এই আপা শুনেন, “ডিভোর্সি মেয়ে মানেই স্বামীধরা না”

0

ঈহিতা জলিল:

কলকাতার অভিনেত্রী প্রিয়াংকা সরকারের একটা ভিডিও দেখলাম। সেখানে তিনি বলেছেন, একজন সিংগেল মাকে প্রতিনিয়ত কী কী বাক্যবাণে জর্জরিত হতে হয়। আমিও অনেকদিন ভাবছিলাম বিষয়টা নিয়ে। বিষয়টির ভিতরে যাবার আগে কিছু ঘটনা বলে নেই। অবশ্যই পাত্র-পাত্রীর নামগুলো সাজানো, কিন্তু ঘটনা সত্য।

গোধুলী আর আকাশ দুই বন্ধু। তাদের বন্ধুত্বটা ঠিক যেনো একটা নির্মল বাতাসের মতো। যেখানে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া যায়। সব ঠিকঠাক-ই চলছিলো। বাদ সাধলো গোধুলীর সংসারের অশান্তি। প্রথম থেকেই ওর স্বামীর চরিত্রগত সমস্যা ছিলো। কিন্তু বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে ও ওর সবটা দিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে ছিলো। ছিলো কী, এখনও আছে। ওর একটাই কথা, “আমার বাচ্চাদের বাবা থাকবে না?”

গ্রাম্য একটা কথা আছে না, “যার মনে যা ফাল দিয়া ওঠে তা”। গোধূলীর বরের হলো সেই দশা। নিজে তো যেখানে-সেখানে সম্পর্ক করে বেড়ায়! এখন তাঁর মনে হতে শুরু করলো, গোধুলী আর আকাশের প্রেম আছে। আকাশের প্রতি অবশ্য তাঁর কিছু ক্ষোভও ছিলো, কারণ যেদিন সে গোধূলীর গায়ে হাত তুলেছিলো, সেদিনের পর থেকে আকাশ আর গোধূলীকে মানিয়ে নিতে বলেনি। বরং উকিলের কাছে যাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুতে গোধুলীকে সাপোর্ট করেছে। একজন বন্ধু হিসেবে ওর দায়িত্ব ও পালন করেছে। বরং ওর মধ্যে কিছুটা অপরাধবোধ ছিলো, কেনো ও এতোদিন এই নোংরা লোকটার সাথে মানিয়ে থাকার পরামর্শ দিয়ে গেছে।

নীপু, আকাশের স্ত্রী। গোধুলীর স্বামী আকাশের স্ত্রীকে ফোন করে তাঁর মনের সব বিষ ঢেলে দিলো। স্বামী নিয়ে প্রতিটা মেয়ের ভিতরেই কম-বেশি দ্বিধা থাকে। আর স্বভাবতই নীপু গোধুলীর স্বামীর ঘটনা জানতো। আকাশ ওকে সবই বলেছিলো। ওর মনেও মাঝে মাঝে আকাশকে নিয়ে আশংকা কাজ করতো। যেহেতু সে কোন জব করতো না। সারাদিন বাসায় বসে বাচ্চাদের দেখাশোনা করে করে ক্লান্ত থাকতো। ওর একঘেঁয়ে জীবনও এখানে ফোঁড়ন দেয়ার কাজ করেছে। আর সদ্য মা হওয়ার শারীরিক-মানসিক ধকলও একটা পয়েন্ট তো বটেই। যার ফল নীপুও আকাশ আর গোধুলীকে জড়িয়ে সন্দেহ করা শুরু করলো।

গোধুলী পুরোপুরি ভেঙে পড়লো। ওর মনে হতে লাগলো, “ওর সংসারের অশান্তি ওর বন্ধুর সংসারকেও নষ্ট করে দিলো”।

এই পুরো ঘটনায় সমাজ কিন্তু দায়ী করেছে গোধুলীকে। যেনো সব দোষ গোধুলীর। নীপু ভাবছে, যেহেতু গোধুলীর স্বামীর সাথে প্রবলেম, কাজেই সে তাঁর স্বামীকে নিয়ে নিচ্ছে! হলি কাউ! তৃতীয় পক্ষ হিসেবে আমার সুযোগ হয়েছিলো আকাশ আর গোধুলীর সাথে কথা বলার। কেমন করে আমি এর মধ্যে ঢুকে গেছি সে আলোচনায় নাইবা গেলাম।

স্ত্রীর আচরণে বীতশ্রদ্ধ আকাশের বক্তব্য ছিলো, “মাঝে মাঝে মনে হয় বিশ্বস্ত থাকার পরও বউ এমন ভাবে! একদিন সত্যি সত্যি খারাপ কিছু করে ফেলবো! তখনই বাচ্চাদের কথা মনে হয়। আর পিছিয়ে যাই”। আর গোধুলীর কাছে আমার প্রশ্ন ছিলো, তুমি কী ভাবছো এখন? নতুন করে কি শুরু করতে চাও? ও বলেছিলো, “নতুন করে কি আবার বিশ্বাস করতে পারবো? আর বেঁচে থাকার জন্য স্বামী কি খুব দরকার? হ্যাঁ সন্তানদের জন্য বাবা খুব দরকার, কিন্তু নতুন মানুষটি যদিও বা আমার স্বামী হতে পারে, আমার সন্তানদের বাবা হতে পারবে কি”?

