ট্রলের সংস্কৃতির কাছে আমরা যখন জিম্মি!

0

প্রবীর কুমার:

কেন যেন মনে হচ্ছে- একটি মেয়ে ‎H₂O অর্থ না জানায় বাংলাদেশের সব H₂O (জল) শুঁকিয়ে গিয়েছে! ফেইসবুক ডিহাইড্রেশানে ভুগছে।

আরেকটি মেয়ে Wish শব্দের সঠিক ব্যবহার করতে পারেনি কিংবা অর্থ জানে না বলে তার যাবতীয় শিক্ষা বা জ্ঞান বৃথা হয়ে গিয়েছে। উইশ সচেতন কমিউনিটি মেয়েটির ব্যর্থতায় ভীষণ লজ্জিত আর মর্মাহত!

এই ঘটনা থেকে বেশ কিছু ফেইসবুকবাসীও নিজেকে নতুন করে জ্ঞানী হিসেবে জেনেছেন; কারণ- তারা H₂O এবং Wish অর্থ জানেন!

স্বাভাবিকভাবেই আমাদের একটা ধারণা থাকে যে- Wish এবং ‎H₂O অর্থ প্রায় সকলেরই জানা।-

১* বিশেষ করে Wish শব্দটি এতো বেশি প্রচলিত যে এর ব্যবহার এবং অর্থ শহুরে-শিক্ষিত মানুষগুলোর জানার কথা। অনেকের মনে হয়তো ধারণাও হয়েছে যে- ছোট ছোট বাচ্চাগুলোও এর অর্থ জানে, ওই মেয়েটি কেন জানলোনা! ওর সুন্দরী প্রতিযোগিতায় যাওয়ার সাহস হলো কী করে! কিংবা ভাবছেন- একটা অথর্ব-মূর্খ প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। পড়াশোনা একদম করেনা।

ভাবনাটা অনেকটা সত্যি। এই দেশের মেয়ে-ছেলেগুলোর তেমন পড়ার অভ্যাস নেই, তারা বই কেনেনা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তেমন সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু নিতান্তুই একটা বহুল ব্যবহৃত শব্দের অর্থ না জানায় কিংবা তার উপযুক্ত ব্যবহার না করায় – একটা প্রজন্মের দৈন্য নির্ধারণ করা যায়না।

তেমনি ওই মেয়েটিকে এই একটি শব্দ দিয়েই জেনে ফেলা যায় না। আসলে মেয়েটি যখন শব্দটির সঠিক প্রয়োগ পারছিলোনা, তখন মেয়েটির জন্য খারাপ লেগেছে। বহুল প্রচলিত শব্দটির ব্যবহার পারাটা স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু পারতেই হবে; না পারলে তাকে নিয়ে এভাবে ট্রল হবে- এটা খুবই হতাশাজনক। এমনও হতে পারে ওই মেয়েটি এমন কিছু সুন্দর ও প্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দ জানে যা তাকে নিয়ে ট্রল করা মানুষগুলো জানে না।

২* যে মেয়েটি জলের রাসায়নিক সংকেত H এর অর্থ পারেনি তাকে মনে হয় আর জলের ঢোক গেলার সময় দেয়নি আমাদের ট্রলার কেমিস্টরা। নেচে-গেয়ে-বিদ্রুপ করে ফেইসবুকে দারুণ এক উৎসব পালন করা হচ্ছে। অথচ জলের রাসায়নিক সংকেত জানাটা কাঙ্ক্ষিত হলেও না জানাটা কোন অন্যায় নয়।

হ্যাঁ, এক্ষেত্রে খারাপ লাগারই কথা; খানিক হতাশও হতে পারি আমরা। ভাবতেই পারি- আমাদের আরো সচেতন হওয়া উচিত, সাধারণ জ্ঞানগুলো অর্জন করা উচিত। খানিক হতাশা প্রকাশ করে কিংবা অনুপ্রেরণামূলক স্ট্যাটাসও দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ স্ট্যাটাসগুলো কেমন ছিলো? ব্যাঙ্গাত্মক- বিদ্রুপাত্মক-অপমানজনক।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস- উন্নত বা সভ্য বিশ্বে কোন মেয়ে যদি এমন প্রতিযোগিতায় এটি না বলতে পারতো- তাকে নিয়ে এমন নিম্নমানের ট্রল কখনোই হতো না। আমরা আসলে অন্যকে ছোট করে দেখার, অপ্রয়োজনীয় নিন্দা করার, ঘৃণা ছড়ানোর, নির্বিচারে অগভীর চিন্তা প্রকাশের সংস্কৃতির চর্চা করে থাকি। এটা এমন একটা অভ্যস্ততায় পরিণত হয়েছে যে অবচেতন মনেই আমরা এসব করে ফেলি।

৩* এমনিতেই সুন্দরী প্রতিযোগিতা হচ্ছে সবচেয়ে অসুন্দর প্রতিযোগিতা।
নারীর শরীর মেপে মেপে সৌন্দর্য নির্ধারণ করা খুবই আপত্তিকর। এরপর প্রায়ই এই প্রতিযোগিতার সাথে আরও অসুন্দর কিছু না কিছু যোগ হচ্ছে।

অন্য একটি বিষয় হচ্ছে- প্রতিযোগীরা অনেক কিছুর উত্তর পারবেন না, স্বাভাবিক। কখনও কখনও মানসিক চাপ অনেক সহজ এবং জানা কিছু ভুলিয়ে দেয়। তবে যারা নির্বাচক হিসেবে আসেন তারাও যে ভুল করেন না, ভিত্তিহীন এবং স্ববিরোধী কথা বলেন না- এমন নয়।

* গতবার এক নির্বাচকের প্রশ্ন ছিলো – বছরের কোন দিনে উল্কাপিণ্ড হয় না! ধারণাটি কতটা অবৈজ্ঞানিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
* একজন বিচারক কখন গুড ইভনিং আর কখন গুড নাইট বলতে হয় সেটা জানেন না।
* যে শাফিন আহমেদ গতবার সুন্দরী প্রতিযোগিতার নির্বাচক ছিলেন তিনিই এবার বলছেন- সুন্দরী প্রতিযোগিতা হারাম। উল্লেখ্য ইনিই কিন্তু এই হারাম (!) গান গেয়ে উপার্জন করেছেন, পরিচিতি পেয়েছেন।

আমাদের একটু ভাবা উচিত- দুজন প্রতিযোগী কোন অপরাধ না করেও কেমন এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে, কতটা মানসিক আঘাত সইতে হচ্ছে। কারা সৃষ্টি করে দিয়েছে এমন পরিস্থিতি? হ্যাঁ, আমরাই করে দিয়েছি। এই প্রতিযোগিতায় আরো অনেক প্রতিযোগী ছিলো যারা এমন অজস্র সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে বাদ পড়েছে।

মেয়ে দুটি সহজ প্রশ্নের উত্তর দিত পারেনি, যা আমরা পারি। কিন্তু এর অর্থ কিন্তু এটাও নয় যে ওই দুজনের মেধা নেই আর আমরা মেধাবী।

এসব ভাবার প্র্যাকটিস করা উচিত।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 174
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    174
    Shares

লেখাটি ৯২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.