নিজেকে ‘সুন্দরী’ না বানিয়েও দিব্যি টিকে থাকা যায়

0

তানজিনা নওশিন:

রংচটা মেকআপ মুখে চড়িয়ে, আঁটোসাটো পোষাক পডরে একগাদা পুরুষের সামনে কোমর দুলিয়ে হেঁটে যাবার নাম হলো সুন্দরী প্রতিযোগিতা। অন্তত আমার ডিকশনারি তা-ই বলে।

যারা এসব ছাইপাঁশ আয়োজন করেন তারা আদতে চকচকে মোড়কে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে বাজারে কিছু ভোগ্যপণ্য বাজারজাত করেন, যেসব পণ্যের নাম “মিস সুড়সুড়ি জাগানিয়া” অথবা “মিস অন্য কিছু একটা”।

আর যারা এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন, তারা জেনে শুনে বুঝেই পণ্য হতে এসব প্রতিযোগিতায় নাম লেখান।

আর যারা এসব প্রতিযোগিতা দেখে যা মজা নেওয়ার, তা ঠিকঠাক মতোই নেন, অথচ প্রতিযোগিতার আইকিউ টেস্টে কে কী উত্তর দিলো তা নিয়ে হাস্যরস করেন, তাদের এসব ভণ্ডামি নিয়ে কী যে বলা উচিত, সত্যিই আমি ভেবে পাই না।

কথা বলছিলাম গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ও ট্রল হওয়া তথাকথিত সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে।

হতে পারে এসব সুন্দরী প্রতিযোগিতা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করা হয় এসব প্রতিযোগিতার আয়োজনে ও প্রচারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মহাসমারোহে এসব প্রতিযোগিতা নিদারুণ জনপ্রিয়। কিন্তু এধরনের প্রতিযোগিতা কোনকালেও আমাদের বাংগালি সংস্কৃতির অংশ ছিলোনা। আর তাছাড়া এসব প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ছাড়া আর কোনো কাজের কাজ হয় বলে আমি কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাস করি না। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নারীর সম্মান কমে, বই বাড়ে না।

গতকালের এই প্রতিযোগিতার ফাইনাল রাউন্ড পর্যন্ত যেই সকল পরমা সুন্দরীগণ উঠিতে সক্ষম হইয়াছিলেন; তিনারা যে অত্যন্ত উচ্চমার্গের ইন্টেলেকচুয়াল এ্যবিলিটি-সম্পন্ন তাহা প্রমাণের উদ্দেশ্যে মহা পণ্ডিত কয়েকজন বিচারক তিনাদিগকে জ্ঞান বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয়ে প্রশ্ন করিয়াছেন। বাঘা বাঘা বিচারকমণ্ডলীর দাঁতভাঙ্গা সব প্রশ্ন। উত্তর প্রদান করিতে গিয়া সুন্দরীদের একেবারে চুল পাঁকিয়া যাইবার জোগাড়।

এখন আমার প্রশ্ন হলো, আয়োজক কর্তা ব্যক্তিগণ এতোগুলো রাউন্ডে এই মিস.অমুক এবং মিস.তমুকদের কোন জাতের গ্রুমিং করিয়েছেন?
নাকি ইনারা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে মনোনিবেশ করিবার ফুরসত পান নাই?
আর বিভিন্ন রাউন্ডে এতোদিন ধরে এই সুন্দরীদের নিয়ে উনারা কোন কিসিমের পর্যালোচনা করলেন যে; এইসব সুন্দরীদের দিয়ে যে ইস্কুলের প্রথম শ্রেণীর সাধারণ জ্ঞানের উত্তর দেওয়াটাও এক প্রকারের অসাধ্য সাধন; তা ইনারা ঘূণাক্ষরেও টের পেলেন না? একটুও যদি টের পেতেন, তাহলে আজ গোটা জাতির সামনে এই মেয়েদের অন্তত লজ্জায় পড়তে হতো না।

আর সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিচারকের রসায়ন বিষয়ক প্রশ্ন, সেটাইবা কতোটা যুক্তিযুক্ত! কী একখান প্রশ্ন, H2O মানে কী? তার থেকে এককাঠি উপরে উঠে অন্য বিচারক কীসব উইশ না ফুইশ সংক্রান্ত প্রশ্ন করলেন, যেমন তিনার প্রশ্ন, তেমন প্রতিযোগিনীর উত্তর, এ যেনো সোনায় সোহাগা।

বৈশাখে পৌষের গল্প না কয়ে, বরং যেটা করতে এসেছিলেন সেটাই করতেন! তথাকথিত রং মেখে সং সাজার প্রতিযোগিতায় মেকআপ, ফিগার, বডি, জামা-কাপড় ইত্যাদি সংক্রান্ত প্রশ্নই বোধহয় অধিক মানানসই হতো। ঐ জাতীয় প্রশ্ন করলে এই সকল বিদুষী সুন্দরীগণ ঠিক ঠিক উত্তর দিতে পারতেন, আমি অন্তত এই গ্যারান্টি দিতে পারি।

বরং আফ্রোদিতির কাছে স্বরস্বতীর আচরণ প্রত্যাশা যারা করে, তাঁরাই সবচেয়ে বড় হাস্যরসের পাত্র।

আর ভগিনীগণ, চেহারা আর দেহের সৌন্দর্য প্রমাণের জন্য এইসব দিগম্বর হবার প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়ে নিজেদের আর সমগ্র নারী জাতিকে আর কতো ছোটো করবেন আপনারা? অর্থ আর খ্যাতি উপার্জনের আরও ১০১ টি উপায় এই ধরাধামে আছে বৈকি!

নিজের জ্ঞানের চর্চা করুন, প্রজ্ঞা বৃদ্ধি করুন, পরিশ্রম করুন, স্বপ্ন দেখুন।

সৃষ্টিকর্তা তো নিজেই নারীকে অপরূপ করে সৃষ্টি করেছেন; নারীর সৌন্দর্য তো একটা আর্ট।
নিজের সৌন্দর্যকে নিজের ব্যক্তিত্বের শুধুমাত্র একটা অংশ মনে করুন, এর বেশি কিছু ভেবে ভুল করবেন না দয়া করে।
নিজের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করতে চান, করুন।

নিজেকে প্রকাশ করুন শুধু নিজের আত্মতৃপ্তির জন্য। অন্যের ভোগের পণ্য হবার জন্য নয়। আপনি নিজেকে যতো সস্তা করবেন, ততো কাটা যাবে আপনার নাক, সেই সাথে আমাদের সবার।

শিক্ষক ও উন্নয়ন কর্মী
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 809
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    809
    Shares

লেখাটি ২,১৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.