একটি বিশেষ দিন এবং একজন বিশেষ কন্যাশিশু

0

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা:

হাসপাতাল এডমিশনের দিনে এতো ব্যস্ততা যায় যে, কোনদিকে ফিরে তাকানোর সময় পাই না। ঝটপট রোগী দেখে চটপট সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তেমনি এক ব্যস্তময় দিন যাচ্ছিল সেদিন। রোগী দেখা, রোগীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, এমার্জেন্সি সিজার, এসব নিয়ে ঠিকমতো খাওয়ারও সময় পাইনি। এরই মাঝে মেয়েটি এলো প্রচণ্ড প্রসব বেদনা নিয়ে। প্রতিটি ব্যাথার সাথে তার অভিব্যক্তি এবং শারীরিক ভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল, সে সুস্থ-স্বাভাবিক মেয়ে নয়।

-সে তো পাগল।

-তাহলে বাচ্চা?? ওর স্বামী কই?

-স্বামী কই পাবিন? এরে কে বিয়া করবো?

-কী বলছেন? স্বামী নাই, বাচ্চা এলো কোথা থেকে?

রোগীর সাথে থাকা আত্মীয়রা প্রথমে একটু গাঁইগুঁই করে পরে বললো, এটা ধর্ষণ কেস।

মেয়েটাকে কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছিল না। এমনিতেই লেবার পেইনে স্বাভাবিক মানুষও অস্বাভাবিক আচরণ করে, আর সে তো আদতেই অস্বাভাবিক।

অনেক চিন্তা করেই ডিপার্টমেন্টাল হেডের সাথে কথা বলে মেয়েটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিলাম। যেহেতু কোনভাবেই মেয়েটি আমাদের সহযোগিতা করছিল না, তাই নরমাল ডেলিভারি করানোটা অসম্ভব হয়ে উঠলো। তাই রোগীর পার্টির সাথে কথা বলে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমেই বাচ্চাটা ডেলিভারির সাথে সাথে ওর টিউবাল লাইগেশনও করে দেয়া হলো।

পরদিন সকালে রাউন্ডে বের হয়ে মেয়েটার কাছে গিয়ে চমকে গেলাম। ষোল-সতেরো বছরের একটা ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে, ধবধবে ফর্সা রঙ, ছোট করে কাটা চুল। বিছানায় শুয়ে আছে অস্বাভাবিকভাবে। তার হাত-পা অচল, কিছুটা বাঁকানোও বটে। মুখের একপাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে। মেয়েটিকে আমাদের ডাক্তারি ভাষায় সিপি(সেরাব্রাল পলসি)র রোগী বলে।
জন্ম থেকেই সে এমন। তার জন্মের সময়ে প্রাপ্ত আঘাতই তাকে চিরকালের মতো অক্ষম করে দিয়েছে। সে হাঁটতে পারে না, কথা বলতে পারে না, আনন্দ-হাসি, দুঃখ-বেদনাসহ পার্থিব কোন সরলতা বা জটিলতার কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

-ও তো বাড়ির বাইরে যেতে পারে না। তাহলে রেপড হলো কীভাবে? কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে বিছানার পাশে বসে থাকা ওর বোনকে জিজ্ঞেস করলাম।

বোনটিও অসম্ভব সুন্দরী। মেয়েটি সুস্থ থাকলে হয়তো তার মতই হতো দেখতে। আমার প্রশ্ন শুনে কিছুমাত্র বিব্রত হলো বলে মনে হলো না। খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেলাফেলায় উত্তর দিল।

-বাসার মেয়েরা বাইরে ছিল।

-তাহলে? বাসায় কে ছিল?

