মানসিক অসুস্থতায় চিকিৎসা যে কারণে প্রয়োজন

0

শিল্পী জলি:

উত্তম কুমারের একটি মুভি দেখেছিলাম যেখানে তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে পাগল বানানো হয়। বাধ্য করা হয় পাগলা গারদে গিয়ে বসবাস করতে।
মান্নাদেরও একটি গান আছে,’যখন কেউ আমাকে পাগল বলে তার প্রতিবাদ করি আমি, তুমি যখন পাগল বলো ধন্য আমার সেই পাগলামী…!’
আবেগে আপ্লুত হয়ে ভালোবাসায় পাগলামীকে আহবান করা হয়েছে এই গানে। শুনলে হৃদয়ে সুখকর অনুভূতি জাগে।
দেশে অনেক বাবা-মাও আছেন সন্তানকে অতি ভালোবেসে আদরে গলে গিয়ে ডাকেন, ‘আমার পাগল ছেলে!’

তবে সব ‘পাগলা’ ডাকই আদর বা ভালোবাসাজনিত কদর নয়। এর সাথে নিষ্ঠুরতাও জড়িয়ে থাকে মাঝে মাঝে, বিশেষ করে আমাদের দেশের মতো দেশগুলোতে।

‘পাগল’ শব্দটির নানাবিধ প্রয়োগ আছে যেটা কখনও মধুর, কখনও রোমান্টিক, কখনও ভীতিকর। কখনওবা কাউকে শুধু হেয় করতেই শব্দটির প্রয়োগ ঘটে। কখনও কারও থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতেও এই শব্দটির ভয়াবহ রূপটি প্রকাশিত হতে পারে। যেমন বিচারপতি এসকে সিনহার ঘটনা। তাঁর কর্মকাণ্ডের সবটুকুই হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারতেন তিনি যুক্তি দিয়ে, কিন্তু তাঁকে যখন মানসিকভাবে ভারসাম্যহীনতার অপবাদ দেয়া হলো তখন সরাসরিই তাঁর বলার অধিকার হারিয়ে গেল। কেননা ঐ অপবাদ নিয়ে তিনি যাই বলতেন, সবই পাগলের প্রলাপ ক্যাটাগরির মধ্যে গিয়ে পড়তো। আর যদি তিনি বলতেন, আমি এখনও মানসিকভাবে সুস্হ্যই আছি, তখন প্রশ্নবোধক চিন্হের উদয় ঘটতো, লোকে ভাবতো কী জানি কী বিষয়! আর যদি বলতেন, আমি আসলেই মানসিকভাবে অসুস্হ, তখনও লোকে তা সত্যিই ভাবতো।

অর্থাৎ পাগল বা পাগলের খেতাবটির একটি উত্তরই সঠিক, রোগ পজেটিভ–পাগল হোক বা না হোক মানুষের অধিকার হরণ ঘটেই, ক্ষতি। উপরন্তু, পাগল কী পাগল না তা প্রমাণের অপশনটিও জটিলতায় ভরপুর। তাই চুপ থেকে এড়িয়ে যাওয়াই সর্বোত্তম।

দেখা যায় যে বাংলাদেশ- ভারতে অনেক লোক বউকে অত্যাচার বা তালাকের প্রশ্নে পাগলের বিষয়টিকে উদ্দেশ্য হাসিলের একটি পন্হা হিসেবেও জুড়ে নেয় অন্যান্য টেকনিকের সাথে। যেটা শুধু চূড়ান্ত নোংরামীই নয়, অমানবিক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনও। অথচ দেখা যায় অনেক শিক্ষিত মানুষই জনতার সামনেই অহরহ একে ওকে অবলীলায় পাগল বলে যাচ্ছেন। কতটা সস্তা মানসিকতার হলে পরিণত হয়েও একজন মানুষ এতো সহজে যাকে তাকে পাগল বলে যেতে পারে! এতোটুকু ম্যানার্স না শিখতে পারলে কীসের শিক্ষা, কীসের শিক্ষিত!

আমেরিকার মায়ো ক্লিনিকের তথ্যানুযায়ী, প্রতি পাঁচজনে একজন মানুষ মানসিকভাবে অসুস্হ হতে পারে। অন্য কথায় ঘরে ঘরেই এই অসুস্হতা থাকতে পারে। যাদের বসবাসের জন্যে একটি উদার সমাজ দরকার। আমেরিকায় অতি সুন্দর/সুন্দরী তরুণ-তরুণীরা যখন তখন ডাক্তারের দরবারে যেতে পারে মানসিক রোগের চিকিৎসা নিতে। এমনকি চাকরি ক্ষেত্রেও তাদের মানসিক অসুস্হতা প্রকাশে অধিকার ক্ষুন্ন হয় না। মানসিক অসুস্হতার প্রকাশ ঘটলে লোকে তাদেরকে হেয় করে না। ফায়দা লুটার কথা ভাবে না। প্রেম বিয়েতেও এখানে মানুষের মানসিক অসুস্হতা তেমন বাঁধার সৃষ্টি করে না। বরং পুরো সমাজ ব্যবস্হাটিই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

