে যায়, শরীরে কাঁপন ধরে, চোখ ভরে জল আসে। রাগ, জেদ, ঘৃণায় এমন প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন আমরা প্রায়ই হই। আর ভালোবাসা! শেষ কবে ভালোবেসে মুখ রাঙা হয়েছে? শরীরে কাঁপন ধরেছে? চোখে জল এসেছে?

আকণ্ঠ ঘৃণায় ডুবে মুখে বলি ভালোবেসে বাঁচো। নিজে যা ইচ্ছা তাই করি, কিন্তু অন্যের থেকে ভালো ব্যবহার আশা করি। ভালো সাজবার চাইতে ভালো মানসিকতার হওয়া জরুরি।

কেউ মারা গেলে তাকে নিয়ে আবেগময় কথার ছড়াছড়ি দেখা যায়। আত্মীয়স্বজন প্রিয়জনের কান্নাকাটি দেখা যায়। অথচ বেঁচে থাকতে এই ভালোবাসার কানাকড়িও যদি সে দেখতে পেতো, তবে জীবনটা তার আরও সুন্দর মনে হতো নিশ্চয়ই। মানুষ যদি মরে আবার জীবিত হতে পারতো, তবে বেশিরভাগ মানুষ একবার করে মারা যেতো সে মরার পর কে কী করে সেটা দেখার জন্য।

পরিবার, প্রিয়জন, বন্ধু-স্বজন জানেই তো ভালোবাসি, তবুও মাঝে-মধ্যে জানান দিলে দোষের কী! ঘৃণা প্রকাশ ক্ষতিকর, কিন্তু ভালোলাগার প্রকাশটা স্বস্তিকর।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 959
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    959
    Shares

লেখাটি ২,২২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.