-বাসার লোকও ছিল,বাইরের লোকও ছিল।

বোনটি কৌশলে এড়িয়ে যেতে চাইলো। আমি বের হয়ে আসতে উদ্যত হতেই পাশে থাকা রোগীর এক আত্মীয়া আমাকে চোখের ইশারা করলো। আমিও আত্মীয়াকে ইশারায় দেখা করতে বলে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে চেম্বারে এলাম।

আত্মীয়া যা বললো তা শোনার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।

মেয়েটি জন্মের পর থেকেই অচল। বাবা-মা যতদিন বেঁচে ছিলেন, মেয়েকে আগলিয়ে রেখেছেন। ওনারা গত হবার পর ভাইয়েরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। মেয়েটির ভার এসে পড়ে বড় বোনের উপর। বোনের অভাবের সংসার, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সে নিজেই পরের বাড়িতে কাজ না করলে সংসারের বেহাল দশা ঠেকাতে পারতো না। তার উপরে গোঁদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে উঠে মানসিক-শারীরিক ভারসাম্যহীন বোনটি। ওকে আগলে রেখে বাড়িতে বসে থেকে খেলে তাদের পেটের ভাত জুটবে না। সকাল হলে বোনটি সংসারের কাজ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ে, ফিরে আসে শেষ বিকেলে। বাসায় একা থেকে যায় অসহায় বোনটি। মাঝে মাঝে অবশ্য বোনের আলসে স্বামী কাজে ফাঁকি দিয়ে বাড়িতে বসে থাকে। আর এই সুযোগটিই গ্রহণ করে বোনের স্বামীটি।

ফাঁকা বাড়িতে অসহায় অথর্ব মেয়েটিকে সে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করে দিনের পর দিন। ফলশ্রুতিতে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। বাড়ির এককোণে পড়ে থাকা গলগ্রহ বোনটির শারীরিক পরিবর্তনের দিকে সময়মতো নজর দেয়ার সময়ই বা পেয়েছে কখন বড় বোনটি? যখন নজরে এসেছে, তখন প্রাকৃতিক নিয়মে প্রসবের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো রাস্তাই খোলা ছিল না সামনে। আর অবুঝ কিশোরী মেয়েটি? মা হলেও মাতৃত্বের স্বাদ বা অনুভূতি কোনটিই তাকে ছুঁয়ে যেতে পারে না। গঠনগতভাবে একজন পরিপূর্ণ কন্যাশিশু করে দুনিয়াতে পাঠালেও বিধাতা তাকে অপূর্ণ করে রেখেছেন অন্যরূপে।

সবটা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। কথায় বলে, কন্যাশিশু পাওয়ার সৌভাগ্য সবার হয় না, ওরা আল্লাহর নেয়ামত। যার হয় সে ভাগ্যবান-ভাগ্যবতী। কিন্তু সেই নেয়ামত যদি বিধাতার খেয়ালে অভিশাপে পরিণত হয়, তখন ভাগ্যের পরিহাস বলে মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

যাদের ঘরে শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু আছে,তারা বোধ করি মরেও শান্তি পায় না। আর সে শিশু যদি কন্যা হয়, তবে বিপদ যেন হয়ে উঠে আরও ঘোরতর। এই ভারসাম্যহীন কন্যাশিশুরা বড় হওয়ার সাথে সাথে প্রতি মুহূর্তের উদ্বিগ্নতা যেন পরিণত হয় নিত্য দুশ্চিন্তায়।

আমি ভেবে অবাক হই, হিসেব মেলাতে পারি না। মানুষ ঠিক কতোটা অমানুষ হলে একটা প্রতিবন্ধী মেয়েকে তাদের বিকৃত লালসার শিকার করতে পারে! স্পেশাল কন্যাশিশুরা মানসিক বা শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাগ্যের পরিহাসে। আর এরা, যারা ঐসব কন্যাশিশুদের দেখে বিকৃত পুরুষোচিত লালসার উত্তেজনা প্রশমন করতে পারে না, তারা আসলে কোন টাইপের প্রতিবন্ধী, জানতে পারিনি আজও। আর শুধু প্রতিবন্ধী কন্যা শিশুদের কথাই বলি কেন? সুস্থ হোক বা অসুস্থ, প্রতিটি কন্যা শিশুকে সুরক্ষা দেয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব।

বিশ্বের সকল কন্যাশিশু সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা পাক, এটাই হোক আমাদের মত সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের নিত্যদিনের প্রত্যাশা। থাকলে কন্যা সুরক্ষিত, দেশ হবে আলোকিত।

ডা.ফাহমিদা শিরীন নীলা
গাইনী বিশেষজ্ঞ,
বগুড়া।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 157
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    157
    Shares

লেখাটি ৯২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.