তাই হাইপ্রেশার, বহুমূত্র, হাঁপানী ইত্যাদি রোগের মতো সহজেই তারা তাদের মানসিক অসুস্হতার কথাও প্রকাশ করতে পারে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারে। এমনকি রাষ্ট্রও তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দেয় যেনো জীবন চালিয়ে নিতে পারে সহজেই। সেদিনই প্যাটস মার্টে আতিকের সাথে এক কিশোরী কথা বলছিল। এক পর্যায়ে বললো, আমি এতো কথা বলছি তুমি কিছু মনে করো না যেনো। আমার বাইপোলার আছে তো তাই মাঝে মাঝে এতো বেশি কথা বলি।

সাধারণ কথায়, মানসিক অসুস্হতা বিষন্নতা, এ্যাংজাইটি, স্কিজোফেনিয়া, ইটিং ডিসঅর্ডার ইত্যাদি যা মানুষের মুড, চিন্তাধারা, এবং আচার-আচরণকে প্রভাবিত করে। মানুষকে দৈনন্দিন জীবন যাপনে অসামর্থ করে তোলে যা স্কুল, কাজ/কর্ম, বা সম্পর্কের ক্ষেত্রগুলোকে প্রভাবিত করে, যদি না লক্ষণ গুলোকে মেডিকেশন এবং সাইকোথেরাপি দিয়ে নিয়মিত কন্ট্রোলে রাখা হয়।

মানসিক অসুস্হতার লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দুঃখবোধ, অমনোযোগিতা, অতি ভয়, সীমাহীন দুঃশ্চিতা, এক্সট্রিম মুড সুইং, বন্ধুবান্ধব থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, ক্লান্তি অনুভব, কাজে অনীহা, নিদ্রাহীনতা, বাস্তবতা বিবর্জিত চিন্তাভাবনা, অলীক কল্পনা, জীবনের সাধারণ সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করতে না পারা, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, সেক্স ড্রাইভে পরিবর্তন, আত্মহত্যার প্রবণতা ইত্যাদি। মানসিক অসুস্হতা কখনও কখনও শারীরিক সমস্যাও ঘটায়, যেমন পেটে ব্যথা, কোমরে ব্যথা, মাথা ব্যথা ইত্যাদি।

বেশির ভাগ মানসিক অসুস্হতারই চিকিৎসা না হলে সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ হতে থাকে রোগ। এমনকি আত্মহত্যাও ঘটতে পারে তখন।

পরিবেশ, প্রদাহজনিত কন্ডিশন, এ্যালকোহল বা ড্রাগস সেবন, ব্রেইন কেমিষ্ট্রি নিউরো ট্রান্সমিটারজনিত কেমিক্যাল সমস্যা, জিনগত বৈশিষ্ট্য, অর্থনেতিক চাপ, ব্রেইন ইনজুরি, অত্যাচারিত হওয়া, ক্রনিক কন্ডিশন যেমন ডায়বেটিস, রিলেশনশিপ প্রবলেম, চাইল্ডহুড এ্যাবিউজ ইত্যাদি কারণে ঘটতে পারে মানসিক অসুস্হতা এবং জীবনের যে কোনো সময়েই এই সমস্যা দেখা দিতে পারে, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তরুণ বয়সেই বেশি ঘটতে দেখা যায়।

মানসিক অসুস্হতা যেমন মানুষকে ডিজেবল করতে পারে, তেমনি আচার-আচরণেও এগ্রেসিভ করে। মানসিকভাবে অসুস্হ রোগী অনেক সময় নিজের এবং অপরের ক্ষতিও ঘটায়। মানসিক অসুস্হতার পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব না হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করে, স্ট্রেস কন্ট্রোলে রেখে, এবং সেল্ফ এস্টিম বাড়িয়ে…। নিয়মিত সাইন এবং সিম্পটমের প্রতি নজর রেখে ঔষধ সেবন, যথা সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্হ্যকর খাবার, এবং নিয়মিত ব্যায়াম রোগের মাত্রাকে কন্ট্রোলে রাখে। তাছাড়া ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে নিয়মিত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ রক্ষাও প্রয়োজন হয় মানসিক রোগের চিকিৎসায়।

সমাজ শিক্ষিত না হলে, মানুষের মানসিক এবং আত্মিক উন্নতি না ঘটলে, সহমর্মী না হলে মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীরা সহসা চিকিৎসা নিতে পারে না। উল্টা ব্যক্তি, সমাজ, এবং চিকিৎসকদেরকে এড়িয়ে চলে। ফলে রোগ পুষে রাখতে রাখতে রোগ মাত্রা ছাড়ায়।

সমাজের উন্নত এবং উদার মানসিকতাই এই রোগের রোগীদের চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে পারে।

‘পাগল’ কোন আদরের নাম নয়, কাউকে হেয় করার অস্ত্র নয়, আখের গোছাবার উপায়ও নয়। এটি শুধুই একটি মানসিক অসুস্হতার নাম। একটি রোগ।
সমাজে হীন স্বার্থে পাগল শব্দের ব্যবহার চরম বর্বরতা বই আর কিছু নয়। সমাজ সুশিক্ষিত হোক, মানুষের সভ্যতা বাড়ুুুুক।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 327
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    327
    Shares

লেখাটি ১,২৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.