একপর্যায়ে ও কেঁদে ফেলেছিলো। বলেছিলো, “আমার ভীষণ ঘর সাজানোর শখ ছিলো, তাই বোধহয় আমার ঘর হলো না”। ওর মতো স্মার্ট-শিক্ষিত মেয়ের মুখে অমন কথা শুনে আমার মনে হয়েছিলো, “বাঙালী নারী আজও একই রকম! সে গাঁয়ের বঁধূই কী, আর কর্পোরেট নারীই কী”!

সাথে সাথে নানুর বলা একটা গ্রাম্য কথা মনে পড়ে গেলো, “অতি বড় সুন্দরী না পায় বর, অতি বড় ঘরণীর না হয় ঘর”। কথাটি কি আসলেই ঠিক? একা একা ঘর হয় না? একা একা সংসার হয় না?
আমার তো মনে হয়, হয়।
যে স্বামী আমার সঙ্গী হতে পারবে না, বটবৃক্ষের ছায়া হতে পারবে না, অমন স্বামীর চেয়ে তো একার ঘরই ভালো। “কাভি খুশী কাভি গাম” সিনেমাটিতে ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে অমিতাভ আর জয়ার যে ডায়ালগ ছিলো, সেখানে জয়া বচ্চনের বলা কিছু খুব স্ট্রং কথা ছিলো, “মা হামেশা ক্যাহতিহে পতি পরমেশ্বর হোতা হে…মেরা পতি পরমেশ্বর ক্যাসে হুয়া? পরমেশ্বর সে তো গালাতিয়া নেহি হোতি…মেরা পতি স্রেফ পতি পরমেশ্বর নেহি!”

আমাদের সমাজে এখনকার নারীদের অর্থের অভাব নেই, তাই তাঁরা এখন আর সবকিছু সহ্য করে থেকে যায় না। তাই এখনকার পুরুষদের জানতে হবে সত্যিকারের অর্ধাঙ্গ হওয়া কাকে বলে! সংসারটা দুজনের, তাই দায়িত্বও দুজনের। আমি আরও কয়েকজন সিঙ্গেল মাদারের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের প্রত্যেকের মনোভাব একটু এদিক-ওদিক করে প্রায় একই। তাঁরা জীবন সঙ্গী নিয়ে ভাবেই না। করার মতো এতো কাজ আছে যে প্রেম-বিয়ে নিয়ে নতুন করে ভাবার সময়ই নেই।

এখন যেসব আপারা ভাবেন, “আরে অমুকের তো বর নাই, অথবা বরের সাথে মিল নাই, সাবধানে থাকতে হবে শেষে না আমার বরের গলায় ঝুলে পড়ে!” প্লিজ টেক অ্যা ব্রেক! আপনার স্বামিটি কি কচি খোকা? যে লজেন্স দিয়ে ভুলায়ে ধরে নিয়ে যাবে!

শুনেন, আমাদের সমাজে ডিভোর্সি মেয়েরা হলো খোলা পাতার মতো, যে কেউ এসে সেখানে কিছু লিখে যেতে চায়! মনে করে, ও ডিভোর্সি, এর সাথে যেকোনো কিছু করা যায়! তাই মেয়েটাকে ভুল ভাবার আগে চেক করুন নিজের পুরুষটি ঠিক আছে কিনা! তারও আগে নিজে ঠিক আছেন কিনা!

সব মেয়েদের সমস্যা একই, বাসার বুয়াই কী আর আমিই কী! আমার বুয়াকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “থাকো কেনো এতোকিছু সহ্য করে? বসায়ে বসায়ে খাওয়ায়ে কী লাভ? ও বলেছিলো, আফা, পুলাপাইনের লাইগা রাহি! পুলাপাইনের বাফ লাগে! আর স্বামী থাহকলে কেউ দুই কতা কওনের সাহস পায় না!”
আমি চমকে উঠেছিলাম। কত সহজে ও কত গভীর একটা কথা বলে দিলো। আমাদের সমাজে যখন জানাজানি হয় কারও ডিভোর্স হচ্ছে, তখন অফিস থেকে শুরু করে সব জায়গায় মেয়েটির নামে সবাই দুই ঢোক পানি বেশি খায়। কেনো!! লেট হার লিভ হার লাইফ!

আপনারা আপনাদের নিয়ে ভাবুন না। মেয়েটা কেমন করে জীবন কাটাবে বা কাটাচ্ছে সেটা তাঁকে ভাবতে দিন। সে কোন পোষাক পরবে, তাঁর প্রোফাইল পিক কেনো এমন হলো, তাঁর বাসায় কে আসলো, কে গেলো, সেটা দেখার দায়িত্ব আমার-আপনার না। কারণ তাঁর ঘরে যখন খাবার থাকে না, তাঁর বাচ্চা রাখার জন্য যখন কাউকে পাশে পাওয়া যায় না, তখন আমি-আপনি যেয়ে তাঁর কাজগুলো করে দিয়ে আসি না।

মনে রাখবেন, তাঁকে মা-বাবা দুইজনের দায়িত্ব-ই পালন করতে হয়। তাঁকে আমরা সাহায্য নাই করতে পারি, এটা আমাদের বিবেচনা, কিন্তু তাঁর সম্পর্কে কটু কথা বলার কোন অধিকার আমাদের কারো নেই। আমাদের একটা খারাপ বাক্য তাঁর কাছে সমুদ্রের সমান বড়। তাঁর যুদ্ধটাকে আমরা সহজ করতে না পারি অন্তত কঠিন যেনো না করি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 749
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    749
    Shares

লেখাটি ৩,৩২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.